সববাংলায়

চোখ বন্ধ করলে ভারসাম্য নষ্ট হয় কেন?

আমরা প্রতিদিন দাঁড়ানো, হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় খুব স্বাভাবিকভাবেই শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখি। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই অনেক সময় হঠাৎ টলমল ভাব আসে অর্থাৎ আমাদের দেহের স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখার ক্ষমতা কমে যায়। আমরা সরলরেখায় নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতে পারি কিন্তু চোখ বন্ধ করলে আর সোজা যেতে পারি না – সেও ঘটে এই ভারসাম্যহীনতার কারণেই। এখন প্রশ্ন হল চোখ বন্ধ করলে ভারসাম্য নষ্ট হয় কেন? এখানে আমরা তারই উত্তর খুঁজব।

প্রথমেই জানাই মানুষের ভারসাম্য রক্ষার পিছনে কাজ করে শরীরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম, যাদের মধ্যে চোখ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারসাম্য রক্ষায় চোখের ভূমিকা

চোখ আমাদের চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ক্রমাগত তথ্য মস্তিষ্কে পাঠায়। সামনে কী আছে, মাটি সমতল না ঢালু, শরীর সোজা আছে কি না — এই সবকিছু বোঝার জন্য দৃষ্টির উপর মস্তিষ্ক অনেকটাই নির্ভরশীল। চোখ খোলা থাকলে মস্তিষ্ক চারপাশের স্থির বস্তুর সঙ্গে শরীরের অবস্থান তুলনা করে দ্রুত ভারসাম্য ঠিক রাখে। চোখ বন্ধ করলে এই ভিজ্যুয়াল ফিডব্যাক হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে মস্তিষ্ক তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হারায় ফলে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

ভেস্টিবুলার সিস্টেম ও অন্তঃকর্ণের ভূমিকা

চোখ ছাড়াও ভারসাম্য রক্ষার আরেকটি প্রধান কেন্দ্র হলো অন্তঃকর্ণে থাকা ভেস্টিবুলার সিস্টেম। এই সিস্টেম মাথার নড়াচড়া, ঘূর্ণন এবং মাধ্যাকর্ষণের দিক শনাক্ত করে মস্তিষ্ককে জানায়। কিন্তু শুধুমাত্র ভেস্টিবুলার সিস্টেম একা সব সময় নিখুঁত ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। চোখ খোলা থাকলে ভেস্টিবুলার সিস্টেমের তথ্য চোখের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে মস্তিষ্ক সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। চোখ বন্ধ হলে এই সমন্বয় ভেঙে পড়ে এবং তাই ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়।

প্রোপ্রিওসেপশন: পেশী ও জোড়ার অনুভূতি

ভারসাম্য রক্ষার তৃতীয় স্তম্ভ হলো প্রোপ্রিওসেপশন — অর্থাৎ পেশী, টেন্ডন ও হাড়ের সন্ধিমুখের (Joint) মাধ্যমে শরীরের অঙ্গগুলোর অবস্থান বোঝার ক্ষমতা। পা মাটিতে কীভাবে চাপ দিচ্ছে বা শরীর সামনের দিকে ঝুঁকছে কি না, এসব তথ্য এই সিস্টেম সরবরাহ করে। তবে এই অনুভূতি অনেক সূক্ষ্ম এবং চোখের সাহায্য ছাড়া অনেক সময় মস্তিষ্কের পক্ষে তা ঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়। তাই চোখ বন্ধ হলে শুধু অন্তঃকর্ণ ও প্রোপ্রিওসেপশনের উপর নির্ভর করতে গিয়ে ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।

চোখ বন্ধে কেন বৃদ্ধদের সমস্যা বেশি হয়?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের দৃষ্টিশক্তি, অন্তঃকর্ণের সংবেদনশীলতা এবং প্রোপ্রিওসেপশন — তিনটিই ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। ফলে চোখ বন্ধ করলে বিকল্প সিস্টেমগুলো আগের মতো কাজ করতে পারে না। এজন্য বয়স্ক মানুষদের চোখ বন্ধ অবস্থায় দাঁড়াতে বা হাঁটতে বেশি সমস্যা হয় এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে চোখ বন্ধ করে পরীক্ষা কেন করা হয়?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘Romberg Test’ নামে একটি পরিচিত পরীক্ষা আছে, যেখানে রোগীকে চোখ বন্ধ করে দাঁড়াতে বলা হয়। যদি চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে চিকিৎসক বুঝতে পারেন যে সমস্যাটি দৃষ্টির অভাবে নয়, বরং স্নায়ু, প্রোপ্রিওসেপশন বা ভেস্টিবুলার সিস্টেমে থাকতে পারে। এই পরীক্ষাই প্রমাণ করে যে চোখ আমাদের ভারসাম্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, চোখ বন্ধ করলে ভারসাম্য নষ্ট হওয়া কোনও দুর্বলতা নয়, বরং এটি মানবদেহের জটিল সমন্বয় ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক ফল। চোখ, অন্তঃকর্ণ এবং পেশী-স্নায়ুর সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমরা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। চোখ বন্ধ মানেই এই সমন্বয়ের একটি বড় অংশ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া — আর তাই শরীর টলমল করে ওঠে। তবে যাঁরা নিয়মিত চোখ বন্ধ করে ভারসাম্য রাখার অভ্যাস করেন তাঁরা চোখ বন্ধ করে ভারসাম্য ধরে রাখতে সমর্থ হন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading