ভূগোল

ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর

ঘূর্ণিঝড় এলেই আমাদের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন আসে। খবরের কাগজে কেবল খবর থাকে মনের মধ্যে আসা প্রশ্নের উত্তরগুলো সেখানে থাকেনা। আসুন এই সুযোগে জেনে নেওয়া যাক ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন-১) উত্তর গোলার্ধে ঘূর্ণিঝড়ের হাওয়া কেন ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে?
উত্তর- পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে একটা শক্তি তৈরী হয় যার নাম হল ‘Coriolis force’। এই শক্তির কারণে উত্তর গোলার্ধের বায়ু ডানদিকে বইতে থাকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের বায়ু বাঁদিকে বইতে থাকে। যখন নিরক্ষরেখার উত্তর দিকে কোন নিম্নচাপের সৃষ্টি হয় তখন ভূপৃষ্ঠের বায়ু সেই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে প্রবাহিত হতে থাকে। ঠিক একই ভাবে নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিকে ভূপৃষ্ঠের বায়ু ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। এই ঘটনার পেছনে একটি অন্যতম কারণ হল পৃথিবীর আকৃতি। Coriolis force বায়ুর এই ঘূর্ণনের ওপর খুব সামান্য প্রভাব ফেলে।

প্রশ্ন-২) ‘Maximum Sustained Wind’ বলতে কি বোঝায়? ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটার সাথে এটি কীভাবে সম্পর্কিত? 
উত্তর- ইন্ডিয়ান মেটেওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (Indian Meteorological Department(IMD)) সর্বাধিক স্থিতিশীল বায়ু (Maximum Sustained Wind) বলতে সর্বাধিক ৩ মিনিট স্থায়ী ঝড়ের গড় ব্যবহার করে ‘Maximum Sustained Wind’ সংক্রান্ত তথ্য দেয়। ঘূর্ণিঝড় ভূ-পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার পর থেকে সর্বাধিক ৩ মিনিট অবধি স্থায়ী ঝড়ের গড় করে তার মধ্যে থেকে সর্বাধিক স্থিতিশীল বায়ু বা ‘Maximum Sustained Wind’ এর হিসেব বের করে। এই মাপ সাধারণত কোন খোলা জায়গায় অন্তত ১০ মিটার ওপরে নেওয়া হয়। ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার (National Hurricane Centre) গড়ে এক মিনিট ধরে এই তথ্য সংগ্রহ করে, আবার কোন কোন দেশ এই কাজের জন্য গড়ে ১০ মিনিট ব্যবহার করে। কিন্তু বিভিন্ন সময়সীমা ব্যবহার করার ফলে তথ্যে কোন ভুল বা অসংগতি দেখা যায় না। 

প্রশ্ন-৩) ঘূর্ণিঝড়ের স্থলভাগের আঘাত করা বা আছড়ে পড়া বলতে কী বোঝায়?
উত্তর- ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে ল্যান্ড ফল (landfall) বা স্থলভূমিতে আছড়ে পড়া বলতে বোঝায় যে, ঘূর্ণিঝড়ের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে স্থলভূমিতে প্রবেশ বা আঘাত করা। ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রস্থল যে তীব্রতার সঙ্গে স্থলভূমিতে প্রবেশ করে তার উপর নির্ভর করে ঘূর্ণিঝড়টি কোন শ্রেণীর তা নির্ণয় করা হয়। একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে সেটির চোখ (eye) স্থলভাগের উপর ঘুরতে থাকে। এর ফলে স্থলভাগের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের চোখের চারপাশের অংশ অর্থাৎ eyewall অংশটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। প্রচুর বৃষ্টিপাত ও ঝড় হয়। তবে স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কমতে থাকে। সমুদ্রতল এবং স্থলভাগের সঙ্গে বায়ুর সংঘর্ষের পার্থক্যের কারণে স্থলভাগে প্রবেশের পর বায়ুর শক্তি ক্রমশ কমতে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের স্থলভাগে আছড়ে পড়া এবং ঘূর্ণিঝড়ের চোখ সরাসরি স্থলভাগে আঘাত করা – দুটো এক জিনিস নয়। ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা স্থলভাগে আছড়ে পড়লেও এর কেন্দ্র বা চোখ তখনও সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকতে পারে। যদিও দুটোর ফলাফল একই- প্রবল বৃষ্টিপাত। এর সঙ্গে থাকে প্রচণ্ড ঝড়। প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়, সমুদ্রতীরে ভূমি ক্ষয় হতে থাকে। সর্বোপরি এক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন-৪) ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুর সর্বাপেক্ষা ব্যাসার্ধ কত?
উত্তর- ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুর ব্যাসার্ধ (Radius of Maximum Wind or RMW) নির্ভর করে ঘূর্ণিঝড়ের চোখ থেকে শক্তিশালী বায়ুর বলয়ের পরিমাপের ওপর। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসের  ক্ষেত্রে এই পরিমাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

প্রশ্ন-৫) কিভাবে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুর সর্বাপেক্ষা ব্যাসার্ধ নির্ণয় করা হয়?
উত্তর- উড়োজাহাজের মাধ্যমে:- প্রথমদিকে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুর ব্যাসার্ধ (RMW) মাপা হতো আটলান্টিক অববাহিকার ওপর পরিদর্শনকারী উড়োজাহাজের সাহায্যে। আবহাওয়া মানচিত্রের দ্বারা ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ চাপের নতি মাত্রার মধ্যে যে দূরত্ব তা পরিমাপের মাধ্যমেও ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করা যায়। 

উপগ্রহের মাধ্যমে- একদম উপরিভাগের সর্বাপেক্ষা শীতল মেঘরাশি থেকে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের সর্বাপেক্ষা উষ্ণ অঞ্চলের পরিমাপ Infra-red Satellite Imagery প্রযুক্তির মাধ্যমে  নির্ণয় করা যায়।

প্রশ্ন-৬) CDO কি?
উত্তর- ‘Central Dense Overcast’ বা CDO মানে সিরাস মেঘরাশি (Cirrus Cloud) যা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যস্থল থেকে উৎপন্ন হওয়া ঝড় বৃষ্টির কারণে তৈরি হয়। ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আকার ধারণ করার আগে (64 knots) CDO সাধারনত সিরাস মেঘরাশির ওপরে থাকা শীতল মেঘরাশিকে বোঝায় এবং এই সময় ঘূর্ণিঝড়ের কোন চোখ সেই অর্থে তৈরি হয় না। ঘূর্ণিঝড়টি  ঝড়ের আকার ধারণ করার সময় চোখের অংশটি স্পষ্ট হয় এবং ইনফ্রারেড উপগ্রহ দিয়ে তা দেখা যায়। 

প্রশ্ন-৭) ঘূর্ণিঝড়ের চোখ বলতে কী বোঝায়? চোখ কিভাবে তৈরি হয় এবং বজায় থাকে? আই ওয়াল (eye wall) কি? স্পাইরাল ব্যান্ড (spiral band) কি?
উত্তর- ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে অবস্থিত গোলাকৃতি অঞ্চলকে আইবল (eyeball) বলা হয়। অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রকে ঘূর্ণিঝড়ের চোখ বা আইবল বলা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের একদম কেন্দ্রে অর্থাৎ চোখের অঞ্চলে বাতাস শান্ত থাকে। কিন্তু এর চারপাশের অংশে শক্তিশালী বায়ু প্রবাহ লক্ষিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের চোখের চারপাশের অংশকে আইওয়াল বলে। এই অংশে বাতাস খুব শক্তিশালী হয়। যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যেটা ঘূর্ণিঝড়ের চোখ গঠন করতে এবং বজায় রাখতে সাহায্য করে সেটা হল ‘eyewall convection’। ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ে তাপ সঞ্চালন হয় কিছু লম্বা এবং সংকীর্ণ বৃষ্টিবলয় দ্বারা, যেগুলো সমান্তরালভাবে অবস্থিত থাকে এবং ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যস্থলে এগুলোর আকৃতি স্পাইরাল থাকার কারণে এর নাম ‘Spiral Bands’। 

প্রশ্ন-৮) বঙ্গোপসাগরের তুলনায় আরব সাগরে ঘূর্ণিঝড় এর সংখ্যা কম কেন?
উত্তর- যে ঘূর্ণিঝড়গুলো বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় সেগুলো বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এবং সংস্পর্শে থাকা আন্দামান সমুদ্র অঞ্চল থেকে তৈরি হয় অথবা উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবশিষ্টাংশ টাইফুন থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারত সাগরের দিকে চলে যায়। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের টাইফুনের সংখ্যা অনেকটাই বেশি।  যে ঘূর্ণিঝড়গুলো আরব সাগরের ওপর তৈরি হয়, সেগুলো দক্ষিণ-পূর্ব আরব সাগর থেকে উৎপন্ন হয় অথবা বঙ্গোপসাগরের উৎপন্ন হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি হয় এবং দক্ষিণ উপদ্বীপের দিকে চলে যায়। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন হওয়া অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড় স্থলভূমিতে প্রবেশ করার পর দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে আরব সাগরে ঘূর্ণিঝড় প্রবেশ করার সংখ্যা অত্যন্ত কম হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া আরব সাগর বঙ্গোপসাগরের তুলনায় অনেকটাই ঠান্ডা যার ফলে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার শঙ্কা এখানে কমে দাঁড়ায়। 

প্রশ্ন-৯) ঘূর্ণিঝড়ের কোন অংশে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বায়ুর অবস্থান করে?
উত্তর-  সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের ডানদিকের  বায়ু অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হয়। তবে এটি নির্ভর করে ঝড়ের গতির ওপর। যদি ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিমে যায় সেক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের ডান দিক হিসেবে উত্তরদিকের বায়ু শক্তিশালী হবে। যদি ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর দিকে যায় সেক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বদিকের বায়ু শক্তিশালী হবে।ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে যেহেতু বায়ু ঘূর্ণির মতো প্রবাহিত হয় তাই এক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের ডানদিকের বায়ু শক্তিশালী হয়ে থাকে। দক্ষিণ গোলার্ধে এই পার্থক্যটি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়। শক্তিশালী বায়ু এক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের বাম দিকে থাকে। কারণ এক্ষেত্রে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বায়ু নিরক্ষীয় অঞ্চলের দক্ষিণ দিক থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরতে থাকে। 

প্রশ্ন-১০) প্রবল উচ্ছাস(Storm Surge) কি?
উত্তর- ঘূর্ণিঝড় এর ফলে সমুদ্রের জলরাশি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচু পর্যন্ত উঠে যায়। সমুদ্রের এই হঠাৎ জলস্ফীতির কারণে উপকূল এলাকায় বহু প্রাণহানি, শস্য ও সম্পদ ধ্বংস হয়ে থাকে। এমনকি সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের মাটি অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় দুটি অথবা তিনটি মরশুমের কৃষি কাজ ব্যাহত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার ওপর এই জলস্ফীতি নির্ভর করে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. http://www.imdsikkim.gov.in/cyclonefaq.pdf

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন