সববাংলায়

১০ ফেব্রুয়ারি | জাতীয় কৃমিনাশক দিবস (ভারত)

বিভাগঃ , ,

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশেই কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতের পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল জাতীয় কৃমিনাশক দিবস (National Deworming Day)।

প্রতি বছর ১০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ভারত জুড়ে পালিত হয় জাতীয় কৃমিনাশক দিবস । দেশের প্রতিটি শিশুকে কৃমি মুক্ত করার জন্য, ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই বিশেষ উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। এটি ভারতের সবথেকে বৃহদাকার জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি যা কিনা খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের মাধ্যমে ১ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সকল বয়সের শিশু-কিশোরদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নত করার জন্য কৃমিনাশ করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়। এই দিবস পালনের মাধ্যমে ভারতের শিশু-কিশোরদের জীবনযাত্রার এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন করার চেষ্টাও করা হয় অপ্রত্যক্ষভাবে।

সমস্ত সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে শিক্ষক ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের থেকে নিয়মিত যাতে নথিভুক্ত ও অনথিভুক্ত সকল শিশু অন্ত্রের সঠিক চিকিৎসা পায় এবং কৃমি সংক্রান্ত সমস্ত প্রকার সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারে, তার জন্যেই সচেতনতা গড়ে তুলতে জাতীয় কৃমিনাশক দিবস পালিত হয়। সাপ্তাহিক আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ানোর কর্মসূচির সঙ্গেই একত্রে এই কৃমিনাশের প্রকল্প চালু করার কথা ভেবেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত বা সমস্যাযুক্ত বহু শিশু সঠিক চিকিৎসা পায় না, তাদের সকলকে চিকিৎসার পরিষেবার মধ্যে আনতে ১০ ফেব্রুয়ারি দিনটিতে প্রতি বছর কৃমিনাশের কর্মসূচি পরিচালনা করে ভারত সরকার। এছাড়াও জাতীয় কৃমিনাশক দিবস পালনের অন্যান্য উদ্দেশ্যগুলি হল –

  • আইসিডিএস (ICDS) এবং স্কুল শিক্ষা কর্মসূচির মধ্যে কৃমিনাশক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও রাজ্যগুলিকে অনুপ্রাণিত করা
  • কৃমিনাশ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো
  •  সুবিধাভোগী শিশুর সংখ্যা বাড়ানো
  • এসটিএইচ (STH) অর্থাৎ মৃত্তিকাবাহিত কৃমির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বাড়িয়ে তোলা এবং চলমান প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা

২০১৫ সালে প্রথম ১০ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক প্রথম জাতীয় কৃমিনাশক দিবস পালন করে। ঠিক ঐ বছরই ১৩ ফেব্রুয়ারি আরেকটি মপ-আপ ডে (Mop Up Day) অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ১০ তারিখে যে শিশুরা কৃমিনাশের ওষুধ নিতে পারেনি, তাদের ওষুধ দেওয়া হয়। সেই বছরই ঠিক হয় যে এরপর থেকে প্রতি বছর সরকারি, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এবং অঙ্গনওয়াড়ি স্কুলগুলিতে এই বিশেষ দিনে কৃমিনাশ কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। সমস্ত বেসরকারি স্কুলগুলিকেও এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনার জন্য ভারত সরকার সমস্ত রাজ্যগুলিকে নির্দেশ জারি করেছে। মূলত বারোটি রাজ্যেই জাতীয় কৃমিনাশক দিবস পালন শুরু করা হয় যার মধ্যে রয়েছে আসাম, বিহার, ছত্তিশগড়, দিল্লি, দাদরা ও নগর হাভেলি, হরিয়ানা, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৮ কোটি ৩৬ লক্ষ শিশু পরজীবি কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। তার মধ্যে ভারতেই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি ৪১ লক্ষ শিশু মৃত্তিকা বাহিত কৃমির সংক্রমণে আক্রান্ত যা তাদের অন্ত্রে গিয়ে বাসা বাঁধে এবং নানাবিধ মারণ রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এই কৃমিকে আসলে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় হেলমিন্থেস (Helminthes)। কৃমি যদি মল-মূত্রের দ্বারা দূষিত মাটি থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায় তাহলে তাকেই মৃত্তিকা-বাহিত হেলমিন্থেস বা কৃমি বলা হয়। তিন ধরনের কৃমি দেখা যায় – গোলকৃমি, ফিতাকৃমি এবং হুকওয়ার্ম। এই তিন প্রকার কৃমির বিজ্ঞানসম্মত নাম যথাক্রমে Ascaris lumbricoides, Trichuris trichiura এবং Necator americanus।

  • নানাভাবে এই কৃমি সংক্রামিত হতে পারে মানুষের শরীরে। যেমন –
  • পূর্ণবয়স্ক কৃমি মানুষের অন্ত্রে খাদ্যের জন্য বহুদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং প্রতি দিনই হাজার হাজার ডিম পারে। এই ডিমগুলি মানুষের মলের মধ্যে দিয়ে বাহিত হয়ে শরীরের বাইরে বেরোয়। যে সমস্ত মানুষেরা খোলা জায়গায় মাটির উপরে মলত্যাগ করে তাদের মাধ্যমেই এই জীবাণু অন্যদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। একইসঙ্গে এটি মাটিকেও দূষিত করে।
  • মাটি থেকে তোলা সবজি ভালোভাবে না ধুয়ে রান্না করা হলে সংক্রমণ ঘটতে পারে।
  • দূষিত জল থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
  • শিশুরা বেশিরভাগ সময় মাঠে-ঘাটে খেলাধুলোর পরে সেই হাতই মুখে দেয়, ফলে সেখান থেকেই কৃমি সংক্রামিত হয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
  • কৃমি সংক্রমণের কারণে অ্যানিমিয়া, অপুষ্টি, মানসিক, শারীরিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের অপূর্ণতা এবং স্কুলের ক্রিয়াকাণ্ডে খুব কম নিয়োজিত হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে কিছু বিশেষ উপায় ও সতর্কতা অবলম্বন করলে এই সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যেমন –
  • সবার আগে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করার বদলে সুষ্ঠু নিকাশি ব্যবস্থা যুক্ত শৌচালয় ব্যবহার করতে হবে।
  • খাওয়ার আগে এবং শৌচকর্ম করার পরে ভালোমতো হাত ধুয়ে নিতে হবে।
  • বাইরে বেরোনোর সময় চটি বা জুতো পরা বাঞ্ছনীয়।
  • নিরাপদ ও স্বচ্ছ জলে সবজি ও ফল ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
  • সঠিকভাবে রান্না করা খাবার খাওয়াই বাঞ্ছনীয়।

ভারতকে সম্পূর্ণ কৃমিমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক সমস্ত রাজ্যগুলিকে আঞ্চলিক সংস্থার মাধ্যমে জাতীয় কৃমিনাশক দিবসের বাস্তুবায়ন সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে। মানব সম্পদ ও উন্নয়ন মন্ত্রক, মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক, পানীয় জল ও নিকাশি মন্ত্রকের অধীনে স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়।

২০১৫ সালে ভারতের যে সকল রাজ্যগুলিতে কৃমি সংক্রমণের হার ২০ শতাংশেরও বেশি সেখানে বার্ষিক দু-রাউণ্ড কৃমিনাশক ট্যাবলেট অ্যালবেণ্ডাজেল (Albendazel) খাওয়ানোর সুপারিশ করে। ঐ বছরই কৃমিনাশ কর্মসূচির প্রথম রাউণ্ডে ৮.৯ কোটি শিশুকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। ২০১৮ সালের মধ্যে এইভাবেই নিয়মিত হারে প্রায় ১১৪ কোটি শিশুকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো সম্ভবপর হয়েছে। ২০২১ সালে জয়পুরের রাজকন্যা দিয়া কুমারি একটি টুইটে জানিয়েছেন ভারতীয় শিশুদের কৃমি সংক্রমণ সংক্রান্ত সব ধরনের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সমস্ত স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে কৃমিনাশক ট্যাবলেট বিনামূল্যে বিতরণের কর্মসূচিও গৃহীত হয়েছে ঐ বছরই।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।