বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাস পর্যালোচনা করতে বসলে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের নাম উঠে আসে যাঁদের বাদ দিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয় না। তেমনই একজন মানুষ হলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (Muhammad Habibur Rahman)। বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি হিসেবেই অনেকে তাঁকে চিনলেও, সেটুকুই শুধু তাঁর পরিচয় নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি কাজ করেছেন যেমন তেমনই ইতিহাস ও আইনের শিক্ষক হিসেবেও তাঁর পরিচয় বিদ্যমান। ভাষা আন্দোলনের একজন উল্লেখযোগ্য যোদ্ধা ছিলেন হাবিবুর। রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সাহিত্যসহ আরও নানান বিষয়ে লিখেছেন অজস্র যুক্তিশীল গ্রন্থ। লিখেছেন অভিধান। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রবর্তন করা নিয়ে লড়াইও চালিয়েছিলেন তিনি। একুশে পদক পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল তাঁকে।
১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের জন্ম হয়। তাঁর পিতা মৌলভী জহিরুদ্দিন বিশ্বাস নিজেও পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। তবে আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি জহিরুদ্দিন কিন্তু আবার সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি প্রথমে আঞ্জুমান এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগ আন্দোলনের সাংগঠনিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জহিরুদ্দিন জাতীয় যুক্তফ্রন্টের বিভাগীয় নেতার দায়িত্ব সামলেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জহিরুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বহরমপুর জেলে পাঠালেও অল্পদিন পরেই মুক্তি পান তিনি। স্বাধীনতার ফল হিসেবে দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে প্রথমে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পরে সেখান থেকে রাজশাহী স্থানান্তরিত হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন।
হাবিবুর রহমানের মা গুল হাবিবা ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরের মেয়ে। এই শ্যামপুরে অবশ্য হাবিবুর রহমানের শৈশবেরও অনেকখানি কেটেছিল। হাবিবুর রহমানের স্ত্রী-র নাম ইসলামা রহমান।
প্রাথমিকভাবে জঙ্গীপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ার পর মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে আই.এ পাশ করেন তিনি। এই দুইস্তরের পড়াশোনা শেষ করবার পরে উচ্চশিক্ষার জন্য হাবিবুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স-সহ বি.এ পাশ করেন তিনি এবং ১৯৫১ সালে সেখান থেকেই স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন সফলভাবে। ইতিহাসের পর তিনি আইনবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ১৯৫৫ সালে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এল.এল.বি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডে পড়ার জন্য বৃত্তি পান তিনি। ১৯৫৮ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরচেস্টার কলেজ থেকে আধুনিক ইতিহাসে বি.এ (অনার্স) ডিগ্রি এবং ১৯৬২ সালে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এর মাঝে অবশ্য ১৯৫৯ সালে লিঙ্কনস ইন থেকে বার অ্যাট ল’ সম্পন্ন করে ইংলিশ বারে কিছুদিন আইনচর্চা করেছিলেন।
হাবিবুর রহমানের শিক্ষাজীবন অনেকখানি দীর্ঘ হলেও তার মধ্যেই কিন্তু তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৫১ সালে প্রগতিশীল ফ্রন্ট এবং তারপর ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার সময় তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ইতিহাসে বিএ এবং এমএতে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও ডিআইবি রিপোর্টের জন্য তাঁর চাকরি পেতে অসুবিধা হয়েছিল। ফলে তিনি প্রতিবাদের একটি অভিনব পন্থা আবিষ্কার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে তিনি সিগারেট বেচতে শুরু করেন। অবশেষে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অস্থায়ী লেকচারার হিসেবে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। জানা যায় যে, তিনি পাবনার সিরাজগঞ্জ কলেজ ও জগন্নাথ কলেজেও ইতিহাসের অধ্যাপনা করেছিলেন। ১৯৫২ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। বাংলা ভাষার উপর উর্দু আগ্রাসন রুখতে বাংলাদেশের তরুণেরা যেভাবে লড়াই করতে এগিয়ে এসেছিল, প্রাণ দিয়েছিল তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গেও হাবিবুর রহমান কিন্তু জড়িত ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠভাবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই ভাষা আন্দোলনের একপ্রকার আঁতুড়ঘরই ছিল বলা যায়, ফলে এরসঙ্গে সহজেই যুক্ত হয়ে পড়া বাংলা ভাষাপ্রেমী হাবিবুর রহমানের পক্ষে ছিল খুবই সহজ। আন্দোলনের জেরে জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী প্রথম দলের একটি মিছিলের নেতৃত্ব দেন এবং তার পরেই গ্রেপ্তার হন। ওই দিন পুলিশ ও সংসদীয় বাহিনী ব্যাপক কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে এবং শেষ পর্যন্ত গুলি চালায়। ফলস্বরূপ, বেশ কিছু ছাত্র নিহত হয়, শত শত আহত হয় এবং হাজার হাজার ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে হাবিবুর ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৬১ সালে তিনি আইন অনুষদের ডিন হন এবং ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের রিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালেই শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে দিয়ে আইনচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং সেটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন হাবিবুর। ১৯৬৪ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্ট বারে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে সহকারী অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং ১৯৭২ সালে হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস-প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলেরও সদস্য হয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৭৬ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি পদে আসীন হন হাবিবুর। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের বিচারপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৯০-৯১ সালে শাহাবুদ্দিন আহমেদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় হাবিবুর সুপ্রিম কোর্টের ভারপ্রাপ্ত বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ১৯৯৫ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। খুব বেশিদিন অবশ্য এই পদের দায়িত্বে থাকেননি তিনি। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রবর্তনের জন্য তাঁর প্রয়াস অবশ্যই স্মরণীয়। এছাড়াও সংবিধান সংশোধনী, নাগরিকত্ব, হেবিয়াস কর্পাস, কোর্টের এক্তিয়ার ইত্যাদি বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর রায় প্রশংসিত হয়েছিল৷
এখানে উল্লেখ্য ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি থাকার সময় থেকেই মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বিভিন্ন দেশে আয়োজিত আইনজীবী ও বিচারকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থেকেছেন। ১৯৯১ সালে উপস্থিত ছিলেন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চীফ জাস্টিসদের সম্মেলনে, ১৯৯২ সালে ছিলেন নাইজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত চতুর্থ কমনওয়েলথ চীফ জাস্টিসদের সম্মেলনে, ১৯৯৫ সালে ছিলেন নেপালে আয়োজিত প্রথম সার্ক চীফ জাস্টিসদের সম্মেলনে। এছাড়াও ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের আইনজীবীদের ও মানবাধিকার সম্মেলনে উপস্থিত থেকেছেন তিনি।
১৯৯৫ সালের ৩০ এপ্রিল প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন হাবিবুর। ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে এটি হল ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর পদ। ১৯৯৬ সালে তিনি দক্ষতার সঙ্গে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।
একজন গবেষক ও লেখক হিসেবেও মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লিখিত গ্রন্থগুলিকে খুবই মূল্যবান বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ সংক্রান্ত তাঁর গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ‘মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্র-রচনার রবীন্দ্র-ব্যাখা’, ‘রবীন্দ্র কাব্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য’ ইত্যাদি। তিনি বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার বা অভিধান রচনা করেছিলেন যেটির নাম ‘যথাশব্দ’। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘ল অব রিকুইজিশন’, ‘বচন ও প্রবচন’, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক’, ‘কলম এখন নাগালের বাইরে’, ‘কোরান শরীফের সরল বঙ্গানুবাদ’, ‘প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে’, ‘এক ভারতীয় বাঙালির আত্মসমালোচনা’, ‘সৃজনশীল গণতন্ত্র’, ‘ইতিহাস বিষয়ক’, ‘রাজার চিঠির প্রতীক্ষায়’ ‘সুভাষিত’ ইত্যাদি। ‘আইন শব্দকোষ’ও রচনা করেছিলেন তিনি।
১৯৮৪ সালে সাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। ২০০৭ সালে তাঁকে ‘একুশে পদক’ দিয়ে সম্মান জানানো হয়। এছাড়াও আরও যেসব পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গবেষণা পরিষদ পুরস্কার, ইব্রাহিম মেমোরিয়াল পুরস্কার, অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার, স্পেশাল কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান রাইটস পুরস্কার ইত্যাদি।
বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির একজন ফেলো, লিঙ্কনস ইন-এর একজন বেঞ্চার এবং ওরচেস্টার কলেজের একজন অনারারি ফেলো ছিলেন হাবিবুর রহমান। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া)-এর চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে এক হাজারেরও বেশি বই সেই সংস্থাকে দান করেছিলেন।
মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের ফলে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে ডাক্তারেরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন৷ ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান ব্যক্তি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান