ইতিহাস

অটো ভন বিসমার্ক

নতুন সঙ্ঘবদ্ধ জার্মানির স্থপতি ছিলেন অটো ভন বিসমার্ক (Otto von Bismarck)। বিসমার্কের নেতৃত্বে উনিশ শতকে জার্মানি একটি অত্যাধুনিক ঐক‍্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। নতুন সঙ্ঘবদ্ধ জার্মানির প্রথম চ‍্যান্সেলার ছিলেন অটো ভন বিসমার্ক। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ প্রখর চাতুর্য ও পারদর্শীতার সাথে ১৮৬২ থেকে ১৮৯০ সাল অবধি প্রথমে প্রুশিয়া ও পরে সমগ্র জার্মানিকে শাসন করেছেন। তাঁরই হাত ধরে ভিত্তিস্থাপন হয়েছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধের।

১৮১৫ সালের ১ এপ্রিল জার্মানির শানহাউসনে (Schőnhausen) অটো এডুয়ার্ড লিওপোল্ড ভন বিসমার্কের জন্ম হয়। তাঁর বাবা কার্ল উইলহেল্ম ফার্দিনান্দ ভন বিসমার্ক ছিলেন সম্ভ্রান্ত আদিবাসী পরিবারের মানুষ। প্রুশিয়ায় ছিল তাঁর পারিবারিক এস্টেট। বিসমার্কের মা উইল হেলমাইন লুইস মেনকেন ছিলেন শিক্ষিত এক বুর্জোয়া পরিবারের কন্যা। বিসমার্ক জোয়ানা ভন পুটকামের নামে এক ধর্মানুরাগী মহিলাকে বিবাহ করেন এবং আমৃত্যু এক সুখী দাম্পত্য জীবন উপভোগ করেন।

বিসমার্কের সাত বছর বয়সে, তাঁর মা তাঁকে বার্লিনের প্রগতিশীল প্লাম‍্যান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করিয়ে দেন। এখানে পাঁচ বছর পড়ার পর বিসমার্ক ফ্রেডেরিক উইলিয়াম জিমন‍াসিয়ামে ভর্তি হন ও সেখানে তিন বছর শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর মায়ের উৎসাহে তিনি আইন পড়তে ভর্তি হন গোটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিসমার্ক ছাত্র হিসেবে মধ‍্যমেধা সম্পন্ন ছিলেন এবং বেশিরভাগ সময় মদ্যপানেই কাটাতেন। শিক্ষা জীবন শেষে এরপরে তিনি প্রুশিয়ার সরকারি অসামরিক বিভাগে যোগদান করলেও পরবর্তীকালে এই কাজে তিনি নিরুৎসাহী হয়ে পড়েন ক্রমশই। এই সময়ে তাঁর মায়ের মৃত্যু হলে বিসমার্ক সেখানে ইস্তফা দিয়ে বাবার এস্টেটে আসেন। ১৮৩৯ সাল থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত বিসমার্ক নিতান্ত সাধারণ জীবন যাপন করেন।

বিসমার্ক তাঁর প্রথম যৌবনে প্রশাসনের অনেকগুলি স্তরের মধ‍্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। প্রথমে তিনি প্রুশিয়ার প্রশাসনে যোগ দিয়ে আখেন শহরে একজন বিচারকার্যীয় প্রশাসক হন। গতানুগতিক কর্মপদ্ধতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে চব্বিশ বছর বয়সে এই পদ থেকে তিনি ইস্তফা দেন। ১৮৪৭ সালে তিনি প্রুশিয়ার আইনসভা ডায়েটের সদস্য হন। ১৮৫১সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট জাতীয় আইনসভাতে প্রুশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে সকলের নজরে আসেন তিনি। ১৮৫৯ সালে তিনি রাশিয়ায় যান প্রুশিয়ার রাষ্ট্রদূত হয়ে। ১৮৬২ সালে সেখান থেকে ফিরে আবার ফ্রান্সে যান রাষ্ট্রদূত হিসেবে। ১৮৬২ সালে অটো ভন বিসমার্ক প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন এবং তখন থেকেই জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে এক নতুন অধ‍্যায় সূচিত হয়। প্রধানত তাঁরই নেতৃত্বে জার্মানি ইউরোপের অন‍্যতম প্রধান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তিনি প্রাথমিক ভাবে কেন্দ্রীয় আইনসভায় অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির ক্ষুদ্র রাজ‍্যগুলিকে একত্রিত করার চেষ্টা করেন। তিনি ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয় বাণিজ্য চুক্তি করে ফ্রান্সকে বন্ধুরাজ‍্যে পরিণত করেন। এছাড়াও পোল‍্যাণ্ডের বিদ্রোহ দমন করায় রাশিয়াকে তিনি সাহায্য করেন এবং এর জন‍্য বিসমার্ক ক্রমশই রাশিয়ার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

একজন চূড়ান্ত কুশলী রাজনীতিবিদ রূপে তিনি ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া এবং ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের মাধ‍্যমে জার্মানিকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিসমার্ক ১৮৫২ সালের লন্ডন চুক্তি ভঙ্গ করার অভিযোগে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন সে যুদ্ধে ডেনমার্কের পরাজয় হয়। এরপর অস্ট্রিয়াকে জার্মানি থেকে বিছিন্ন করে প্রুশিয়ার অধীনে জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে বিসমার্ক তাঁর কূটনৈতিক চালে অস্ট্রিয়াকে মিত্রহীন করেন। ফলত প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অস্ট্রিয়াকে একাই লড়তে হয় এবং অস্ট্রিয়া সহজেই পরাজিত হয়।

এরপর তিনি ফ্রান্সের শত্রুতায় বিরক্ত হয়ে যুদ্ধের জন‍্য প্রস্তুত হন। তিনি তৃতীয় নেপোলিয়নের বৈদেশিক নীতির ভুলগুলিকে চিহ্নিত করেন ও ফ্রান্সকে মিত্রহীন করেন। ফ্রান্স এবার নিজেই যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং যুদ্ধে তৃতীয় নেপোলিয়নের পতন হলে দক্ষিণ জার্মানি মূল জার্মানির সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং বিসমার্ক এক সংবিধান দ্বারা ঐক্যবদ্ধ জার্মানির প্রতিষ্ঠা করেন। এই জার্মানির প্রথম সম্রাট হন কাইজার প্রথম উইলিয়াম। বিসমার্ক তখন থেকেই ‘আয়রন চ‍্যান্সেলর’ নামে খ‍্যাত হন তাঁর লৌহ নীতির জন‍্য।

তিনি নিজস্ব কূটনৈতিক বুদ্ধি দ্বারা ইউরোপীয় শত্রুতাকে শান্তিতে পরিণত করে জার্মানিকে বিশ্বসেরা করার লক্ষ্যে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকেন। বিসমার্ক ছিলেন ঘোরতর রক্ষণশীল রাজতন্ত্রের সমর্থক। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি তাঁর পছন্দ ছিল না। তিনি জার্মানিকে ঐক‍্যবদ্ধ করার জন‍্য রক্ত ও লৌহ নীতির ( blood and iron policy) উপরে বিশেষ ভাবে নির্ভর করেন যা মূলত সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল। বিসমার্ক প্রকৃতপক্ষে ছিলেন কূটনীতির যাদুকর। তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, গঠনমূলক দৃষ্টি ও কূটনৈতিক দক্ষতার জন‍্য বিসমার্ক এক প্রবাদপুরুষে পরিণত হয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যুদ্ধ এবং সফল কূটনীতির মাধ্যমেই সাফল‍্য আসে। তাঁর বাস্তবমুখী কূটনীতিতে চিরকালই গৌণ ছিল ন‍্যায়-নীতি। শত্রুকে শেষ করার জন‍্য বিসমার্ক যে কোন কাজ করতে পারতেন। ব‍্যক্তিগত জীবনে যাই ঘটুক না কেন, রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অনেক সময়ই তিনি ন‍্যায়ের পথে চলেননি। তাঁর সমকালে তিনি সাফল্য পেয়েছেন এবং সে কারণে তিনি প্রশংসিত হন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি বহু সমালোচিত হন।

নতুন জার্মান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নায়ক ছিলেন অটো ভন বিসমার্ক। প্রশাসনে তাঁর বহু অবদান আছে। সমগ্র জার্মানির জ‍ন‍্য তিনি এক মুদ্রা, একটি কেন্দ্রীয় ব‍্যাঙ্ক তৈরি করেছিলেন। সঙ্গে একই দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনের প্রবর্তন করেন। বিসমার্ক ইউরোপের প্রথম নেতা হিসাবে নানারকম সামাজিক নিরাপত্তার ব‍্যবস্থা করেন। শ্রমিকদের জন‍্য অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, বার্ধক‍্যসংক্রান্ত বীমার ব‍্যবস্থা করেন। ক্রমে নানা কারণে তাঁর বিরোধীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮৯০ সালের মার্চ মাসে বিসমার্ক বিরোধীদের প্রবল চাপের সামনে নতি স্বীকার করে পদত্যাগ করেন।

১৮৯৮ সালের ৩০ জুলাই উত্তর জার্মানির ফ্রেড্রিখসরূহতে বিসমার্কের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।