সববাংলায়

পরশুরামের কুঠার

বিভাগঃ ,

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “পরশুরামের কুঠার”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: চূড়ান্ত এবং নির্মম শাস্তি বা প্রতিশোধের অস্ত্র। এই প্রবাদটির সঙ্গে হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এখানে আমরা জেনে নেব “পরশুরামের কুঠার” প্রবাদটি এলো কীভাবে।

পরশুরামের কুঠার পৌরাণিক জগতে এক সর্বসংহারক ও ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। এই কুঠার দিয়েই তিনি নিষ্ঠুরভাবে একুশবার ক্ষত্রিয়কুল ধ্বংস করে পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেছিলেন—যার ফলে রক্তে প্লাবিত হয়ে উঠেছিল ভূমি, সৃষ্টি হয়েছিল তথাকথিত ‘রক্তগঙ্গা’। পরশুরামের এই কুঠার কেবল একটি অস্ত্র নয়, বরং তা প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার ও ধর্মরক্ষার এক জটিল প্রতীক।

‘পরশু’ শব্দের অর্থ কুঠার বা কুড়াল। সেই কারণেই কুঠারধারী রাম নামে তিনি পরিচিত হন ‘পরশুরাম’ নামে। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, তিনি বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। অন্যান্য অবতারের মতো তাঁর চরিত্র শান্ত বা করুণ নয়; বরং তিনি রুদ্ররূপী—ক্রোধ, প্রতিশোধ ও কঠোর ধর্মপালনের প্রতীক।

পৌরাণিক উপাখ্যান অনুসারে, মগধদেশে ভাগীরথী নদীর উপনদী কৌশিকীর তীরে অবস্থিত ছিল ভোজকট নামক এক নগর। এই নগরের রাজা ছিলেন গাধি। তাঁর দুই সন্তান—পুত্র বিশ্বামিত্র এবং কন্যা সত্যবতী। সত্যবতীর সঙ্গে বিবাহ হয় মহর্ষি ঋচিকের। ঋচিক ছিলেন মহর্ষি ভৃগুর পুত্র। তাঁদের সন্তান ছিলেন ঋষি জমদগ্নি। জমদগ্নির বিবাহ হয় বিদর্ভরাজ প্রসেনজিতের কন্যা রেণুকার সঙ্গে। রেণুকা ও জমদগ্নির পাঁচ পুত্র—রুষধান, সুসেন, বসু, বিশ্বাবসু এবং রাম, যিনি পরবর্তীকালে পরশুরাম নামে পরিচিত হন।

একদিন রেণুকা নদীর ঘাটে একাকী স্নান করতে গিয়ে দেখেন, রাজা চিত্ররথ তাঁর স্ত্রী ও অপ্সরাদের সঙ্গে জলকেলিতে মগ্ন। এই দৃশ্য রেণুকার মনে ক্ষণিকের জন্য কামভাবের সঞ্চার করে। জমদগ্নি তাঁর তপোবলে স্ত্রীর মনের এই বিচ্যুতি অনুভব করতে পারেন। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি পুত্রদের আদেশ দেন মাতৃহত্যার। প্রথম চার পুত্র এই ভয়াবহ আদেশ মানতে অস্বীকার করলে, কনিষ্ঠ রাম পিতৃআজ্ঞা পালন করতে পিছপা হন না। তিনি নিজের কুঠার দিয়ে মায়ের শিরচ্ছেদ করেন।

পুত্রের নিঃশর্ত আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে জমদগ্নি তাঁকে বর দিতে চাইলে, রাম মায়ের পুনর্জীবন কামনা করেন। ঋষির তপোবলে রেণুকা পুনরুজ্জীবিত হন। কিন্তু মাতৃহত্যার মহাপাপের ফলস্বরূপ কুঠারটি দীর্ঘকাল পরশুরামের হাতে লেগে থাকে। এই কারণেই তিনি ‘পরশুরাম’ — অর্থাৎ কুঠারধারী রাম নামে পরিচিত হন।

পরবর্তীকালে ক্ষত্রিয়রাজ কার্তবীর্য অর্জুন অন্যায়ভাবে জমদগ্নিকে হত্যা করলে পরশুরামের ক্রোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করবেন। সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষায় তিনি একুশবার পৃথিবী পরিভ্রমণ করে ক্ষত্রিয়দের ধ্বংস করেন। কুরুক্ষেত্রের সমন্তপঞ্চক অঞ্চলে ক্ষত্রিয়দের রক্তে পাঁচটি হ্রদ সৃষ্টি করে তিনি সেই রক্তে পিতৃতর্পণ করেছিলেন—যা তাঁর প্রতিশোধস্পৃহা ও ভয়ংকর শক্তির চূড়ান্ত প্রকাশ।

এই কারণেই নৃশংস প্রতিশোধ ও সর্বনাশা অস্ত্রের তুলনায় পরশুরামের কুঠার একটি চিরন্তন উপমা হয়ে উঠেছে। তাঁর কুঠার শুধুমাত্র ধ্বংসের প্রতীক নয়, বরং তা ধর্ম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সীমাহীন ক্রোধের এক জটিল পৌরাণিক রূপক।

‘পরশুরামের কুঠার’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। পরীক্ষায় নকল ধরা পড়ায় ছাত্রটির ভবিষ্যতের উপর যেন ‘পরশুরামের কুঠার’ পড়ল।
২। দীর্ঘ সতর্কবার্তার পর অবশেষে কোম্পানির ক্ষতিকর প্রকল্পে সরকারের ‘পরশুরামের কুঠার’ পড়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৯৭ পৃঃ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading