নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে সেই সূদুর অতীতকালে গ্রীসদেশে রচিত নাটকগুলিকে অবহেলা করা যাবে না, বরং একটু বেশি গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হবে। এর একটা প্রধান কারণ, নাটকের অন্যতম একটি ধারা ট্র্যাজেডি সেই প্রাচীন গ্রীসেই কয়েকজন প্রতিভাবান নাট্যকারের হাতে তৈরি হয়ে উঠেছিল তখন। তাঁদেরই মধ্যে একজন যিনি ট্র্যাজেডি রচয়িতা হিসেবে খুব বিখ্যাত হয়েছিলেন, তিনি হলেন ইউরিপিডিস (Euripides)। আরও যে দুজন ট্র্যাজেডিকারের সঙ্গে ইউরিপিডিসের নাম এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়, তাঁরা হলেন সোফোক্লিস এবং ইস্কাইলাস। আধুনিক নাট্যে ইউরিপিডিসের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তাঁর নাটকে তিনি যেভাবে নারী এবং দাস এই উভয় শ্রেণীর কথা তুলে ধরেন তা সাম্যবাদের দিকেই ইঙ্গিত করে। আধিপত্য বিস্তারকারী বিশাল নায়কের তুলনায় তিনি সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্ব-সমস্যা নিয়ে নাটক লিখেছিলেন। তবে ইউরিপিডিসের অনেক নাটক আবার কমেডি ঘরানার নিকটবর্তী ছিল। কমেডি নাটকের ধারার মধ্যেও ইউরিপিডিসের প্রভাব লক্ষণীয়।
ইউরিপিডিসের জীবন সংক্রান্ত কয়েকটি বিবরণ অনুসারে আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ৪৮০ সালে গ্রীসের সালামিস দ্বীপে একটি স্বচ্ছল পরিবারে ইউরিপিডিসের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ম্নেসারকাস বা ম্নেসারচাইডস (Mnesarchus বা Mnesarchides) এবং মায়ের নাম ক্লিটো৷ তাঁর বাবা ছিলেন ফ্লিয়ার ডেমের একজন খুচরো বিক্রেতা এবং জানা যায় তাঁর মা বাজারে ভেষজ বিক্রি করতেন।
ইউরিপিডিসের বাবা-মা তাঁকে অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে তাঁর জিমন্যাস্টিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। আসলে ইউরিপিডিসের জন্মের আগে তাঁর বাবা-মা এক বাণী শুনেছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল যে, শিশুটি বিজয় মুকুটের অধিকারী হবে। তবে এই বাণীটির অর্থ ভুল বুঝে ইউরিপিডিসকে জিমন্যাস্টিকে ভর্তি করেছিলেন তাঁর বাবা-মা। এও বলা হয় যে, ছোটবেলায় অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতায় জিতেছিল ইউরিপিডিস। তবে তাঁর আসল জয়লাভ যে রঙ্গমঞ্চে হবে তা হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করেননি।
তিনি প্রায়শই দার্শনিক অ্যানাক্সাগোরাস এবং সক্রেটিসের সাথে যুক্ত ছিলেন, যাদের সাথে তিনি তাঁর সারাজীবন অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব উপভোগ করেছিলেন। তিনি প্রোটাগোরাস এবং প্রোডিকাসের কাছ থেকেও নির্দেশনা পেয়েছিলেন। প্রোডিকাস এবং অ্যানাক্সগোরাস, এই দুই মাস্টার্সের অধীনে চিত্রকলা ও দর্শন বিষয়ে চমৎকার জ্ঞানার্জন করেছিলেন ইউরিপিডিস। অ্যাপোলো জস্টেরিয়াসের আচার-অনুষ্ঠানে পানপাত্র বহনকারী এবং মশাল বহনকারী হিসেবেও অল্প সময়ের জন্য কাজ করেছিলেন ইউরিপিডিস।
গ্রীসদেশের সংস্কৃতির অধিকাংশটাই তখন প্রায় বলা যেতে পারে ডায়োনোসিয়া উৎসবের নাট্যপ্রতিযোগিতায় কেন্দ্রীভূত ছিল। গ্রীসের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট অলিম্পাসে সেই খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে উক্ত উৎসবটি উপলক্ষে যে নাটকের প্রতিযোগিতা হত তা কেবলমাত্র বিনোদনের গন্ডীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেই প্রতিযোগিতায় হার-জিতের ওপর নাট্যকারদের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান অনেকখানি নির্ভর করত। কমেডি, স্যাটায়ার ইত্যাদি বিভিন্ন রকম নাটকের চল থাকলেও সেখানে ট্র্যাজেডির কদর ছিল সবচেয়ে উঁচুতে। উচ্চমানের ট্র্যাজেডি রচয়িতাকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট নাটককারের সম্মান প্রদান করা হত প্রাচীন গ্রীসে। অ্যারিস্টটলও ট্র্যাজেডিকেই বিবিধ প্রকার নাটকের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু আসন প্রদান করেছিলেন। অলিম্পাস পর্বতে সেই ডায়োনোসিয়া উৎসবের নাট্যপ্রতিযোগিতাকে আসলে ট্র্যাজেডি-যুদ্ধ বলা যেতে পারে। কোন নাট্যকার কত ভাল ট্র্যাজেডি রচনা করতে পারেন, এ যেন তারই লড়াই ছিল। প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার জন্যই প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ ট্র্যাজেডি রচিত হত। এই প্রতিযোগিতায় প্রথম শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান পেয়েছিলেন থেসপিস। পরবর্তীতে এই ট্র্যাজেডি রচনার ধারায় আরও যে-তিনটি নাম জনপ্রিয় হয়েছিল, তাঁরা হলেন, এস্কাইলাস, সোফোক্লিস এবং ইউরিপিডিস।
সম্ভবত খ্রীস্টপূর্ব ৪৫৫ সালে ডায়োনোসিয়া উৎসবে প্রথম ইউরিপিডিস ধারাবাহিক কয়েকটি নাটক করেছিলেন। যদিও জিততে পারেননি তিনি, তৃতীয় স্থান পেয়েছিলেন। এই প্রতিযোগিতায় ইউরিপিডিস প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন খ্রীস্টপূর্ব ৪৪১ সালে। তবে জানা যায়, তাঁর ৯২টি (মতান্তরে ৯৫, কখনও ৯০) নাটকের মধ্যে কেবল ৪টি প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল। বর্তমানে ইউরিপিডিসের ১৮টি ট্র্যাজেডি এবং একটি স্যাটায়ার, মোট ১৯টি পূর্ণাঙ্গ নাটকের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে কেউ কেউ বলেন ১৮টি নাটক পাওয়া যায়।
ডায়োনোসিয়া নাট্য প্রতিযোগিতায় বহুবার হারের জন্যই হয়তো ইউরিপিডিস ম্যাসিডোনিয়ার রাজা প্রথম আর্কেলাউসের আমন্ত্রণে ৪০৮ খ্রীস্টপূর্বাব্দে এথেন্স ত্যাগ করেছিলেন। তবে তাঁর মেসিডোনে যাওয়ার এই তথ্য নিয়ে মতভেদও লক্ষ করা যায়।
ইউরিপিডিস সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয় যে, তিনি নাকি সালামিসের সমুদ্রের ধারে এক গুহায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন। সেখানে একটি বাড়ি এমনকি এক লাইব্রেরিও তৈরি করেছিলেন তিনি।
বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইউরিপিডিস জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়, কিন্তু এ-সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না৷ এছাড়াও সূত্র থেকে মনে করা হয়, তিনি সিসিলির সিরাকিউসেও ভ্রমণ করেছিলেন।
ইউরিপিডিস সম্পর্কে আরেকটি যে তথ্য বিদ্যমান, তা হল, তিনি দুটি বিবাহ করেছিলেন। সেই দুই স্ত্রীয়ের নাম কোয়েরিল (Choerile) এবং মেলিটো (Melito)। যদিও কাকে তিনি প্রথমে বিবাহ করেছিলেন তা নিয়ে সূত্রগুলি নানানরকম তথ্য দেয়, ফলে এবিষয়টিও নিশ্চিত করে বলা যায় না৷ দুটি বিবাহের কোনটিতেই সুখী হননি ইউরিপিডিস। সূত্রানুযায়ী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ইউরিপিডিসের সাহিত্য সহযোগী হিসেবে বর্ণিত সেফিসোফোনের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত ছিল। স্ত্রীয়ের এমন আচরণের প্রতিক্রিয়ায় ইউরিপিডিস ‘হিপপোলিটাস’ নাটকটি রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। তাঁর নাকি তিনটি পুত্র ছিল বলে জানা যায় এবং এও গুজব রয়েছে যে তাঁর একটি কন্যাও ছিল, যে কিনা শৈশবে একটি উন্মত্ত কুকুরের আক্রমণে মারা যায়।
কেউ কেউ এই গুজবটিকে অ্যারিস্টোফেনেস দ্বারা তৈরি একটি রসিকতা বলে অভিহিত করেছেন। আসলে কমিক লেখক অ্যারিস্টোফেনেস প্রায়শই ইউরিপিডিসকে নিয়ে এমন মজা করতেন। তবে অনেক ঐতিহাসিক গল্পটিকে সত্য বলে মনে করেন।
ইউরিপিডিসের লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘আলসেস্টিস’, ‘মেদেয়া’, ‘ইলেক্ট্রা’, ‘দ্য বাচ্চায়ে’, ‘হিপপোলিটাস’, ‘হেরাক্লিস’, ‘হেলেন’, ‘ট্রোজান উওমেন’, ‘দ্য সাপ্লায়েন্টস’, ‘এন্ড্রোমাচে’, ‘অরেস্টেস’ ইত্যাদি। তাঁর খন্ডিত আকারে পাওয়া নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘টেলিফাস’, ‘ক্রিটান’, ‘স্টেনেবোয়া’, ‘আলেকজান্দ্রোস’, ‘ফেথন’, ‘এরেকথিউস’, ‘অ্যান্টিওপ’, ‘অ্যান্ড্রোমিডা’ ইত্যাদি। ‘রিসাস’ নামের একটি নাটককে ইউরিপিডিসের বলে চালানো হয় বটে কিন্তু বেশিরভাগ পণ্ডিত একমত যে এটি ইউরিপিডিসের লেখা নয়।
ইউরিপিডিসের পূর্বতন নাট্যকারদের রচনায় উচ্চবংশীয় সম্রাট কিংবা পৌরাণিক গ্রীক দেবদেবীদের ওপরেই বেশি মনোযোগ লক্ষ করা যেত। তবে ইউরিপিডিসের রচনায় এত বিস্তারিতভাবে প্রথম নারী এবং শিশুদের কথা উঠে এসেছিল। এমনকি রাজাদের মুখেও দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষা বসিয়ে তাদেরকে সাধারণ মানুষের সমপর্যায়ে এনে ফেলেছিলেন ইউরিপিডিস। তাঁর এই নতুন ধরনের রচনা নাট্যসাহিত্যধারার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছিল। কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের চেয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা এবং অভিজ্ঞতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন ইউরিপিডিস। বর্তমান সমাজ সম্পর্কে যত স্পষ্ট করে কথা বলে ইউরিপিডিসের চরিত্ররা, তেমনটা এস্কাইলাস বা সোফোক্লিসের চরিত্ররা বলেনি। সামাজিক বা শারীরিক অবস্থার পরিবর্তে চরিত্রের মানসিক অবস্থার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন ইউরিপিডিস। এসব থেকেই বোঝা যায় কেন আধুনিক নাটক ইউরিপিডিস দ্বারা এতখানি প্রভাবিত হয়েছিল। তাঁর অনেক নাটকের মধ্যে আবার কমেডির বীজও লুকিয়ে ছিল।
ইউরিপিডিসের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আবার একটু সংশয় রয়েছে। একটি সূত্র অনুযায়ী, ম্যাসিডোনিয়ার রাজা প্রথম আর্কেলাউসের আমন্ত্রণে ৪০৮ বা ৪০৭ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে নাকি আমন্ত্রণের কারণেই ম্যাসিডোনিয়ায় গিয়েছিলেন, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ম্যাসিডোনিয়ার রাজার সম্মানে ‘আর্কেলাউস’ রচনা করেছিলেন তিনি। একটি মতানুসারে, সেই ম্যাসিডোনিয়ার প্রচন্ড শীতে ৪০৬ বা ৪০৭ খ্রীস্টপূর্বাব্দে প্রাণ হারিয়েছিলেন ইউরিপিডিস। অনেকে আবার মনে করেন ইউরিপিডিস এথেন্সেই মারা গিয়েছিলেন। তবে যেহেতু অধিকাংশ গবেষকই ম্যাসিডোনিয়াতে ইউরিপিডিসের মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করেন, তাই সেটিকে আমরাও মান্যতা দিচ্ছি। জীবদ্দশায় তেমন জনপ্রিয়তা না পেলেও মৃত্যুর পর সর্বকালের সেরা ট্র্যাজেডিয়ানদের মধ্যে একজন হিসেবে সারস্বতসমাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন ইউরিপিডিস।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান