ইতিহাস

মৈথিলী শরণ গুপ্ত

আধুনিক হিন্দি সাহিত্য তথা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি নাম হলেন মৈথিলী শরণ গুপ্ত (Maithili Sharan Gupta)। সাহিত্য জগতে তিনি ‘দাদ্দা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য কবিরা যখন ব্রজভাষাতেই কবিতা লিখতেন, তখন তিনি ব্রজভাষার একাধিপত্য অস্বীকার করে হিন্দি কবিতায় আনেন এক নতুন ধারা। খড়িবোলিতে হিন্দি কবিতা লেখার ক্ষেত্রে মৈথিলী শরণ গুপ্ত এক অনন্য পদক্ষেপের সূচনা করেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন জাতিয়তাবাদী। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে ‘রাষ্ট্রকবি’ আখ্যা দেন।

১৮৮৬ সালের ৩ আগস্ট উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসির চিরগাঁওতে ( Chirgaon, Jhansi, Uttarpradesh) গাহোই সম্প্রদায়ের কাংকানে জমিদার বংশে মৈথিলী শরণ গুপ্তের জন্ম হয়। জমিদার বংশে জন্ম হলেও তাঁর জন্মের সময় তাদের অবস্থা পড়ে গিয়েছিল। তাঁর বাবার নাম ছিল শেঠ রামচরণ গুপ্ত (Seth Ramcharan Gupta) এবং মায়ের নাম ছিল (Kashibai)।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল না। তাই বাড়িতেই তাঁর পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন মহাবীর প্রসাদ দ্বিবেদী (Mahavir Prasad Dwivedi)। তাঁর কাছে মৈথিলী শরণ গুপ্ত সংস্কৃত, ইংরেজি এবং বাংলা পড়তেন।

১৮৯৫ সালে সরজু দেবীর (Sarju Devi) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি বুন্দেলখন্ডের অভিজাত পরিবারের সদস্য দেওয়ান শত্রুঘ্ন সিংকে (Dewan Shatrughan Singh) পড়াতেন, যিনি পড়ে বুন্দেলখন্ড কেসরী (Bundelkhand Kesari) বা বুন্দেলখন্ড গান্ধী (Bundelkhand Gandhi) নামে পরিচিত হন।  

তিনি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করতেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো সরস্বতী। ১৯১০ সালে ইন্ডিয়ান প্রেস (Indian Press) থেকে তাঁর প্রথম বড় কাজ ‘রঙ্গ মে ভঙ্গ’ (Rang Mein Bhang) প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন তাঁর দেশপ্রে্মমূলক কবিতাগুলি স্বাধিনতাকামী মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।তাঁর ‘ভারত ভারতী’ (Bharat Bharati) প্রকাশিত হলে তা পড়ে মহাত্মা গান্ধী তাঁকে ‘রাষ্ট্র কবি’র উপাধি দেন।

তাঁর লেখায় পৌরাণিক প্রভাব চোখে পড়ার মতো।রামায়ণ, মহাভারত, বৌদ্ধ গল্প ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গ একাধিকবার তাঁর কবিতায় ছায়া ফেলেছে। এমনকি, বেশ কিছু ধর্মীয় নেতাদের কাহিনিকে উপজীব্য করেও তিনি কবিতা লিখেছেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘সকেত’ (Saket) রামায়ণের উল্লেখযোগ্য চরিত্র লক্ষ্মণের স্ত্রী উর্মিলাকে কেন্দ্র করে লেখা। অন্যদিকে, তাঁর ‘যশোধারা’ (Yashodhara) গ্রন্থের প্রধান চরিত্র হলেন গৌতম বুদ্ধের স্ত্রী যশোধরা।

মৈথিলী শরণ গুপ্তের সমসাময়িক কবিরা অর্থাৎ রামধারী সিং দিনকর (Ramdhari Singh Dinkar), মাখনলাল চতুর্বেদী (Makhanlal Chaturbedi) যে ধরণের বিষয় নির্বাচন করতেন, বা যে প্রচলিত ভাষায় সাহিত্যচর্চা করতেন, সেই ধারা থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবেই সরে আসেন। তিনি খড়িবোলিতে অন্ত্যমিল ছাড়া কাপ্লেট (Coulpet) লেখা শুরু করেন। তাঁর লেখায় অন্ত্যমিল না থাকলেও অনুপ্রাসের স্পষ্ট ব্যবহার থাকায় গোটা কবিতায় ছন্দের অভাব অনুভূত হয় না।

তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত কাজ হলো, ‘মাতৃভূমি’ (Matribumi), ‘জয়দ্রথ বধ’ (Jayadrath Vadh), ‘পলাশী কা যুদ্ধ’ (Plassey ka Yudh), ‘গুরুকুল’ (Gurukul), ‘কিশান’ (Kisan), ‘পঞ্চবটী’ (Panchvati), ‘নির্ঝর’ (Nirjhar), ‘মনুষ্যত্ব’ (Manushyata), ‘কিরণোঁ কা খেল’ (Kirano Ka Khel), ‘সিদ্ধারাজ’ (Siddharaj), ‘অর্জুন অউর বিসর্জন’ (Arjun Aur Visarjan), ‘কাবা-কারবালা’ (Kaaba-Karbala), ‘জয়ভারত’ (Jayabharat), ‘দ্বাপর’ (Dwapar), ‘জাহুশ’ (Jahush), ‘বৈতালিক’ (Vaitalik), ‘কুণাল’ (Kunal), ‘মানবতা’ (Manavata ), ‘কুশলগীত’ (Kushalgeet), ‘গুণগান’ (Gungan), ‘আর্য’ (Arya), ‘জীবন কী হি জয় হো’ (Jiban Ki Hi Jay Ho), ‘অর্জুন কী প্রতিজ্ঞা’ (Arjun Ki Pratigya), ‘নাহুশ কী পতন’ (Nahush Ka Patan), ‘নিরখ সখী ইয়া খঞ্জন আয়ে’ (Nirakha Sakhi Ya Khanjan Aye), ‘মুঝে ফুল মত মারো’ (Mujhe Phool Mat Maro), ‘ভারত মাতা কা মন্দির ইয়ে’ (Bharat Mata Ka Mandir Yeh), ‘সখী ভে মুঝসে কেহকর জাতে’ (Sakhi Ve Mujhse Kehkar Jaate), ‘দোনো ঔর প্রেম পালতা হ্যায় ইয়ে’ (Dono Aur Prem Palta Hai Yeh), ‘চারু চন্দ্র কী চঞ্চল কিরণেঁ’ (Charu Chandr Ki Chanchal Kirne) ইত্যাদি।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে তাঁকে রাজ্যসভার সদস্যপদ দেওয়া হয়। রাজ্যসভায় অন্য সদস্যদের সামনে তিনি কবিতার মাধ্যমে তাঁর মত প্রদান করতেন। আমৃত্য তিনি ভারতীয় রাজ্যসভার একজন সদস্য ছিলেন। ১৯৫৪ সালে তাঁকে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়।

১৯৬৪ সালের ১২ ডিসেম্বর মৈথিলী শরণ গুপ্তর মৃত্যু হয়। 

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।