সববাংলায়

পাথরের বাগান – এক সামান্য ব্যক্তির অসামান্য প্রতিবাদ

কল্পনা হল সেই বিশেষ ক্ষমতা যা মানুষকে অন্যান্য প্রজাতির থেকে পৃথক করেছে। এই বিশাল পৃথিবীতে এমন কতিপয় কিছু মানুষ রয়েছেন যাঁরা তাঁদের মাথায় ঘুরতে থাকা নানান চিন্তা বা কল্পনাকে বাস্তবের মাটিতে কার্যকর করে দেখানোর সাহস দেখান। এটি করতে গিয়ে নানান প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের কিন্তু একবগ্গা হয়ে নিজের কল্পনাকে বাস্তবায়িত করেই ছাড়েন তাঁরা। আজ এমনই অতি সাধারণ এক মানুষের অসাধারণ এক কর্মকাণ্ডের কাহিনী শোনাবো। শোনাবো কীভাবে গড়ে তুললেন তিনি এক অভিনব পাথরের বাগান (Stone Garden)।

ইরানের কারমান প্রদেশের অন্তর্গত সারজান শহর। সারজান আসলে একটি মরু শহর। ধূ ধূ মরুভুমির বুকের ভেতরই নিজেদের মত করে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করে নিয়েছে স্থানীয় ইরানীরা। এই সারজান বিখ্যাত প্রধানত তিনটি কারণে- এক পৃথিবী বিখ্যাত পেস্তা বাদাম, দুই- জগদ্বিখ্যাত পারস্য কিলিম গালিচা এবং তিন, বায়ু সংগ্রাহক মিনার(পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই এই স্থাপত্য দেখা যায়)। এই সারজান শহর থেকে দক্ষিণ পূর্ব বরাবর চল্লিশ কিমি এগোলেই চোখে পড়বে বালভার্ড জেলার মিয়ানদোয়াব গ্রাম। অনন্ত বিস্তৃত মরুভূমির (পাশতুনে যাকে ‘দাশত-ই লুট’ (Dasht-e Lut) বলা হয়) মাঝে সামান্য কয়েক ঘর মানুষ আর কিছু গবাদি পশু। এই জনাকীর্ণ প্রান্তরেই রয়েছে এক অদ্ভুত পাথরের বাগান । পাশতুন ভাষায় একে ‘বাগ-ই-সাঙ্গি’ বলা হয়। প্রায় একশো আশিটি মত গাছ কোনটিতেই সবুজের লেশ মাত্র নেই। মরা ডাল থেকে তার দিয়ে বেঁধে বড় বড় পাথর কে যেন ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। দিন নেই রাত নেই গাছগুলি পাথর বুকে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।

পাথরের বাগান

একদা এই অঞ্চলটির মালিক ছিলেন দারভিশ খান এসফান্দিয়ারপুর নামে এক ব্যক্তি যিনি জন্মগত মূক ও বধির ছিলেন। দারভিশের পূর্ব পুরুষ এক সময় এই এলাকার জমিদার ছিলেন যে কারণে তাঁরা এখনো ‘খান’ উপাধি ব্যবহার করেন নামের মাঝে। দারভিশ খান এলাকার অন্যতম সম্পন্ন কৃষক ছিলেন যিনি মূলত কাঠবাদাম চাষ করতেন। জনশ্রুতি বলে দারভিশ জন্মগত মূক ও বধির হলেও অসাধারণ সাহসী ছিলেন। একবার নাকি তিনি তাঁর এক ভেড়াকে বাঁচাতে দুটি লেপার্ডের সাথে লড়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলে তিনি নাকি খেলাচ্ছলে নেকড়ে এবং বিষধর সাপের সাথে মজা করেন।

পাথরের বাগান

১৯৬১ সালে ইরানে মহম্মদ রেজা শাহের আমলে নতুন জমি নীতি তৈরি হলে দারভিশ খানের সমস্ত জমিই প্রায় সরকারের আওতায় চলে আসে। জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন দারভিশ। কথা বলতে না পারলেও নীরবেই তিনি সরকারের এই নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবেন ঠিক করেন। কিন্তু কীভাবে? কীভাবে সম্পূর্ণ অহিংস পথে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো যায় তা ভাবতে ভাবতে একদিন ভেবে ফেললেন এক অকল্পনীয় অথচ অতি সামান্য এক আইডিয়া।

পাথরের বাগান

দারভিশ প্রথমে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে মৃত গাছের ডাল সহ কান্ড এনে তাঁর বাড়ির সামনে এক টুকরো জমিতে সেই ডাল সহ কান্ড রোপন করলেন। এরপর সেই ডালে তাঁর জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের স্মারক হিসেবে একটি করে পাথর তার দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দিতে থাকলেন। প্রায় পাঁচ কিমির বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে একেকটি পাথর বয়ে আনতে তাঁর প্রায় দু মাস লেগে যেত। তবুও একাই বয়ে আনলেন প্রত্যেকটা পাথর। লোকে পাগল বলতে লাগল তাঁকে, কিন্তু তিনি তাঁর কল্পনা তাঁর লক্ষ্যে অবিচল। এইভাবে তিনি একদিন গড়ে তুললেন এক হাজার বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে একশো আশিটি পাথর ঝোলানো গাছের এক অসামান্য বাগান।

২০০৭ সালে নব্বই বছর বয়সে দারভিশ খানের মৃত্যু হয়। ইরানের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র এখন এই পাথরের বাগান। মৃত্যুর পর তাঁর তৈরি বাগানেই দারভিশ খানকে সমাধিস্থ করা হয়েছে।

জমি হারানোর শোকে পাথর হয়ে যাওয়া হৃদয় হয়ত পাথরের মাধ্যমেই বলতে চেয়েছিল, শাসক তুমি আমার সব কেড়ে নিতে পারো, কেবল আমার ইচ্ছে আর কল্পনাটা কাড়তে পারবে না। সেই কথায় বলে না, Ideas are bulletproof!


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading