সববাংলায়

১৪ ডিসেম্বর ।। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস (বাংলাদেশ)

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশেই কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। পালনীয় সেই সমস্ত দিবসগুলির মধ্যে একটি হল ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ (Martyred Intellectuals Day)।

প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে এই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনটিতে পাকিস্তানি সেনা ও তার সঙ্গী বাংলাদেশী বাহিনী একযোগে বাংলাদেশের অগ্রণী শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসক, শিল্পী, সাংবাদিকদের মত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। এই উজ্জ্বল বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক এই দিনটি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দিন আহমেদ ১৪ ডিসেম্বর তারিখটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা চালু করেন। ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর সমান গুরুত্ব সহকারে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

বাঙালিদের সংস্কৃতি-ভাষার উপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের আগ্রাসন বহু আগে থেকেই বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদের কারণ হয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য তাঁদের আন্দোলন চলছিল পশ্চিন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্‌কালে পাকিস্তানি সেনা যখন বুঝতে পেরেছিল যে তারা এই যুদ্ধ জিততে পারবে না, তখনই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিককে দুর্বল করে দিতে তারা বহু বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পাশাপাশি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি সেনারা। শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার কারণ সম্পর্কে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ’-এ বলা হয়েছে, “এটা অবধারিত হয়, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, জাগিয়ে রাখেন তাঁদের রচনাবলীর মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে। একটি জাতিকে নির্বীজ করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেওয়া। ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অতর্কিতে, তারপর ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বর ১০ তারিখ হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রুতগতিতে।”

মুজিবনগর সরকারের এক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ডিসেম্বরের ২০ তারিখের আগে প্রায় ৩৬০ জন বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭১-এর ২৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত ‘বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি’র প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে পাক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী প্রায় ২০,০০০ বুদ্ধিজীবী নিধনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেইমত হত্যালীলা চলেনি। কারণ তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের গভর্নর হাউজে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে রাও ফরমান আলী ছাড়াও এই হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মঈনুদ্দিন। এছাড়া ছিলেন ব্রি.জে.আসলাম, ক্যাপ্টেন তারেক, কর্ণেল তাহের, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেইন প্রমুখ। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের ঢাকা বাংলা একাডেমি ১৯৯৪ সালে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ’ প্রকাশ করে যেখানে ২৩২ জন শহীদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। যদিও সেখানে বলা হয় যে এই তালিকা সম্পূর্ণ নয়। ‘বাংলাদেশ’ নামের একটি সরকারি প্রকাশন সংস্থা তাদের রিপোর্টে জানাচ্ছে পাকিস্তানি আগ্রাসী বাহিনী ৬৩৭ জন প্রাথমিক শিক্ষক, ২৭০ জন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজ শিক্ষককে হত্যা করেছিল নির্বিচারে। অধ্যাপক জি সি দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশেদুল হাসান, ড. আনোয়ার পাশা, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, নিজামউদ্দীন আহমেদ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, সাহিত্যিক সেলিনা পারভীন সহ আরো বহু বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ছাড়াও মো. মূর্তজা, ড. আবুল খায়ের, অধ্যাপক রশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, সিরাজুল হক ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য সহ বহু মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে খুন করা হয়। তাঁদের ক্ষতবিক্ষত লাশ ও কবরগুলি মিরপুর ও রায়ের বাজারে এবং তেজগাঁওয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও ঢাকার টিবি হাসপাতালের পিছনে ইতস্তত পাওয়া গিয়েছিল। যদিও বহু লাশ পাওয়াই যায়নি, কিছু লাশ এমনভাবে পচে গিয়েছিল যে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মিরপুর ও রাজারবাগের বধ্যভূমিতে নিহতদের আত্মীয়রা কবর শনাক্ত করেন। বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ মেধাশূন্য করতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাশেম এবং ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ছিলেন প্রধান দুই কর্মরত অফিসার। মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মৌলানা আব্দুল মান্নান-এর সঙ্গে এই দুই অফিসারের গোপন সভা হয়, সেখানেই সম্ভবত এই বিরাট হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা স্থির হয়েছিল। একাত্তরের এই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের গণকবরের স্মৃতিসৌধ স্থাপিত হয় ঢাকার রায়ের বাজারে ১৯৯৭ সালে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading