ভারতে মহিলাদের শিক্ষাব্যবস্থা উনিশ শতকে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষভাবে ক্রিস্টান মেয়েদের পড়াশোনার জন্য যথাযথ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব ছিল। সেইসব মেয়েদের শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসা এবং তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষের হাতেগোনা কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে একজন হলেন লীলাবতী সিং (Lilavati Singh)। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম দুজন মহিলার মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত এক পরিবারের মেয়ে লীলাবতী তাঁর অদম্য জেদ এবং ভারতীয় খ্রিস্টান মেয়েদের শিক্ষার জন্য কিছু করবার তাগিদ থেকেই বিদেশে পর্যন্ত গিয়েছিলেন মেয়েদের জীবন নিয়ে বক্তৃতা দিতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যও ছিল তাঁর। ভারতীয় মেয়েদের শিক্ষাগত সুযোগসুবিধার দিকে লীলাবতী মনোযোগী ছিলেন, তাঁর প্রভাবে অনেকেই এমনকি হিন্দু এবং ব্রাহ্ম মেয়েরাও খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। লীলাবতী কেবল শিক্ষিত ভারতীয় নারী হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করেই ক্ষান্ত হননি, সংবাদপত্র সম্পাদনার কাজ এবং গ্রন্থ অনুবাদও করেছিলেন তিনি।
১৮৬৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ অধ্যুষিত অবিভক্ত ভারতের গোরখপুরে এক খ্রিস্টান পরিবারে লীলাবতী সিং-এর জন্ম হয়েছিল৷ তিনি খ্রিস্টান হিসেবে ছিলেন তাঁর বংশের তৃতীয় প্রজন্ম। লীলাবতীর ঠাকুরদা ব্যাপটিজমের পর থেকে তাঁদের পারিবারিক নাম হয়ে গিয়েছিল রাফায়েল, তাই লীলাবতী যখন জন্মান তাঁর নাম রাখা হয় এথেল রাফায়েল। যদিও পরবর্তীকালে বহু ভারতীয় খ্রিস্টানের মতো নিজের পুরোনো পারিবারিক নামই গ্রহণ করেছিলেন লীলাবতী। তাঁর পিতা, যিনি স্টিফেন রাফায়েল নামে পরিচিত, ছিলেন একজন সরকারী কর্মচারী। বাবার কাছ থেকে সত্য এবং স্বাধীনতার পাঠ পেয়েছিলেন তিনি, যে শিক্ষার প্রভাব পরবর্তীকালেও তাঁর ওপরে সক্রিয় ছিল।
যখন লীলাবতীর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর, তখন তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু মায়ের ভালবাসা যেন সারাজীবন জড়িয়ে ছিল তাঁকে। তাঁর মা পার্সিয়ান গান এবং কবিতার খুবই ভক্ত ছিলেন, সেখান থেকেই গান এবং কবিতার প্রতি লীলাবতীর তীব্র আকর্ষণ ও ভালবাসা জন্মেছিল।
প্রথমদিকে লীলাবতী তাঁর প্রাথমিক পর্যায়ের পড়াশোনার জন্য তাঁদের গ্রামের একটি মিশন স্কুলে যেতেন। কিন্তু তাঁর বাবা যখন অনুভব করলেন যে, মেয়ের আরও ভাল এবং যত্নশীল পথনির্দেশনার প্রয়োজন, তখন তিনি লীলাবতীকে লক্ষ্ণৌতে মিস ইসাবেলা থোবার্নসের বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মিস থোবার্নসের সান্নিধ্যে কাটানো এই বোর্ডিং স্কুলের সময়টি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে যাওয়া দশ বছরের লীলাবতী বড় শহরের সেই নামজাদা প্রতিষ্ঠানে প্রথম একমাস ভীষণ কুন্ঠা ও অস্বস্তি নিয়ে কাটিয়েছিলেন। আবার বাড়িতে মায়ের আদরের সন্তান হওয়ায় যেহেতু খুব বেশি কঠোর শাসনের মধ্যে তিনি ছিলেন না, ফলে নিজের বেখেয়ালি ইচ্ছেদের দমিয়ে রেখে বোর্ডিং স্কুলের বজ্রকঠিন অনুশাসনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া অত সহজ কাজ ছিল না লীলাবতীর পক্ষে। কিন্তু একইসঙ্গে লীলাবতী ছিলেন মেধাবি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নিজের পড়াশোনাকে তিনি আগ্রহভরে, আনন্দের সঙ্গে আস্বাদন করতেন এবং ক্লাসে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করাও তাঁর পক্ষে কঠিন কাজ ছিল না। সেই প্রতিষ্ঠানে বহু ভাল শিক্ষক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ইসাবেলা থোবার্নসের ক্লাস তাঁকে জীবনের আসল চাবিকাঠিটির সন্ধান দিয়েছিল যেন। ১৮৮২ সালে থোবার্নস আমেরিকা থেকে ঘুরে আসার পর লীলাবতী সরাসরি তাঁর সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পেয়েছিলেন। মিস থোবার্নসের তাঁদের সাহিত্য পড়াতেন, কবি এবং বীরদের কথা খুব উৎসাহভরে তাঁদের শোনাতেন। এমনকি উদ্ভিদবিদ্যা সংক্রান্ত সামান্যতম শিক্ষা মিস থোবার্নসের থেকে যেদিন পেয়েছিলেন লীলাবতী, সেই দিনটিকেও পরবর্তীকালে স্মরণ করেছিলেন, এতটাই গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। রবিবার বিকেলের প্রার্থনা সভায় মিস থোবার্নসের আধ্যাত্মিক বিষয়ের ওপর বক্তৃতাগুলিও লীলাবতীকে ভিতর থেকে আলোড়িত করত। থোবার্নসের কাছ থেকে কেবল পুঁথিগত শিক্ষা নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পাঠও পেয়েছিলেন লীলাবতীরা। সংকীর্ণ চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে বৃহৎ এক জীবনের কথা ভাবতে শিখেছিলেন তাঁরা মিস থোবার্নসের কাছ থেকেই। এমনকি বিভিন্ন মহৎ কাজেও লীলাবতী মিস থোবার্নসের সঙ্গে যোগদানের সুযোগ পেয়েছিলেন। শহরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ছোট ছোট দরিদ্র মুসলিম মেয়েদের শিক্ষাদানের কাজে কিংবা প্রতি রবিবারের মহামেডান সানডে স্কুলে পড়াতে যাওয়ার কাজে মিস থোবার্নস লীলাবতীকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। মিস থোবার্নসের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ছাঁচেই নিজের জীবনের পথ গড়েছিলেন লীলাবতী, এমন কথা বললে এতটুকুও অত্যুক্তি হয় না।
পিতার অবসরের পর পরিবারে আর্থিক সংকট ঘনিয়ে এসেছিল, তখন লীলাবতী সিং হাইস্কুলের ছাত্রী। কিন্তু অর্থনৈতিক অস্বাচ্ছন্দ্যের কারণে নিজের পড়াশোনা ত্যাগ করতে রাজি ছিলেন না লীলাবতী। থোবার্নসের মুখে আমেরিকান মেয়েদের কথা শুনে, যারা নিজেরা কাজ করে নিজেদের খরচ চালায়, লীলাবতীও উদ্বুদ্ধ হন এবং নিজে পড়িয়ে উপার্জন করে সেই টাকায় স্কুলের ফী দিয়েছিলেন। সামান্য গরম জামাও সেসময় জোটা মুশকিল হয়ে পড়েছিল তাঁর, তবুও হার মানেননি। যখন তিনি কলেজ এন্ট্রান্স পাশ করলেন তাঁর রেজাল্ট এতই ভাল ছিল যে, তিনি সরকারী স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। এই সময়ের পর থেকে সমস্ত পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি, সেই অর্থ দিয়েই কলেজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছিলেন। সেসময় একজন ভারতীয় মহিলার পক্ষে কলেজ এন্ট্রান্স সার্টিফিকেট লাভ নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব। কলেজ এন্ট্রান্স পাশ করার পর তাঁর পরিবারের মনে হয়েছিল, তিনি যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন এবারে তাঁর বিয়ে করে নেওয়া উচিত। তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করবেন এমন স্বপ্ন তাঁর পরিবার কখনও দেখেনি, কিন্তু সেই স্বপ্ন ছিল লীলাবতীর চোখে এবং মিস থোবার্নসের কথা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
সেসময় ভারতবর্ষে খ্রিস্টান মেয়েদের পড়াশোনার জন্য কোন কলেজ ছিল না। ১৮৮৬ সালে অনেক অনুরোধ ও পরিকল্পনার পর মিস থোবার্নস প্রথম ভারতে মহিলাদের উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ শুরু করেছিলেন। তবে, অসুস্থ হয়ে পুনরায় থোবার্নসকে আমেরিকা চলে যেতে হয়, ফলত তাঁর অনুপস্থিতিতে জুনিয়র এবং সিনিয়র ক্লাসগুলি বন্ধ থাকে। সেসময় লীলাবতী কলকাতার বেথুন কলেজে পড়তে যান এবং সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। গ্র্যাজুয়েশনের পর ঢাকায় তিনি সরকারি স্কুলে এক বছর পড়িয়েছিলেন। ঢাকায় অনেক শিক্ষিত ভারতীয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। এতদিন তিনি মিশনের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও মিস ইসাবেলার আদর্শ তাঁর হৃদয়ে কিন্তু সক্রিয় ছিল।
সেসময় মিস থোবার্নস লক্ষ্ণৌতে তাঁর খ্রিস্টান কলেজে তাঁরই স্কুলের প্রাক্তন কৃতী ছাত্রী লীলাবতীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন শিক্ষকতা করবার জন্য। তখন পরিবারের দায়িত্ব ছিল লীলাবতীর কাঁধে, কিন্তু মিস থোবার্নস তাঁকে শিক্ষকতার জন্য যে পরিমান বেতনের কথা বলেছিলেন তা সংসার চালানোর পক্ষে যথেষ্ট কম ছিল। তবুও তিনি থোবার্নসের প্রস্তাবকে নিজের গুরুর আদেশ মনে করে গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৯২ সালে লীলাবতী লক্ষ্ণৌতে সেই খ্রিস্টান মহিলা কলেজে শিক্ষক হয়ে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন সেই কলেজের একমাত্র ভারতীয় স্টাফ। ইউরোপীয় খ্রিস্টান শিক্ষকদের পাশাপাশি সেসময় একজন ভারতীয় খ্রিস্টানের সমমর্যাদা লাভ নেহাত মামুলি ব্যাপার ছিল না। প্রথম দিকে খাপ খাইয়ে নিতে অসুবিধা হলেও ক্রমে ক্রমে পড়ানোর দক্ষতায় তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই কলেজে সাহিত্য ও দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। তারমধ্যেই ১৮৯৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লীলাবতী অনার্সসহ এ.এম ডিগ্রি লাভ করেন। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম দুজন মহিলার মধ্যে তিনি ছিলেন একজন।
এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯০২ সালে ইসাবেলা থোবার্নসের মৃত্যু হলে তাঁর স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করা হয়েছিল লীলাবতীকে।
কলেজের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মিস থোবার্নসের সঙ্গে লীলাবতীও আমেরিকাতে গিয়েছিলেন। ১৮৯৯ ও ১৯০০ সালে আমেরিকা ট্যুরে লীলাবতী বেশ কিছু বক্তৃতা দিয়েছিলেন, এমনকি গানও গেয়েছিলেন। উইমেনস ফরেন মিশনারি সোসাইটির পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০০ সালে কার্নেগি হলে একটি কনফারেন্স আয়োজিত হয়েছিল, যার বিষয় ছিল ‘উওম্যান’স ওয়ার্ক ফর উওম্যান’। সেই সভাতেই গান গেয়ে হাততালি পেয়েছিলেন লীলাবতী। ১৯০৯ সালে লীলাবতী মহিলাদের জীবন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে একটি লেকচার ট্যুর করবার উদ্দেশ্য নিয়ে আবারও একবার গিয়েছিলেন আমেরিকাতে। কিন্তু সেবার গিয়ে র্যাডক্লিফ কলেজে তিনি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিলাভের জন্য প্রবেশ করেছিলেন।
লীলাবতী সিং ওয়ার্ল্ড স্টুডেন্টস খ্রিস্টান ফেডারেশনের মহিলা কমিটির সভাপতিত্ব করেন এবং ১৯০৭ সালে টোকিওতে সেই সংগঠনের সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্বও করেছিলেন। ১৯০৮ সালে তিনি ইউরোপ এবং ইংল্যান্ডে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন। ভারতীয় নারীদের বিশেষত খ্রিস্টান নারীদের শিক্ষার জন্য লীলাবতী সিং-এর অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য। তবে কেবলমাত্র নারীশিক্ষার প্রগতি বিষয়ে চিন্তা করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, ‘রফিক-ই-নিসওয়ান’ নামে নারীদের একটি সংবাদপত্রও সম্পাদনা করতেন। এমনকি অনুবাদের কাজেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বুকার. টি. ওয়াশিংটনের জীবনী গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন লীলাবতী।
মাত্র ৪০ বছর বয়সেই লীলাবতী আমাদের ছেড়ে চলে যান। ১৯০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় এক হাসপাতালে জরুরি এক অপারেশনের পর কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়, ক্রমে যা তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯০৯ সালের ৯ মে মাত্র ৪০ বছর বয়সে এই মহীয়সী মহিলা লীলাবতী সিং-এর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান