ভারতীয় সিনেমার আধুনিকায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করা অন্যতম বাঙালি পথিকৃৎ হলেন প্রমথেশ বড়ুয়া (Pramathesh Barua), যিনি পি.সি. বড়ুয়া নামেই অধিক পরিচিত। অভিনেতা, পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে বাংলা ও হিন্দি উভয় চলচ্চিত্র জগতেই তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। রাজনীতির অঙ্গন থেকে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করে তিনি বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার কিছু ব্যর্থ হলেও অধিকাংশই সফলতার শিখরে পৌঁছেছিল। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি সফলভাবে কৃত্রিম আলো (artificial light), ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতি (flashback technique) এবং রবীন্দ্র সংগীতের ব্যবহার করেন, যা চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। এছাড়াও, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘দেবদাস’ চরিত্রটিকে তিনি ভারতীয় সিনেমা জগতে এক কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন, যা আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। প্রমথেশ বড়ুয়ার হাত ধরেই ভারতীয় সিনেমা আধুনিকতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল।
১৯০৩ সালে ২৪ অক্টোবর অসমের ধুবড়ি জেলার গৌরীপুরের বিখ্যাত রাজপরিবারে প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়ার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রাজা প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়া আর মায়ের নাম সরোজবালা দেবী। তাঁর বাবা ছিলেন গৌরীপুরের জমিদার। প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়ার পাঁচ সন্তান হলেন – প্রমথেশ বড়ুয়া, প্রকৃতীশ বড়ুয়া, প্রণবেশ বড়ুয়া, নীহারবালা দেবী ও নীলিমাসুন্দরী দেবী। প্রমথেশ বড়ুয়া মাত্র আঠারো বছর বয়সে পরিবারের ইচ্ছায় মাধুরীলতা দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুটি সন্তান ছিল। তারপর তিনি অমলাবালা দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁদের ছেলের নাম অরূপকুমার বড়ুয়া। প্রমথেশ বড়ুয়ার এই দ্বিতীয় বিয়ে করা নিয়েই বাবার সাথে তাঁর তীব্র মনোমালিন্য ঘটে। অমলাবালা দেবীর মৃত্যুর পর তিনি আবার অভিনেত্রী যমুনা দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তান দেবকুমার বড়ুয়া, রজত বড়ুয়া ও প্রসূন বড়ুয়া। তবে গৌরীপুর রাজবাড়ির সদস্যরা যমুনা দেবীকে কখনই রাজপরিবারের পুত্রবধূ বলে গ্রহণ করেননি।
এক নজরে প্রমথেশ বড়ুয়ার জীবনী:
- জন্ম: ২৪ অক্টোবর, ১৯০৩
- মৃত্যু: ২৯ নভেম্বর, ১৯৫১
- কেন বিখ্যাত: প্রমথেশ বড়ুয়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের আধুনিকীকরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি কৃত্রিম আলো, ফ্ল্যাশব্যাক ইত্যাদি বিষয় ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথমবার ব্যবহার করেছিলেন। ‘দেবদাস’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় আজও মাইলফলক হয়ে আছে।
প্রমথেশ বড়ুয়ার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গৌরীপুর রাজবাড়িতে। সেখানে আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর গৃহশিক্ষক। এরপর তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। তারপর কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রমথেশ বড়ুয়া বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁর মায়ের অমতের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি খুব সুন্দর এস্রাজ ও পিয়ানো বাজাতে পারতেন। এছাড়া তিনি বিলিয়ার্ড, টেনিস, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলাতেও ছিলেন সুদক্ষ। কলকাতার বিলিয়ার্ড টুর্নামেন্টে তিনি একাধিকবার চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন।
ছোট থেকেই সমাজসেবামূলক কাজে প্রমথেশ বড়ুয়ার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। শৈশবে তিনি চাইতেন ডাক্তার হয়ে গৌরীপুর গ্রামের মানুষদের সেবা করতে। সাধারণ মানুষদের সাহায্য করার জন্য তিনি গৌরীপুরে নিজের সমবয়সীদের নিয়ে একটি দলও গঠন করেছিলেন। এছাড়া তিনি নিরীহ, অভুক্ত প্রজাদের থেকে জোর করে রাজস্ব আদায় করতে পারবেন না বলে জমিদারীর দায়িত্বভার নিতে অস্বীকার করেন। তারপর তিনি ক্রমশ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অসম বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি চিত্তরঞ্জন দাশের ‘স্বরাজ পার্টি’তে যোগ দেন। তবে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের প্রতি অসীম আগ্রহের কারণে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন।
সিনেমার প্রতি প্রমথেশ বড়ুয়ার প্রথম আগ্রহ জন্মায় কলেজে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অভিনয় দেখার পর থেকে। পরবর্তীকালে তিনি নিজে অভিনয়ের জন্য বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেন ‘ইয়ং ম্যানস ড্রামাটিক ক্লাব’। এখানে ‘বিবাহবিভ্রাট’, ‘নূরজাহান’, ‘প্রফুল্ল’, ‘কারাগার’ নাটক অভিনীত হয়, যেখানে প্রমথেশ ছিলেন অভিনেতা ও পরিচালক। ১৯২৬ সালে ভারতীয় সিনেমা জগতে প্রমথেশ বড়ুয়ার আবির্ভাব হয় ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেডের হাত ধরে। ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি বা ডিজির অনুরোধে তিনি দেবকীকুমার বসুর ‘পঞ্চশর’ সিনেমার শুটিং দেখতে গিয়ে ওই সিনেমার একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান। এছাড়া তিনি ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির ‘টাকায় কিনা হয়’ সিনেমাতেও কাজ করেন।
এরপর তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে সাময়িক বিরতি পড়ে, তিনি চলে যান ইংল্যান্ডে কিডনির অপারেশনের জন্য। পরবর্তীকালে সফল অপারেশনের পর তিনি প্যারিসে যান ও সেখানে সিনেমাটোগ্রাফির প্রশিক্ষণ নেন। এছাড়া তিনি আমেরিকার ফক্স স্টুডিওতে গিয়ে (Fox Studio) শেখেন কীভাবে ছবিতে আলোর ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া তিনি লন্ডনের আলস্ট্রি স্টুডিও (Elstree Studios)-র প্রযোজনার কাজগুলি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং কলকাতার বাড়িতে দেবকীকুমার বসু ও কৃষ্ণগোপালকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেন ‘বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিট’। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় টাকা আসত গৌরীপুর রাজবাড়ির এস্টেট থেকে। যদিও রাজপরিবারের ছেলের এই সিনেমা করার ব্যাপারটাকে খুব একটা ভালোভাবে নেননি তাঁর বাবা প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়া। ১৯৩১ সালে ওই প্রযোজনা সংস্থা থেকে প্রথম মুক্তি পায় দেবকীকুমার বসুর পরিচালিত ‘অপরাধী’ সিনেমাটি। এই সিনেমাতে প্রথমবার মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন প্রমথেশ বড়ুয়া। ভারতীয় সিনেমা জগতে এই সিনেমা টেকনিক্যাল দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সিনেমাতেই প্রথমবার কৃত্রিম আলোর ব্যবহার করা হয়। এছাড়া তিনি এই সিনেমাতে প্রয়োজনীয় মেকআপ পদ্ধতিতেও নানা রকম বদল আনেন। তারপর ১৯৩২ সালে বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিট থেকে মুক্তি পায় ‘নিশির ডাক’। এই সিনেমায় অভিনেতা হিসাবে সুশীল মজুমদারের অভিষেক হয়। ওই বছরই প্রমথেশ ‘একদা’র গল্প লেখেন এবং প্রযোজনা করেন। এখানে পরিচালক ছিলেন সুশীল মজুমদার। এরপর ১৯৩২ সালে বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিটের প্রযোজনায় প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালনা করেন ‘বেঙ্গল- ১৯৮৩’। ছবির বিষয় ছিল আগামী পঞ্চাশ বছর পর বাংলার অবস্থা। এই ছবির শুটিং মাত্র আট দিনে শেষ করা হয়। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ হলেও সিনেমাটি একেবারে ফ্লপ হয়ে যায়।
এই স্টুডিও পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ছেলের এই সিনেমার জন্য অহেতুক টাকা নষ্ট করার জন্য প্রমথেশের বাবা গৌরীপুর থেকেও টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। প্রবল অর্থাভাবে প্রমথেশ বড়ুয়া আরোরা ফিল্ম স্টুডিওর মালিক অনাদি বসুর থেকে ধার নেন। কিন্তু সঠিক সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় শেষপর্যন্ত বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিট চলে যায় আরোরা ফিল্ম স্টুডিওর কাছে। নিজের স্বপ্নের বড়ুয়া ফিল্ম ইউনিটের এইরকম করুণ অবস্থায় তিনি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন।
পরবর্তীকালে বীরেন্দ্রনাথ সরকার তাঁকে নিউ থিয়েটার্সে যোগদানের জন্য আহ্বান জানালে তিনি ১৯৩৩ সালে সেখানে যোগ দেন। এই স্টুডিওই তাঁকে অভিনেতা ও পরিচালক হিসাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এইখানে ১৯৩৪ সালে তিনি ‘রূপলেখা’ সিনেমার পরিচালক ও অভিনেতা হিসাবে কাজ করেন। এটিই প্রথম ভারতীয় সিনেমা যেখানে গল্প বলার জন্য ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে সফল সিনেমা ‘দেবদাস’ তৈরি করেন। বাংলা, হিন্দি ও অসমীয়া ভাষায় তিনি এই সিনেমা পরিচালনা করেছিলেন। বাংলায় এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৩৫ সালে আর তার পরের বছর হিন্দিতে। বাংলায় দেবদাস চরিত্রে প্রমথেশ বড়ুয়া নিজে অভিনয় করেন আর দেবদাস চরিত্রকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যান। শোনা যায় যে, উত্তমকুমারও নাকি প্রমথেশের ইমেজ ভাঙতে পারবেন না বলে একসময় দেবদাস চরিত্র করতে অস্বীকার করেন। অন্যদিকে হিন্দিতে কুন্দনলাল সায়গল ওই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। হিন্দিতে এই সিনেমা মুক্তিলাভের পর সারা ভারত জুড়ে এক উন্মাদনা তৈরি হয়। এই সিনেমা যে শুধু প্রমথেশ বড়ুয়াকেই খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যান তা নয়, বরং কুন্দনলাল সায়গালও এই সিনেমায় অভিনয়ের পর জনপ্রিয় অভিনেতার মর্যাদা লাভ করেন। এই সামাজিক সিনেমায় অসাধারণ ভাবে ফ্ল্যাশব্যাক, ক্লোজ-আপ, মন্টেজ, ওয়াইপ, ফেড ইন অ্যান্ড ফেড আউট শটের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সিনেমাটি ‘ইন্টারকাট টেলিপ্যাথি শট’ কৌশল ব্যবহারের জন্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও তিনি ‘মঞ্জিল’, ‘গৃহদাহ’, ‘মায়া’র মতো জনপ্রিয় সিনেমা তৈরি করেন। তারপর ১৯৩৭ সালে প্রমথেশ বড়ুয়া এক বোহেমিয়ান শিল্পীর জীবন নিয়ে তৈরি করেন ‘মুক্তি’, এখানে তিনি নিজেও অভিনয় করেন। বক্স অফিসে এই সিনেমা দারুণ হিট করে। ‘মুক্তি’র বহু অংশ গৌরীপুরে শুট করা হয়েছিল। এছাড়া এই সিনেমাতেই প্রথম রবীন্দ্র সংগীতের ব্যবহার করা হয়। সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ গানটিতে সুর ও কণ্ঠ দেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। আবার ১৯৩৯ সালে প্রমথেশ নিজের কমেডি সিনেমা ‘রজত জয়ন্তী’ তে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন। তারপর তিনি ‘অধিকার’ সিনেমা পরিচালনা করেন। এরপর ১৯৪০ সালে কৃষ্ণ মুভিটোন থেকে তাঁর ‘শাপমুক্তি’ রিলিজ করে। এই সিনেমায় দারুণভাবে কাট-শট কৌশলের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া তিনি আবার সাইগালের সঙ্গে তৈরি করেন ‘জিন্দেগি’। এছাড়া তাঁর জনপ্রিয় সিনেমাগুলি হল – ‘মায়ের প্রাণ’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘শেষ উত্তর’ (হিন্দিতে ‘জবাব’)। তিনি নিজের জীবনের শেষের দিকে তৈরি করেন ‘চাঁদের কলঙ্ক’, ‘সুবহ সাম’, ‘আমিরী’, ‘রানি’ ইত্যাদি সিনেমা। প্রমথেশ বড়ুয়ার মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত শেষ সিনেমা ‘মায়াকানন’।
১৯৫১ সালের ২৯ নভেম্বর কলকাতায় প্রমথেশ বড়ুয়ার মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান