ধর্ম

জগন্নাথের নবকলেবর

ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরীধামে শ্রীজগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শন নিজেদের পুরানো রূপ ত‍্যাগ করে নতুন দেহ পরিগ্রহ করেন। এই কারণে কয়েক বছর পর পর তাঁদের নিম কাঠের তৈরি বিগ্রহ বদলে ফেলা হয়। এই রূপান্তরকেই নবকলেবর বলা হয়।ভাগবদ্গীতায় বলা হয়, সকল প্রাণীই ক্রমশ শৈশব, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক‍্যে আসে এবং পরিশেষে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করে নতুন শরীরে প্রবেশ করে। ভক্তদের বিশ্বাস, জগন্নাথদেবের নবকলেবর এই গভীর সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করে।

যে বছরে আষাঢ় মাস মলমাস অর্থাৎ আষাঢ় মাসে দুবার অমাবস্যা পড়ে, সেই বছরে নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী নানা রত্ন দ্বারা নির্মিত মূর্তির আয়ু সাধারণত দশ হাজার বছর হয়, ধাতব মূর্তির আয়ু সাধারণত এক হাজার বছর হয়, কাষ্ঠ নির্মিত মূর্তির আয়ু বারো থেকে আঠারো বছর এবং মৃত্তিকা নির্মিত মূর্তির আয়ু সাধারণত একবছর। সেই সূত্র মেনেই প্রতি আট বা উনিশ বছর পর নবকলেবর উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মোটামুটি ভাবে চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের দশমী থেকে নবকলেবর উৎসব শুরু হয়।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মহাভারতের যুদ্ধ শেষে দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের চরণকে পাখি ভেবে ভুল করে এক শবর বাণ মেরেছিল, যার ফলে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দেহ সৎকারের পর যখন নাভিদেশ পুড়ছিল না, তখন দৈববাণী অনুসারে অর্জুন সেই নাভিদেশ সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন। সমুদ্রে ভেসে চলা সেই নাভি দেখে সমুদ্রের তীর ধরে সেই শবর ছুটতে ছুটতে দ্বারকা থেকে পুরী চলে আসেন। তারপর শ্রীকৃষ্ণ তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাঁর নাভিদেশ সমুদ্র থেকে তুলে নিতে বলেন। সঙ্গে এও জানান তিনি সেই শবরের বংশধরদের হাতে নীলমাধব রূপে পূজিত হবেন। সেই থেকে শবরেরা বংশপরম্পরায় নীলমাধবের পূজা করে থাকে। স্কন্দপুরাণ ও ব্রহ্মপুরাণ অনুযায়ী রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন কাষ্ঠ নির্মিত মূর্তি তৈরি করেন। ইন্দ্রদ্যুম্নের আমলে শবররাজ বিশ্ববসু নীলমাধবের পূজা করছিলেন। তাঁর উত্তরসূরীদের দৈতাপতি বলা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী দৈতাপতিদের ঈশ্বরের বংশধর বলে মান্য করা হয়।

নবকলেবর ঠিক কবে প্রথম শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। মাদলাপঞ্জি অনুসারে, রক্তবাহু ভৌমকারা রাজ্যের শোভনদেবের শাসনকালে পুরী আক্রমণ করেছিলেন। সেই সময় পুরোহিতেরা জগন্নাথ বিগ্রহকে শোনপুরে নিয়ে যায় এবং পাতালে লুকিয়ে রাখে। সোমবংশ রাজত্বের রাজা যযাতি কেশরী (১) ১৪৪ বছর পরে শ্রী জগন্নাথ দেবকে পুরীতে ফিরিয়ে আনেন এবং সর্বপ্রকার নিয়ম রীতি মেনে নতুন বিগ্রহ তৈরি করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি বিগ্রহস্থ আত্মাকে নবকলেবরে স্থাপন করেন। সুতরাং এই মতানুযায়ী দশম শতাব্দীতেই প্রথম নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথ বিশেষজ্ঞ পদ্মশ্রী সত্যনারায়ণ রাজগুরুর মতে প্রথম নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয় ১৩০৮ সালে। কিন্তু অন্যান্য সূত্র বলে, প্রথম নবকলেবর অনুষ্ঠান হয়েছিল ১৫৭৪ সালে। ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৫৯৩ সালে। তবে সপ্তদশ শতকে পাঁচবার নবকলেবর হয়েছিল, সালগুলি হল যথাক্রমে ১৬০৪, ১৬২৭, ১৬৪৬, ১৬৬৫ এবং ১৬৮৪। উনিশ শতকে যথাক্রমে ১৮০৯, ১৮২৮, ১৮৫৫, ১৮৭৪ এবং ১৮৯৩ সালে জগন্নাথদেবের নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বিংশ শতকে এখনও যথাক্রমে ১৯১২, ১৯৩১, ১৯৫০, ১৯৬৯, ১৯৭৭, ১৯৯৬ এবং ২০১৫ সালে নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যে মাসে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, সেই মাসে চারটি পক্ষ হয়। এই অনুষ্ঠানের জন্য প্রত্যেকটি পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম পক্ষে বিগ্রহকে ‘নির্মলা মন্ডপে’ খোদাই করা হয়। পরের দুই পক্ষকে মলমাস বলা হয়। দৈতাপতিরা দ্বিতীয় পক্ষকে ঈশ্বরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য চিহ্নিত করেন। তৃতীয় পক্ষতে রেশমি কাপড়ে বিগ্রহকে জড়িয়ে রেখে অনবসর কর্তব্য করা হয়। এর পরেই ঈশ্বরের নবকলেবরে প্রতিষ্ঠা করা হয় আত্মা বা ব্রহ্মাকে, যা এতদিন পুরানো বিগ্রহের মাঝে অধিষ্ঠিত ছিল।

মন্দিরে স্নান পূর্ণিমার দিন পুরনো বিগ্রহগুলির স্নান উৎসবের পরে শুরু হয় নবকলেবরের যজ্ঞ। তারপরেই শুরু হয় নতুন মূর্তিগুলির নির্মাণকাজ। সূত সংহিতার নিয়ম মেনে একান্ত গোপনে কৈলী বৈকুণ্ঠে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠেন নতুন জগন্নাথ। মূর্তি নির্মাণ শেষ হয় ত্রয়োদশীতে। তখন যজ্ঞেরও পূর্ণাহুতি দেওয়া হয়। এর পরের দিনই নিশীথে ‘ব্রহ্মবস্তু’ জগন্নাথের নতুন কলেবরে স্থাপন করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী পুরনো বিগ্রহগুলি নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। তাদের সমাধি দেওয়া হয় কৈলী বৈকুণ্ঠেই।

নবকলেবর চৈত্র শুক্লা দশমীতে অনুষ্ঠিত বাণযজ্ঞ যাত্রার আগে হয়। কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণযুক্ত বৃক্ষের খোঁজে ৫০ জন পরিচারক দিকে দিকে যাত্রা করে। বিগ্রহের জন্য নিম কাঠ প্রয়োজন। যে নিমবৃক্ষ ৭ থেকে ১২ হাত দীর্ঘ হবে ও গাঢ় রঙ- যুক্ত হবে। গাছের মধ্যে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম চিহ্ন থাকতে হবে। এই গাছের একটি প্রধান কান্ড থাকবে এবং একে আরও চারটি অপ্রধান শাখাযুক্ত হতে হবে। এখানে কোনো রকম পাখির বাসা অথবা লতা জাতীয় গাছ থাকতে পারবে না, অথবা গাছটি বজ্রপাতদুষ্ট হতে পারবে না। এই গাছের পাদদেশে সর্পগৃহ বা পিঁপড়ের ঢিবি থাকা প্রয়োজন। গাছের অবস্থান কোনো নদী বা সরোবরের পাশে থাকা দরকার। তিনপাহাড় বা তিন পথ বিশিষ্ট স্থানে এটির অবস্থান হতে হবে। কাছাকাছি শিব মন্দির অথবা কবরস্থান থাকা প্রয়োজন। সুদর্শনের জন্য যে গাছ প্রয়োজন তা অপেক্ষাকৃত রক্তবর্ণ হওয়া উচিত। বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহের জন্য গাছের রঙ অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়া দরকার।

গাছ চিহ্নিত করার পরে হোম যজ্ঞ করা হয় এবং গাছ কাটা শুরু হয়। মাপ মতন কেটে নেওয়ার পরই কাষ্ঠ খণ্ড গুলিকে মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। কৈলীবৈকুন্ঠতে দৈতাপতিদের তত্ত্বাবধানে বিগ্রহ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিগ্রহ সম্পূর্ণ তৈরি হলে জ‍্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমায় তাদের গর্ভগৃহের স্নান বেদীতে ১০৮ কলস জল ঢেলে স্নান করানো হয়। এই সময় জগন্নাথ দেব অসুস্থ থাকেন। ১৫ দিনের জন্য দর্শন থেকে বঞ্চিত হয় মানুষ। এরপরে বিগ্রহকে নানা ঔষধি দিয়ে লেপন করা হয়। তারপর নতুন বিগ্রহ এবং পুরানো বিগ্রহকে মুখোমুখি বসানো হয়। সম্পূর্ণ সুরক্ষার মধ্যে দৈতাপতির পরিবারের সর্বপ্রাচীন তিন সদস্য চোখে, মুখে, হাতে,পায়ে বস্ত্রখন্ড বেঁধে,পুরনো বিগ্রহে অবস্থিত আত্মা বা ‘ব্রহ্ম’ কে নব বিগ্রহে স্থাপন করেন। ‘ব্রহ্মবস্তু’ ঠিক কী, তা দৈতাপতিরাও সঠিকভাবে বলতে পারেন না। বিগ্রহ সম্পূর্ণ হয় চোখ আঁকার পরে। পুরানো বিগ্রহ কৈলীবৈকুণ্ঠতে সমাধিস্থ করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ষট পঞ্চমী ব্রত



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন