‘ইনফোসিস ফাউণ্ডেশন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার চেয়ারপার্সন হিসেবে খ্যাত সুধা মূর্তি (Sudha Murty) একজন জনপ্রিয় ইঞ্জিনিয়ার, লেখিকা এবং সমাজসেবী। কম্পিউটার প্রযুক্তি ও কারিগরিবিষয়ে কর্মজীবন শুরু করেন সুধা মূর্তি । তাঁর স্বামী নারায়ণ মূর্তির সঙ্গে একযোগে তিনি শুরু করেন ‘ইনফোসিস’ নামে প্রযুক্তি সংস্থা। কিন্তু পরবর্তীকালে মেধাবী ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ইনফোসিস থেকে সরে আসতে হয় তাঁকে। কর্ণাটকে সমস্ত বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ও পাঠাগারের ব্যবস্থা চালু করেন সুধা মূর্তি। এছাড়াও কন্নড় ও ইংরেজি ভাষায় বহু বই লিখেছেন তিনি যার মধ্যে ‘দোল্লার বহু’ একটি অন্যতম জনপ্রিয় রচনা এবং এই উপন্যাস অবলম্বনে ২০০১ সালে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মিত হয়। কয়েকটি কন্নড় ছবিতে অভিনয়ও করেছেন তিনি। ২০০৬ সালে ভারত সরকার সমাজসেবামূলক কাজের কারণে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করে।
১৯৫০ সালের ১৯ আগস্ট কর্ণাটকের হাভেরির শিগগাঁওতে একটি কন্নডিগা ব্রাহ্মণ পরিবারে সুধা মূর্তির জন্ম হয়। তাঁর বাবা আর. এইচ. কুলকার্নি পেশায় একজন শল্য চিকিৎসক ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল বিমলা কুলকার্নি। তাঁর বাবা-মা এবং দাদু-দিদার কাছে অন্য তিন ভাই-বোনের সঙ্গে একত্রে বড়ো হয়েছেন সুধা মূর্তি। তাঁর শৈশবের স্মৃতি সব ধরা পড়েছে পরবর্তীকালে তাঁর লেখা ‘হাও আই টট মাই গ্র্যাণ্ডমাদার টু রিড’, ‘ওয়াইজ অ্যাণ্ড আদারওয়াইজ অ্যাণ্ড আদার স্টোরিজ’ নামের দুটি বইতে। তাঁর ভাই শ্রীনিবাস কুলকার্নি পরবর্তীকালে একজন মহাকাশবিদ হিসেবে পরিচিত হন এবং ২০১৭ সালে ড্যান ডেভিড পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নারায়ণ মূর্তির সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।
কর্ণাটকের হাবলির বি.ভি.বি কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বি.ই ডিগ্রি অর্জন করেন সুধা মূর্তি। তাঁর দক্ষতা ও মেধার জন্য এই কলেজ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি, কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী নিজে তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেন। পরবর্তীকালে ইণ্ডিয়ান ইন্সটিটিউট থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে এম.ই ডিগ্রি অর্জন করেন। এই স্নাতকোত্তর স্তরেও স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তিনিই ছিলেন একমাত্র ছাত্রী। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে সেই কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকে তিনটি শর্ত দেন – প্রথমত সর্বদা কলেজে শাড়ি পরে আসতে হবে, কখনো ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না এবং তৃতীয় কলেজ ক্যান্টিনে যাওয়া যাবে না। প্রাথমিকভাবে প্রথম ও তৃতীয় শর্ত তিনি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্নাতক স্তরে প্রথম স্থান অর্জনের পরে তাঁর পুরুষ সহপাঠীরা নিজে থেকেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন। তাঁর আগে দীর্ঘ এক বছর সুধা কারও সঙ্গেই কথা বলেননি।
টাটা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাণ্ড লোকোমোটিভ কোম্পানি অর্থাৎ টেলকো (TELCO) সংস্থায় তিনিই প্রথম মহিলা কর্মী হিসেবে যোগ দেন। এর পিছনেও রয়েছে একটি কাহিনী। এই সংস্থায় চাকরির আবেদন করার সময় তিনি লক্ষ করেন যে, বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল কোনো মহিলার আবেদনের প্রয়োজন নেই। এই কথা দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হন সুধা এবং এই চাকরি করার পিছনেই রোখ চাপে তাঁর। অহেতুক এই লিঙ্গবৈষম্যের কারণ জানতে চেয়ে চাকরির আবেদন করার পাশাপাশি জে.আর.ডি টাটাকে চিঠি লেখেন সুধা মূর্তি। তার কিছুদিনের মধ্যেই টাটার কাছ থেকে উত্তর আসে এবং তাঁর জন্য বিশেষ ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করা হয়। চাকরির জন্য মনোনীতও হয়ে যান সুধা। পুনেতে টেলকো সংস্থায় প্রথম মহিলা ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সুধা মূর্তি এবং পর এই সংস্থার মুম্বাই ও জামশেদপুর শাখাতেও কাজ করেছেন তিনি। টেলকো ছাড়াও ওয়ালচান্দ গ্রুপ অফ ইণ্ড্রাস্ট্রিজ-এ সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট পদেও বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন সুধা। আজীবন তিনি প্রাণের চেয়েও ভালোবেসেছেন বেশি বইকে। টেলকোয় পড়ার সময় বইপ্রেমী সুধা এক বন্ধুর থেকে বই নিতেন যার মধ্যে বেশিরভাগ বই থাকতো নারায়ণ মূর্তির লেখা। লেখকের লেখা পড়ে আগ্রহী হয়ে নারায়ণ মূর্তির সঙ্গে আলাপ করতে চান সুধা। দুজনেরই একই নেশা বই পড়া, ফলে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব জমে গেল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। নারায়ণ মূর্তি ছিলেন বরাবর খুব সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত এবং সাদামাটা ভাবটাই তাঁর বেশি ভালো লাগতো। যখনই তাঁদের কথা হতো, কথার বিষয় হতো বই। প্রকৃতিগতভাবে বিপরীত মেরুর ছিলেন সুধা এবং নারায়ণ। একদিকে সুধা ছিলেন খুবই বহির্মুখী এবং কথা বলতে বেশি ভালোবাসতেন আর নারায়ণ ছিলেন অন্তর্মুখী এবং শান্ত। নারায়ণ মূর্তিই একদিন প্রেম প্রস্তাব দেন সুধা মূর্তিকে। এদিকে সুধার বাবা-মা প্রথমে রাজি হননি এই সম্পর্কে। তার উপর এক সাক্ষাতে বম্বে থেকে কাজ সেরে অনেক দেরি করে সুধার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন নারায়ণ মূর্তি এবং পরবর্তীকালে একজন কমিউনিস্ট হিসেবে অনাথ আশ্রম খোলার পরিকল্পনার কথা জানালে সুধার বাবা নারায়ণকে নাকচ করে দেন। কিন্তু তিন বছর পরে তাঁদের বিবাহ হয়। নারায়ণ মূর্তি সেসময় একজন সামান্য রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করায় বেতন পেতেন সুধার থেকে কম, তাই রেস্তোরাঁয় খাবারের বিল মেটাতেন সুধাই। বিয়ে উপলক্ষে প্রথম সিল্কের শাড়ি পড়েছিলেন সুধা এবং পরবর্তীকালে জানা যায় বারাণসীতে গিয়ে প্রতি বছর একটি করে নতুন শাড়ি কেনার অভ্যাস ত্যাগ করেছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করার ভাবলেন নারায়ণ মূর্তি এবং এই কথা জানতে পেরে প্রথমে আপত্তি জানালেও সুধা শেষমেশ তাঁর স্বামীর উদ্যোগে সামিল হন। পারিবারিকভাবে ব্যবসার কোনো ইতিহাস ছিল না নারায়ণের, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তৈরি করেন ‘ইনফোসিস’ নামের একটি প্রযুক্তি ও প্রকৌশলী সংস্থা। সুধা মূর্তি হয়ে ওঠেন এই সংস্থার সেক্রেটারি। দুই সন্তানের মা হিসেবে সাংসারিক সমস্ত দায়িত্ব সামলে তিনি ইনফোসিসের কাজও সামলেছেন। জানা যায় মাঝেমধ্যে অফিসে এসেও রান্না করতেন সুধা। ইনফোসিস-এর ব্যবসা শুরু করার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল, সুধা তাঁর সমস্ত সঞ্চিত অর্থ এ জন্য তুলে দিয়েছিলেন নারায়ণের হাতে আর নিয়মিত অর্থের যোগান রাখতে অন্য একটি সংস্থায় কাজও করতেন তিনি। কিন্তু এত শ্রম দেওয়া সত্ত্বেও নারায়ণ মূর্তির ইচ্ছেয় তাঁকে ইনফোসিস থেকে সরে আসতে হয়। ইনফোসিসে স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই যুক্ত থাকুক চাইতেন না নারায়ণ মূর্তি। নিজের স্বপ্নকে দূরে সরিয়ে স্বামীর স্বপ্নকেই বড়ো করে দেখেছিলেন সুধা মূর্তি। ইনফোসিস থেকে সরে এসে সংসারের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন তিনি। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আক্ষেপ ছিল না সুধার। পরবর্তীকালে ইনফোসিস সংস্থার স্বেচ্ছাসেবী শাখা ‘ইনফোসিস ফাউণ্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত হন সুধা মূর্তি এবং এই সংস্থার পুরোধা হয়ে ওঠেন তিনি। এই শাখাটি তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে। সমাজসেবার নানা দিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর স্বনির্ভরতা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করে এই সংস্থা।
সুধা মূর্তি বরাবরই বেশ সাহিত্যপ্রেমী। বই পড়ার অভ্যাসের পাশাপাশি তিনি কন্নড় ও ইংরেজি ভাষায় বইও লিখেছেন বেশ কিছু। সবকটি বই শিশু-কিশোরদের জন্য উপযোগী এবং তার মধ্য দিয়ে কিছু বিশেষ সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সুধা মূর্তি। তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘দোল্লার বহু’ যে উপন্যাস অবলম্বনে ২০০১ সালে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মিত হয়। এছাড়া কন্নড় ভাষার কিছু ছবিতে অভিনয়ও করেছেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন হল দেশের প্রতিটি স্কুলে যথাযথগ ব্যবস্থাযুক্ত পাঠাগার গড়ে তোলা। ইনফোসিস ফাউণ্ডেশনের পক্ষ থেকে সুধা মূর্তির উদ্যোগে পুরো দেশে ৭০ হাজার পাঠাগার তৈরি হয়েছে। দেশের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের তিনি বই কিনে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে বলেছেন যাতে লেখকরাও লাভবান হতে পারেন। যশ ও খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও খুবই সাদামাটা জীবনযাপনেই অভ্যস্ত সুধা মূর্তি।
২০০৬ সালে ভারত সরকার সমাজসেবামূলক কাজের কারণে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়াও ‘কর্ণাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার’, ‘ওজোস্বিনী পুরস্কার’, ‘রাজা লক্ষ্মী পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন সুধা মূর্তি। ২০১৯ সালে কানপুর আইআইটি তাঁকে সম্মানীয় ডক্টর অফ সায়েন্স (DSc.) উপাধি প্রদান করেছে।
বর্তমানে ইনফোসিস ফাউণ্ডেশনের হয়েই সমাজসেবামূলক কাজ করে চলেছেন সুধা মূর্তি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to আজকের দিনে ।। ১৯ আগস্ট | সববাংলায়Cancel reply