এই কলকাতা শহরের বুকে সাতের দশকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে এমন এক হত্যাকান্ড ঘটে গিয়েছিল যা গোটা শহরকেই এক ধাক্কায় যেন নড়েচড়ে বসিয়ে দিয়েছিল। কলকাতার এক শিক্ষিত, অভিজাত পরিবারের মধ্যে ঘটে যাওয়া ষড়যন্ত্রমূলক এই হত্যার সঠিক কূলকিনারা আজও সেই ভাবে হয়ে ওঠেনি। ১৯৭৬ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে মৃত্যু ঘটে ছিল উচ্চশিক্ষিতা সুরূপা গুহ-র। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সতীকান্ত গুহর পুত্রবধু ছিলেন এই সুরূপা গুহ। সেই রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তে উঠে এসেছিল নানারকম তত্ত্ব, সন্দেহের তালিকা হয়েছিল দীর্ঘ। তাঁর পরিবারের বেশ কয়েকজনকে তো গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয়। এমনকি টলিপাড়ার প্রথিতযশা এক অভিনেত্রীর নামও জড়িয়ে গিয়েছিল এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে। আদালতে দীর্ঘদিন সুরূপা গুহ হত্যা মামলার বিচার হওয়া সত্ত্বেও আজও সুরূপা গুহ হত্যা এক ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে যেন। পরবর্তীকালে বহুল চর্চিত এই রহস্যজনক ঘটনাটি নিয়ে এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা পর্যন্ত করা হয়।
১৯৭৬ সালের মে মাসে খোদ কলকাতার বুকে, শহরের অন্যতম অভিজাত ও নামজাদা এক পরিবারের অভ্যন্তরে ঘটে গিয়েছিল এক মর্মন্তুদ হত্যাকান্ড। গুহ পরিবারের বউ সুরূপা গুহ (বিবাহের পূর্বে ছিলেন মুখার্জি) ছিলেন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের কেমিস্ট্রির একজন গবেষিকা। সুরূপার শ্বশুর সতীকান্ত গুহ ছিলেন সাউথ পয়েন্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা যা কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত বিদ্যালয়। তাঁর স্বামী ইন্দ্রনাথ গুহ সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ট্রাস্টিদের মধ্যে অন্যতম এবং ২০০০ সালে গার্ডেন হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
৪ মে কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে সকাল ১০টা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসেন সুরূপা। সেই রাজাবাজার থেকে বালিগঞ্জের হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে ঘর্মাক্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় ফেরবার পর বাড়ির পরিচারক ঝন্টু তাঁকে লস্যি এবং কয়েক টুকরো শশা খাওয়ার জন্য দিয়ে গিয়েছিল। সেই লস্যি খেয়েই প্রচুর পরিমাণে বমি করতে শুরু করেন সুরূপা, পেটে তাঁর যন্ত্রণা শুরু হয়। সকাল ১১টার দিকে পারিবারিক চিকিৎসক আসেন, কিন্তু তিনি গতিক ভাল না বোঝায় তৎক্ষণাৎ সুরূপাকে হাসপাতালে ভর্তি করবার নির্দেশ দেন। এরপর পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সুরূপাকে এবং ১১.৩০টা নাগাদ তাঁকে সেখানে ভর্তি করা হয়। ডাক্তাররা সুরূপাকে জিজ্ঞেস করায় তিনি অনেক কষ্টে বলেছিলেন তিনি কোন বিষ খাননি, লস্যি খেয়েছিলেন। দুপুর ১টা নাগাদ সুরূপার বাবা রমেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়কে ফোন করা হয়েছিল। পিজির এমার্জেন্সি বিভাগে ডাক্তারদের প্রভূত চেষ্টার পরেও বাঁচানো যায়নি সুরূপাকে। রাত ১১.৩০টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। ডাক্তাররা সুরূপার ডেথ সার্টিফিকেটে প্রাথমিকভাবে লিখেছিলেন অজানা বিষক্রিয়ায় কার্ডিওরেসপিরেটরি ব্যর্থতার ফলে মৃত্যু। পরে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানতে পারা যায় সুরূপার পেটে পাওয়া ভয়ংকর বিষটি হল মারকিউরিক ক্লোরাইড।
সকালে সুরূপাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরে তাঁর স্বামী ইন্দ্রনাথ হাসপাতাল থেকে বমি মাখা সুরূপার বিছানার চাদর ও পোশাক নিয়ে গিয়েছিলেন এমনকি রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের ল্যাবরেটরিতেও তিনি গিয়েছিলেন। রাতে বালিগঞ্জ থানায় গিয়ে ইন্দ্রনাথ বলেন তাঁর স্ত্রী বাড়িতে বা সায়েন্স কলেজে ভুলবশত কোন বিষাক্ত পদার্থ খেয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু সুরূপার মৃত্যুর পরদিন তাঁর বাবা রমেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় বালিগঞ্জ থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন এই মর্মে, যে, বিষ খাইয়ে তাঁর কন্যাকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও দীর্ঘদিন তাঁর কন্যার ওপরে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনও করা হয়েছে। এই খবর বাইরে আসতেই গণমাধ্যম তোলপাড় হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে নামজাদা গুহ পরিবার নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। পুলিশের উপর ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকে। রমেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের বয়ানের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক তদন্তের ভারতীয় দন্ডবিধির ১২০বি, ৩২৮, ৩০২ ও ২০১ ধারার অধীনে ইন্দ্রনাথ, তাঁর বাবা-মা সতীকান্ত গুহ ও প্রীতিলতা গুহ, চাকর ঝন্টুচরণ এবং রমেন্দ্রনাথ লাহিড়ী নামে একজন ড্রাইভারের বিরুদ্ধে চার্জশীট জমা দেয়। আলিপুরের সাবডিভিশনাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২০৯ ধারার অধীনে অভিযুক্তদের দায়রা আদালতে প্রেরণ করেন। মামলার নিষ্পত্তির জন্য তাকে আলিপুরের ১১তম অতিরিক্ত দায়রা জজের কাছে স্থানান্তর করা হয়। রেকর্ডে থাকা উপাদানসমূহের বিচার, বিবেচনা করে অতিরিক্ত দায়রা জজ ড্রাইভার রমেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর বিরূদ্ধে মামলা করবার কোনও সঙ্গত কারণ খুঁজে পাননি এবং ২২৭ ধারার অধীনে তাকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
তদন্তকারী অফিসারের তদন্তের রিপোর্টে এমন কোন প্রত্যক্ষদর্শীর কোন বয়ান নেই যা থেকে প্রমাণ হতে পারে যে সুরূপা এবং সতীকান্তের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না। অন্য একটি বিবৃতি অনুযায়ী ১৯৭৬ সালের ২৪ এপ্রিল সুরূপার মা তাঁর স্বামীর ভাইকে নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের গেস্ট হাউসে গিয়েছিলেন, যেখানে প্রীতিলতা গুহ তখন অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছিলেন এবং দেখা যায় সেখানে প্রীতিলতার ঘরে সতীকান্ত, ইন্দ্রনাথ, ঝন্টুচরণ, রমেন্দ্র লাহিড়ী এবং মিস. ভিনসেন্ট নামে একজন বসে কীসব আলোচনা করছেন। প্রসিকিউশনের মতে, এই বৈঠকই সুরূপা গুহ হত্যার নেপথ্য ষড়যন্ত্রের একটি প্রমাণ। যদিও মাননীয় বিচারপতি জানিয়েছিলেন যে, এইরকম একটা বৈঠক দূর থেকে দেখেই এমন সিদ্ধান্তে আসা চলে না। বরং বাড়িতে ঝামেলার পরে রাগবশত প্রীতিলতা যখন গেস্ট হাউসে এসে থাকতেন তখন বাড়ির লোকজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হয়েছে বিচারপতির। অন্যদিকে বেশ কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে জানা যায় প্রীতিলতা এবং ইন্দ্রনাথ সুরূপার ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করতেন, এমনকি প্রীতিলতা নাকি সুরূপাকে আত্মহত্যার কথাও বলেন। কিন্তু তদন্তে দেখতে পাওয়া গেছে যে, প্রীতিলতার বলা সেই কথার সময়কাল সুরূপার মৃত্যুর তারিখের আশেপাশের নয়। তাছাড়া প্রীতিলতার বিপক্ষে এমন কোনও জোরালো সাক্ষ্যপ্রমাণও পাওয়া যায় না, যা তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে। আবার গুহ পরিবারের পরিচারক ঝন্টুচরণ সম্পর্কে সে-বাড়ির ঝাড়ুদার কালু নায়ক এবং ইন্দ্রনাথের বন্ধু জীতেন্দ্র তিলকের বক্তব্য থেকে জানা যায় মৃত্যুর দিন সকালে ঝন্টুই সুরূপাকে খাবারগুলি দিয়েছিল। তবে ঝন্টুর কৌঁসুলি মিঃ ঘোষ যুক্তি দেন যে, সুরূপা আদতে আত্মহত্যাই করেছিলেন। তিনি বলেন রেকর্ড অনুযায়ী সুরূপার দরজা ভিতর থেকে লাগানো ছিল এবং বাথরুমের দরজাও ভেঙে সুরূপাকে অসহায় অবস্থায় পাওয়া যায়। তাছাড়া মিঃ ঘোষ আরও বলেন যে সুরূপার বমিতে লস্যি বা শশা কোনটারই চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এরপর আরও দাবি করা হয় যে, মারকিউরিক ক্লোরাইড নামক বিষটি আদতে সায়েন্স কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে পেয়েছিল সুরূপা। ঝন্টুর বিরূদ্ধে প্রমাণ লোপাট বা ধ্বংস করার কোন অভিযোগও কেউ করেনি।
পারিবারিক লোকজনের বাইরেও সিনেমা জগতের একজন নামজাদা তারকা অভিনেত্রী এবং পরিচালক অপর্ণা সেন-এর নামও জড়িয়ে পড়েছিল এই মামলাটির সঙ্গে। অপর্ণা সেনের সঙ্গে ইন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্ক ছিল, ফলে সুরূপার মৃত্যুর ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে এই অভিনেত্রীর কোনও ভূমিকা আছে কিনা তাও তদন্তের আলোর নীচে আনা হয়। ফলে পুলিশ ও সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছিল অভিনেত্রী অপর্ণা সেনকে।
মামলাটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলবার পর কলকাতার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রণবীর মহাপাত্র ১৯৮১ সালে জানিয়েছিলেন এটি আত্মহত্যা নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাই। তবে রণবীর এও যোগ করেছিলেন যে, খুনিকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হওয়া যায়নি। অভিযুক্তের তালিকায় সবার প্রথমে যিনি ছিলেন অর্থাৎ ইন্দ্রনাথ গুহকে হত্যার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হলেও প্রমাণ কারচুপির কারণে তাঁকে আদালত দুই বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করে।
আজও সুরূপা গুহ হত্যা মামলা রয়ে গেছে অমীমাংসিত। কে ছিল আসল খুনি তা আজও অজ্ঞাত। পরবর্তীকালে অরিন্দম শীলের মতো চলচ্চিত্র পরিচালকরা এই রহস্যজনক মর্মান্তিক ঘটনাকে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করলেও এ-রহস্যের যবনিকা আর হয়তো ওঠা সম্ভবপর নয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান