শাহাবুদ্দিন আহমেদ

শাহাবুদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং এককালের প্রধান বিচারপতি হিসেবেই সুপরিচিত শাহাবুদ্দিন আহমেদ (Shahabuddin Ahmed)। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে পরাজিত করে সর্বসম্মত মনোনীত প্রার্থী হিসেবে শাহাবুদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯১ সালে নির্দল সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলে এই দলের প্রার্থী হিসেবেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি পদে বহাল ছিলেন।

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়ায় পামাল গ্রামে শাহাবুদ্দিন আহমেদের জন্ম হয়। তাঁর বাবা তালুকদার রেসাত আহমেদ ভুঁইয়া একজন জনদরদী সমাজসেবী ছিলেন। পরবর্তীকালে আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই পুত্র এবং তিন কন্যা সন্তান জন্মায়।

ম্যাট্রিকুলেশন এবং ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাশ করার পরে ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সেখান থেকে ১৯৫১ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ তিনি এবং ১৯৫২ সালে ফজলুল হক হলের ছাত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (IR) বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাহাবুদ্দিন জন প্রশাসন (Public Administration) বিষয়েও একটি বিশেষ কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং লাহোর সিভিল সার্ভিস অ্যাকাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ করে পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস দপ্তরে যোগ দেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। গোপালগঞ্জ এবং নাটোর মহকুমার মহকুমা শাসকের পদে বহাল হন তিনি। এর পাশাপাশি তিনি ফরিদপুরের ডেপুটি কমিশনার পদেও আসীন ছিলেন। ১৯৬০ সালে বিচার বিভাগীয় শাখায় তাঁর বদলি হয়। ঢাকাবরিশালের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারপতি হিসেবে এবং কুমিল্লাচট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা বিচারপতি হিসেবে কাজে যোগ দেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা উচ্চ আদালতের করণাধ্যক্ষ (Registrar) হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি উদ্দ আদালতের বেঞ্চে উন্নীত হন তিনি এবং ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে শ্রম আপীল ট্রাইবুন্যালে ডেপুটেশনের ভিত্তিতে কাজ করেছেন। ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের একজন বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি এবং ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল এই অফিসে স্থায়ী পদ পান। তদন্ত কমিশন আইনের ভিত্তিতে গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বহাল থেকে ১৯৮৩ সালে ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনার তদন্ত করেছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ১৯৮৪ সালে শাহাবুদ্দিন আহমেদ জাতীয় বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বেতনক্রমের উর্ধ্বসীমা বাড়ানোর ব্যাপারে সরকার অগ্রণী হয়।

১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি শাহাবুদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গণবিদ্রোহের চাপে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং উপরাষ্ট্রপতি মৌদুদ আহমেদ উভয়েই পদত্যাগ করেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি পদে বহাল করা হয়। পরে এরশাদের পদত্যাগের পরে বাংলাদেশের কার্যকরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে। সকল রাজনৈতিক দলগুলি সর্বসম্মতিক্রমে শাহাবুদ্দিন আহমেদকে নির্বাচিত করেছিল এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ে ওঠে এভাবেই। ১৯৯০ সালের ৯ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে তাঁর উপদেষ্টা পরিষদে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। পরে ঐ বছরই ১৫ ডিসেম্বর প্রথম বৈঠক পরিচালনা করেন শাহাবুদ্দিন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে শাহাবুদ্দিন আহমেদ সংসদীয় শাসন ক্ষমতা তিনি খালেদা জিয়ার হাতে হস্তান্তরিত করেন। ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অব্যাহতি নেন তিনি। এরপরে পুনরায় তিনি প্রধান বিচারপতির পদে আসীন হন এবং ১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেই পদ থেকে অবসর নেন তিনি।

১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ঐ বছরই ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সংসদীয় নির্বাচনে পরাজিত হলে শেখ হাসিনা তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলে মন্তব্য করেন। ফলে শাহাবুদ্দিন পরে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন যে তাঁদের ইচ্ছানুসারে করা যে কোনও কাজের জন্যেই তিনি ছিলেন স্বয়ং দেবদূত, অন্যথায় তিনিই স্বয়ং শয়তানে পরিণত হতেন।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বপালনের পাশাপাশি ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাস থেকে ১৯৮২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান পদে আসীন ছিলেন তিনি। শাহাবুদ্দিন আহমেদ বেশ কয়েকটি গ্রামীণ হাসপাতাল, মাতৃত্ব কেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপন করেছিলেন এবং সুইস রেড ক্রসের অর্থানুকূল্যে নেত্রকোনায় তিনি স্থাপন করেন ‘তেলিগাতি রেড ক্রস হাসপাতাল’। ১৯৭৯ সালে মরক্কোর ফেজ শহরে অনুষ্ঠিত ইসলামী দেশগুলির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দশম সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন শাহাবুদ্দিন যেখানে একটি আন্তর্জাতিক ইসলামিক রেড ক্রিসেন্ট প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। তাঁর উদ্যোগেই বাংলাদেশে প্রথম রেড ক্রসের প্রধান কর্মপরিকল্পনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তাঁর স্মৃতিতে ২০০৮ সালে ঢাকার গুলশানে একটি হ্রদের নামকরণ করা হয় ‘রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্ক’।

২০২২ সালের ১৯ মার্চ কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে শাহাবুদ্দিন আহমেদের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানান