বঙ্গের লোকসংস্কৃতি বৈচিত্র্যে ভরপুর। অনেক প্রাচীনকাল থেকে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই লোকসংস্কৃতির কোনও কোনও ধারা বর্তমানকাল পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে প্রাচীন লোকঐতিহ্যের অধিকাংশটাই বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের একেকটি প্রান্তে একেকজন লোকদেবতার প্রাধান্য, যেমন উত্তরবঙ্গে লোকদেবতার মধ্যে প্রাধান্য পান মাসান ঠাকুর (Masan Thakur)। আরও বিশেষভাবে বললে, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এই দেবতার পূজার ব্যাপক চল রয়েছে। দেবতার চেয়েও বেশি মাসান ঠাকুর উপ বা অপদেবতা হিসেবেই পরিচিত। ভক্তির চেয়েও আসলে একরকম ভয় থেকেই মাসান ঠাকুরকে সন্তুষ্ট রাখবার জন্য তাঁর পূজা করেন মানুষ। হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষও মাসান ঠাকুরের পূজা করে থাকেন। মাসান ঠাকুরকে নিয়ে কিংবদন্তি অনেক ছড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন লোকগবেষক মাসান ঠাকুরকে নিয়ে বিবিধ সব তত্ত্ব ও তথ্যের উপস্থাপনা করেছেন।
উত্তরবঙ্গ এবং আসামের রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মাসান ঠাকুরের পূজার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। তবে নেপালের ঝাপামোরাং, বঙ্গাইগাঁও, নলবাড়ি প্রভৃতি জেলাতেও মাসান ঠাকুরের পূজা হতে দেখা যায়। এই মাসান ঠাকুরের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে নানারকম কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন কিংবদন্তি এবং লোকগাথা অনুসারে, মা কালীর আঠারোটি সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান হলেন মাসান ঠাকুর। মাসানের জন্ম সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষক চারুচন্দ্র সান্যাল ‘রাজবংশীস অব নর্থ বেঙ্গল’ বইতে লিখেছিলেন যে, মাসান হলেন ধর্মঠাকুর এবং মা কালীর সন্তান। এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, যে মাসান ঠাকুরের জন্মকথা বিষয়ক একটি ছড়া প্রচলিত রয়েছে— “নাচিতে নাচিতে কালী/ চুঁইয়া পড়ে ঘাম/ তাতে সৃষ্টি হইল/ এ জলা মাসান।” গবেষক দিলীপকুমার দে-র মতো কেউ কেউ এই ছড়ার সরল অর্থ করে বলেন যে আনন্দে নাচতে নাচতে মা কালীর যেসব ঘর্মবিন্দু পড়েছিল তা থেকেই মাসানের জন্ম, কিন্তু এই ছড়াটির আরেকরকম মানে পাওয়া যায়, সেই মতে, বিবস্ত্রা মা কালীকে দেখে ধর্ম ঠাকুরের ধাতুস্খলন হলে তা থেকে মাসান ঠাকুরের জন্ম হয়। এই দ্বিতীয় অর্থটির প্রসঙ্গে মনসার প্রচলিত ও জনপ্রিয় জন্মবৃত্তান্তটি মনে পড়তে পারে। কোচবিহারের সিতাই অঞ্চলের মানুষদের বিশ্বাস যে, মাসান হলেন বুড়ি মায়ের সন্তান। এমনই বিচিত্র সব জন্মবৃত্তান্তের তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে।
রাজবংশীদের মধ্যেই এমন বিশ্বাস রয়েছে যে, আসলে শ্মশানে-মশানে বিচরণকারী শিবই ক্রমে মাসান ঠাকুরে পরিণত হয়েছেন। পূর্বে নাকি মাসান পূজা শ্মশানেই হত এবং সেই শ্মশান থেকেই দেবতার নাম হয়েছে মাসান। অন্যদিকে গবেষক গিরিজাশঙ্কর রায় বলেছেন, মাসান হলেন কুবেরেরই আরেক রূপ। দিনহাটার আলোকবাড়ি গ্রামে মাসানকে কুবের হিসেবেই পূজা করা হয়ে থাকে। আবার রাজবংশীদের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, কুবেরের দ্বাররক্ষী যক্ষই আসলে মাসান ঠাকুরের আরেক রূপ। এই সূত্র ধরে অনেকে মনে করে থাকেন যে মাসান হলেন যক্ষ ও যক্ষীর পূত্র।
এমন কিংবদন্তি আছে যে, মাসানের জন্মের পর তার ধাইমা তার নাড়িকুন্ডলীটি জলে ফেলে দিয়েছিল এবং তা থেকেই নাকি কলমী শাকের জন্ম হয়েছিল। সেইজন্যেই ভাদ্রমাসে রাজবংশীদের অনেকেই কলমী শাক খায় না৷
এমনই কিংবদন্তিতে ভরপুর এই লৌকিক দেবতা আদতে উপ বা অপদেবতা হিসেবেই অধিক পরিচিত। ভক্তির থেকেও হয়ত মানুষ তাঁকে ভয় পায় বেশি। মাসান ঠাকুর উপকারী এবং অপকারী এই দুই রূপেই মানুষের মনে বিরাজমান। রাজবংশীদের মধ্যে মাসান ঠাকুরে ভর করার একটা ব্যাপার প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করে থাকেন যে, শনিবার বা মঙ্গলবার বা অমাবস্যার সময়ে মাসান ঠাকুরের কোপ পড়ে। যার ওপরে মাসান ঠাকুর ভর করেন সে অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে। তুড়ি মারে, ঢিল ছোঁড়ে, প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, মাঝরাতে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ে, এমনকি উনুনের মাটি, কাঠকয়লা, দেওয়ালের কাঁকড় ইত্যাদি খেতে থাকে। সেই ব্যক্তিকে তখন মাসান ঠাকুরের থানে এনে দেবতার উদ্দেশে পূজা দেওয়া হয়। মাসানের কুদৃষ্টি যাতে কারও ওপর না পড়ে মানুষ তাই শনিবার, মঙ্গলবার বা অমাবস্যায় মাসান ঠাকুরের পূজা করে থাকেন। মাসান ঠাকুর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারেন বলেই বিশ্বাস। বঙ্গদেশে মোট আঠারো রকম মাসান ঠাকুর পূজিত হন, যদিও কারও মতে ১৯, কেউ বা বলেন ২৪। মাসানের আঠারোটি প্রকার হল— বাড়ি কা মাসান (লোকালয়ের অন্তর্গত বাঁশবন বা জঙ্গলে থাকেন), তিসিলা মাসান (জলে থাকেন), ঘাটিয়া মাসান (নদী, পুকুর ইত্যাদির ঘাটে যাঁর বাস), চুঁচিয়া মাসান (মাঠে, ঘাটে যিনি থাকেন), চালান মাসান (পথের পাশের গাছে থাকেন), বহিতা মাসান (নষ্ট হয়ে যাওয়া ভেলার কলাগাছ যা জলে ভেসে যায়, তাতে থাকেন। সেই কলাগাছে পা দিলে মাসান ভর করেন), কাল মাসান (শ্মশানে থাকেন), কুহুলিয়া মাসান (গাছে থাকেন এবং কোকিলের মতো ডাকেন। সেই ডাকে সাড়া দিলে ভর করেন তিনি। নিশিডাকের সঙ্গে এর কিছুটা সাযুজ্য রয়েছে), নাঙ্গা মাসান (উলঙ্গ হয়ে থাকেন এবং এঁর দেখা পেলেই মৃত্যু ঘটে মানুষের), বিষুয়া মাসান (এই মাসান ভর করলে মানুষের সর্বাঙ্গে বিষবেদনা হয়), ওবুয়া মাসান (ইনি ভর করলে মানুষ কেবল বমি করে), শুকনা মাসান (এই মাসানের ভরে মানুষ ক্রমে রোগা হতে থাকে), ভুলা মাসান (এই মাসান মাঠে থাকেন এবং রাত্রে পথিকের পথ ভুলিয়ে দেন। এরসঙ্গে আলেয়ার কিঞ্চিৎ মিল রয়েছে), ড্যামশা মাসান (ঘন জঙ্গলে এই মাসানের বাস), অঙ্গিয়া মাসান (ইনি বহুরুপী), ছলনার মাসান (ছল করে পথ ভোলান), ন্যাড়া মাসান (এই মাসানকে দেখতে রোগা, ন্যাড়া এক বালকের মতো) এবং কলি মাসান (এই মাসান গ্রামের মধ্যেই নির্জনে বসবাস করেন)। অনেকে আরেকরকম মাসানের কথা বলেন, যাঁর নাম এলিয়া মাসান, যিনি স্বপ্নে মানুষকে আক্রমণ করেন। অবশ্য এছাড়াও আরও অনেকরকম মাসান রয়েছে, যেমন, কুশিমারি মাসান, সিংহ মাসান, মুড়িয়া মাসান, সুন্দরমালা মাসান প্রভৃতি।
মাসান ঠাকুরের মূর্তিরও নানা রকমফের লক্ষ করা যায়। তবে সর্বক্ষেত্রেই মাসান ঠাকুরের বিগ্রহ বিকটদর্শন। একটি মতে, নদীতে ধর্মঠাকুরের ধাতুস্খলনের ফলে যেহেতু মাসানের জন্ম তাই মাছকে তাঁর সহচর বলা হয়। সেই কারণে মাছের পৃষ্ঠের ওপর দন্ডায়মান মাসানমূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও কোথাও হাতি, কোথাও কচ্ছপ, কোথাও-বা সিংহকে মাসানের বাহনরূপে দেখতে পাওয়া যায়। বেশ কিছু জায়গায় বাহন হিসেবে ভেড়াও দেখা যায়। অনেকক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায় মাসান ঠাকুর পদ্মাসনে বসে আছেন। কোথাও কোথাও মাসান ঠাকুরের রঙ হয় কালচে অথবা নীল। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাসান ঠাকুরের মাথায় ঝাঁকড়া চুল, একটা ফেট্টি বাঁধা মাথায়, মোটা গোঁফ, শরীরও মোটা এবং হাতে গদা থাকে। এমনকি বুকের মাঝখানে বড় বড় একজোড়া চোখ আঁকা বিগ্রহও খুবই প্রচলিত। কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের একাংশে মাটি দিয়ে মাসান ঠাকুরের বিগ্রহ তৈরি হয়, আবার জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের বেশ কিছু স্থানে বিগ্রহ তৈরি হয় শোলা দিয়ে। নেপালে আবার রাজবংশী ও ধামাল জনজাতির মানুষ মাটির ঢিবি বা পাথরের খন্ডকেই মাসান ঠাকুর জ্ঞানে পূজা করা থাকেন। আবার উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় একটি বিশেষ মুখোশকে মাসান ঠাকুর হিসেবে সেখানকার মানুষ পূজা করেন। অনেক জায়গাতেই মাসানকে উগ্ররূপে পূজা না করে তুলনামূলক নরম স্বভাবের একজন দেবতার রূপেই পূজা করা হয়। সেসবক্ষেত্রে মাসান ঠাকুরকে ঘোড়ার পিঠে চড়া অবস্থায় দেখা যায়।
উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের দেউসি, ওঝা, কীর্তনীয়া ইত্যাদি পূজক সম্প্রদায় মাসান ঠাকুরের পূজা করে থাকেন। মূলত ভাদ্রমাসে তাঁর পূজা হলেও এমনিতে সারা বছরই মাসান ঠাকুরের পূজা হয়ে থাকে। দীপান্বিতা অমাবস্যাতেও কোথাও কোথাও পূজা হয় তাঁর। পূজার উপকরণের মধ্যে দেখা যায় চালভাজা, সাটিমাছ পোড়া, কলা, দুধ, ঘি, ঝাঁটার কাঠি ইত্যাদি সব জিনিস। মাসান ঠাকুরের পূজার স্থানে লাল একটা পতাকা বা নিশান লাগানো বাঁশ বা লাঠি পোঁতা থাকে।পূজকেরা লৌকিক মন্ত্রও উচ্চারণ করেন মাসান ঠাকুরকে তুষ্ট করবার জন্য।
উল্লেখ্য যে, কেবল হিন্দুধর্মের মানুষেরাই নন, মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষও কিন্তু মাসান ঠাকুরের পূজা করেন। হিন্দু-মুসলিম ছাড়াও বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির মানুষ আসেন মাসান ঠাকুরের থানে এবং এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি সেখানে ফুটে ওঠে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘উত্তরবঙ্গে রাজবংশী সমাজের দেবদেবী ও পূজা-পার্বণ’, গিরিজাশংকর রায়, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৫।
- https://www.anandabazar.com/
- https://www.shabdodweep.co.in//
- https://drishtibhongi.in//
- https://bengali.news18.com/


আপনার মতামত জানান