ইতিহাস

পৃথ্বীরাজ চৌহান

প্রাচীন ভারতের এক ঐতিহাসিক রাজপুত শাসনকর্তা ছিলেন পৃথ্বীরাজ চৌহান (Prithviraj Chauhan)। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর ভারতের আজমের ও দিল্লির শাসনভার ছিল তাঁরই হাতে। মাত্র তেরো বছর বয়সে সিংহাসনে বসে উত্তরে থানেশ্বর ও দক্ষিণে মেবার পর্যন্ত রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন তিনি। তুর্কি আক্রমণের বিরুদ্ধে তিনিই ভারতের হিন্দু রাজাদের একজোট করেছিলেন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে ১১৯১ সালে মহম্মদ ঘোরিকে তিনি পরাজিত করলেও তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মহম্মদ ঘোরির কাছে তিনি নিজেই পরাজিত ও বন্দি হন। কনৌজের রাজা জয়চাঁদের কন্যা সংযুক্তাকে অপহরণ করে বিবাহ করার কাহিনী জড়িয়ে আছে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সঙ্গে। তাঁর সভাকবি চান্দ বারদাইয়ের লেখা ‘পৃথ্বীরাজ রাসো’ কাব্যে তাঁর বীরত্ব, সাহস এবং অপরূপ প্রেমের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

১১৬৬ সালে গুজরাটে পৃথ্বীরাজ চৌহানের জন্ম হয়। ‘পৃথ্বীরাজ বিজয়’ কাব্য অনুসারে বাংলার জ্যৈষ্ঠ মাসের ১২ তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাঁর বাবার নাম চৌহান রাজা সোমেশ্বর এবং তাঁর মায়ের নাম কর্পুরা দেবী। সেই পৃথ্বীরাজ বিজয় কাব্য থেকে জানা যায় যে তিনি মোট ছয়টি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন এবং পৃথ্বীরাজ রাসো কাব্য অনুসারে ধর্ম, দর্শন, চিকিৎসা, ইতিহাস, চিত্রকলা, গণিত ইত্যাদি জ্ঞানের সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। ইতিহাসে তাঁর খ্যাতি ছিল তীরন্দাজির জন্য। দ্বিতীয় পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর পরে তাঁর বাবা সোমেশ্বর চৌহান বংশের সিংহাসনে বসেন এবং পৃথ্বীরাজের মাত্র এগারো বছর বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়। নাবালক বয়সেই মায়ের পরামর্শে সিংহাসনে বসেন পৃথ্বীরাজ চৌহান। নাবালক থাকার কারণে রাজত্বের সমস্ত প্রশাসনিক ব্যাপার তাঁর মা সামলাতেন। এই সময় চৌহান রাজত্বের মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন কদম্বভাসা। অনেকের মতে এই মন্ত্রীর জন্যেই রাজত্বের প্রথমার্ধে সমস্ত যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন পৃথ্বীরাজ। আবার অনেকের মতে ভারতে বারংবার মুসলিম আক্রমণের জন্য দায়ী ছিলেন এই মন্ত্রী কদম্বভাসাই। পৃথ্বীরাজের মা কর্পুরা দেবীর কাকা ভুবনাইকামাল্লা এই সময় তাঁদের রাজত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ‘পৃথ্বীরাজ বিজয়’ কাব্যে বলা হয়েছে গরুড় যেমন বিষ্ণুর সেবা করেন, তেমনি ভুবনাইকামাল্লা পৃথ্বীরাজের সেবা করতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি নাগা উপজাতিদের পরাজিত করতে সমর্থ হন।

তাঁর খুড়তুতো ভাই নাগার্জুন যখন চৌহান রাজবংশের উপর আক্রমণ চালায়, তাঁকে পরাজিত করেন পৃথ্বীরাজ চৌহান। বহু আগে থেকেই চতুর্থ বিগ্রহরাজার পুত্র নাগার্জুনের সঙ্গে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পারিবারিক বিবাদ শুরু হয়েছিল। নাগার্জুন পৃথ্বীরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে গুদাপুরা দূর্গ দখল করে নেন, কিন্তু পৃথ্বীরাজ সেই দূর্গ দখল করতে সমর্থ হন এবং নাগার্জুনকে পরাজিত করে তাঁর মা ও পরিবারকে বন্দি করেন। ১১৮২ সাল নাগাদ পৃথ্বীরাজ অধুনা ভীওয়ানি, আলওয়াড় অঞ্চলের ভড়ণকদের পরাজিত করে ঐ অঞ্চলের শাসনভার দখল করেন। এই সময়কারই মদনপুর শিলালিপি থেকে জানা যায় যে তিনি জেজাকাভুক্তির চাণ্ডিলা রাজা পরমার্দিকে পরাস্ত করেছিলেন। এই জেজাকাভুক্তি হল বর্তমানকালের বুন্দেলখণ্ড। লোককথায় এবং বহু কাব্যগ্রন্থে বলা হয়েছে যে, দিল্লি থেকে পদ্মসেনের কন্যাকে বিবাহ করে ফেরার সময় তুর্কীরা তাঁদের সেনাবাহিনীর উপর হামলা করে। সেই সময় বিরুদ্ধ আক্রমণের জেরে বহু সেনা মারা যায় আর এদিকে পথ হারিয়ে চৌহান সেনারা চাণ্ডিলা রাজত্বের রাজধানী মাহোবাতে আশ্রয় নেয়। তাঁদের দেখে ফেলায় চাণ্ডিলা মালীকে তাঁরা হত্যা করলে দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদ চরমে ওঠে। আর এই বিবাদের ফলে একদিকে যেমন চাণ্ডিলাদের আভ্যন্তরীণ কলহের কারণে চাণদিলা রাজা পরমার্দি, তাঁর সেনাপতি উদাল ও তাঁর ভাই, রাজা জয়চাঁদ প্রমুখ সকলেই পরাজিত হন, তেমনি অন্যদিকে অতি সহজে পৃথ্বীরাজ চৌহান এই রাজ্য দখল করেন। এরপরে গুজরাটের চালুক্য বংশের রাজা দ্বিতীয় ভীমের সঙ্গে যুদ্ধের পরে একটি শান্তিচুক্তি স্থাপিত হয় পৃথ্বীরাজ ও ভীমের মধ্যে। চালুক্য এবং চৌহানদের মধ্যে এই যুদ্ধ যে আসলে হয়েছিল তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন শিলালিপিতে। ‘পৃথ্বীরাজ রাসো’ কাব্য অনুসারে পৃথ্বীরাজের কাকা কাহ্নদেব ভীমের কাকা ষড়যঙ্গদেবের সাত পুত্রকে হত্যা করেছিলেন। এই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই চালুক্যরা চৌহানদের আক্রমণ করে এবং প্রথমে পৃথ্বীরাজের বাবা সোমেশ্বরকে হত্যা করে নাগোর দখল করে নেয়। কিন্তু পরে পৃথ্বীরাজের কাছে তাঁরা সকলেই পরাজিত হয়েছিল। অন্যদিকে আবু পাহাড়ের সমগ্র অঞ্চলটি সেকালে চালুক্যদের সামন্তরাজা ধারাবর্ষ শাসন করতেন। গুজরাট অধিকারের সময় পৃথ্বীরাজ রাত্রে এই অঞ্চল দখল করতে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, কনৌজকে কেন্দ্র করে সেই সময় গাহদাবল রাজত্বে শাসন করতেন জয়চাঁদ। অনেক কাব্যগ্রন্থে বলে যে জয়চাঁদের কন্যা সংযুক্তাকে অপহরণ করে নেওয়ার কারণে পৃথ্বীরাজের সঙ্গে জয়চাঁদের যুদ্ধ বাধে। এই বিষয়ে একটি কাহিনী বহুল প্রচলিত রয়েছে যে, রাজা জয়চাঁদ নিজের রাজসিক মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য রাজসূয় যজ্ঞ আয়োজন করেন। কিন্তু পৃথ্বীরাজ চৌহান তাঁকে শক্তিশালী রাজা হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন বলে সেই যজ্ঞানুষ্ঠানে আসেননি। এদিকে জয়চাঁদের কন্যা পৃথ্বীরাজের বীরত্বের কথা জেনে মনে মনে তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। ঠিক এসময়েই জয়চাঁদ তাঁর কন্যার স্বয়ম্বর আয়োজন করেন এবং পৃথ্বীরাজকে সেখানে নিমন্ত্রণ করেন না। ফলে পৃথ্বীরাজ নিজেই জয়চাঁদের রাজ্য আক্রমণ করে তাঁর কন্যা সংযুক্তাকে তুলে নিয়ে চলে যান দিল্লির উদ্দেশ্যে। এই যুদ্ধে পৃথ্বীরাজের এক-তৃতীয়াংশ সেনার মৃত্যু হয়। দিল্লিতে পৌঁছে সংযুক্তার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে রাজপাট সব ভুলে গিয়ে দিনরাত তিনি সংযুক্তার সঙ্গেই কাটাতে থাকেন। ফলে সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় মহম্মদ ঘোরির আক্রমণ তিনি প্রতিহত করতে পারেননি। এভাবে প্রায় সমস্ত রাজপুত রাজ্য দখল করে পৃথ্বীরাজ নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসে মহম্মদ ঘোরির সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কথাই বেশি গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


গজনীর শাসনকর্তা মহম্মদ ঘোরি ১১৭৫ সালে সিন্ধু নদী পার হয়ে মুলতান দখল করেছিলেন এবং চৌহান রাজত্বের একেবারে পশ্চিম দিক দিয়ে সমস্ত মন্দির, দূর্গ ধ্বংস করে চলে গিয়েছিলেন। মহম্মদ ঘোরির আক্রমণ রাজপুতদের কাছে ছিল রাহুর গ্রাসের মতো। পৃথ্বীরাজের পূর্বসুরিদের সময় থেকেই এই আক্রমণ চলে আসছিল। পশ্চিম প্রদেশে পেশোয়ার, সিন্ধ, পাঞ্জাব প্রভৃতি দখল করে মহম্মদ ঘোরি নিজের শক্তিবৃদ্ধি করছিলেন। ১১৯০-৯১ সালে মহম্মদ ঘোরি চৌহান রাজ্য আক্রমণ করেন এবং ভাটিণ্ডা দূর্গ দখল করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল এই ভাটিণ্ডা দূর্গ দখল করে নিজের এলাকায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু এই আক্রমণের সংবাদ পেয়ে বিশাল বাহিনী নিয়ে পৃথ্বীরাজ চৌহান ভাটিণ্ডার কাছে চলে আসেন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মহম্মদ ঘোরির সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেন পৃথ্বীরাজ চৌহান। ভাটিণ্ডা দূর্গের অধিকার প্নুরায় ফিরে পান তিনি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মহম্মদ ঘোরি আবার নিজেকে প্রস্তুত করেন। এক লক্ষ কুড়ি হাজার আফগান, তুর্কী অশ্বারোহী নিয়ে নিজের বাহিনী তৈরি করেন মহম্মদ ঘোরি এবং পুনরায় জম্মুর বিজয়রাজের সহায়তায় মুলতান ও লাহোরের পথ ধরে তিনি আবার চৌহান রাজত্ব আক্রমণ করেন। কিন্তু এই সময়ে সংযুক্তার সঙ্গে প্রেমবিলাসে মত্ত থাকায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না পৃথ্বীরাজ। তাছাড়া সমস্ত হিন্দু রাজপুত রাজ্য দখল করায় হিন্দু রাজারাও বিশেষ সাহায্য করেননি তাঁকে। কিন্তু তবু তিন লক্ষ ঘোড়া ও তিন হাজার হাতি এবং পদাতিক বাহিনী নিয়ে পৃথ্বীরাজ মহম্মদ ঘোরির আক্রমণ প্রতিহত করতে অগ্রণী হন। এই যুদ্ধই দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মহম্মদ ঘোরির বিশেষ রণকৌশলের কারণে চৌহানদের এক লক্ষ সৈন্যের মৃত্যু হয় এবং অবশেষে পৃথ্বীরাজ চৌহান পরাজিত হন।

অনেকে বলেন যুদ্ধে পরাজিত করে মহম্মদ ঘোরি পৃথ্বীরাজকে তাঁর রাজ্য আজমীরে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন দাস বানিয়ে রাখবেন বলে। কিন্তু এরই মধ্যে পুনরায় পৃথ্বীরাজ আক্রমণ করায় মহম্মদ তাঁকে হত্যা করেন। পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর পরে মহম্মদ ঘোরি গোবিন্দরাজকে আজমিরের সিংহাসনে বসান। পরবর্তীকালে পৃথ্বীরাজের ভাই হরিরাজ গোবিন্দরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে কিছু অংশ দখল করেন এবং নতুন করে চৌহান রাজত্ব গড়ে তোলেন।

পৃথ্বীরাজের জীবনকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগে রচিত হয়েছে বহু কাব্য, বহু শিলালিপিতে তাঁর জীবনের কথা উৎকীর্ণ রয়েছে। আধুনিককালেও বহু চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাসের মুখ চরিত্র হয়ে উঠেছেন রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান।

আনুমানিক ১১৯২ সালে পৃথ্বীরাজ চৌহানের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য