বিজ্ঞান

টার্ডিগ্রেড

 টার্ডিগ্রেড (Tardigrade) হল এমন একধরণের ক্ষুদ্রাকার প্রাণী যারা বেঁচে থাকতে পারে যে কোনো পরিবেশে। পর্বতের চূড়া থেকে গভীর সমুদ্রের তলদেশ, ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য থেকে আন্টার্কটিকার বরফের সাম্রাজ্য… পৃথিবীর প্রায় প্রতি অংশে পাওয়া গেছে এদের। এদের বিভিন্ন প্রজাতিরা চরম অবস্থার মধ্যেও টিকে থাকতে সক্ষম — যেমন চরম চাপ (উচ্চ এবং নিম্ন উভয়ই), চরম তাপমাত্রা, বায়ুর অনুপস্থিতি, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ, জলশূন্যতা, খাদ্যের অভাব ইত্যাদি অবস্থা যা দ্রুত প্রাণের অন্যান্য পরিচিত রূপকে হত্যা করবে।

১৭৭৩ সালে জার্মান প্রাণীবিদ জোহান অগস্ট এফ্রেইম গোয়েজ (Johan August Ephraim Goez) এই প্রাণীটির বিবরণ দেন এবং তাদের ‘ছোট্ট জল-ভালুক’ বা ‘little water bear’ নামে অভিহিত করেন। ১৭৭৭ সালে ইতালিয় জীববিদ ল্যাজারো স্পাল্লাঞ্জানি (Lazzaro Spallanzani) এদের ‘টার্ডিগ্রেডা’ বা ‘ধীরে চলে যারা’ (slow steppers) নাম দেন। এছাড়াও এদের ‘মস পিগলেট’ (moss piglet) ও বলা হয়ে থাকে। 

এই প্রাণীটির বিজ্ঞানসম্মত নাম হল Hypsibius dujardini,  প্রাণীজগতে এদের স্থান নিম্নরূপ:-

• ডোমেন (domain):- Eukarya (ইউক্যারিয়া)

• রাজ্য (Kingdom):- Animalia (প্রাণী)

• পর্ব (Phylum):- Tardigrada (টার্ডিগ্রেডা)

• শ্রেণী (Class):- Eutardigrada (ইউটার্ডিগ্রেডা)

• বর্গ (Order):- Parachela (প্যারাকেলা)

• গোত্র (Family):- Hypsibiidae (হিপসিবিডি)

• গণ (Genus):- Hypsibius (হিপসিবিয়াস)

• প্রজাতি (species):- H. dujardini (হিপসিবিয়াস দুজারদিনি)

এদের প্রায় ১৩০০-এরও বেশী প্রজাতি আছে যারা তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত, যেমন – ইউটার্ডিগ্রেডা, মেসোটার্ডিগ্রেডা ও হেটেরোটার্ডিগ্রেডা।

একটি পূর্ণবয়স্ক টার্ডিগ্রেডের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ০.০৫ মিলিমিটার বা ০.০২ ইঞ্চি। দেহের আকৃতি হয় পিপের মতো। এগুলি ছোট এবং মোটা, সমগ্র দেহ তিনটি খন্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খন্ডে এক-এক জোড়া এবং দেহের শেষে লেজের মতো একটি খন্ডে একজোড়া নিয়ে মোট চার জোড়া  সন্ধিহীন পা থাকে, প্রতি পায়ের শেষে নখর (সাধারনতঃ চার থেকে আটটি) অথবা সাকশন ডিস্ক বর্তমান। প্রথম তিনজোড়া পা নিচের দিকে থাকে এবং গমনের কাজে ব্যবহৃত হয়। শেষ একজোড়া পা পিছনের দিকে থাকে এবং কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার কাজে লাগে। এদের শরীর প্রোটিন ও কাইটিন নির্মিত কিউটিকল আবরণী বা খোলস দিয়ে ঢাকা থাকে। এরা উদ্ভিদ কোষ, শৈবাল ও ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের খায়। কেউ কেউ ব্যাকটেরিয়াভোজী, আবার কিছু কিছু প্রজাতি অন্যান্য টার্ডিগ্রেডদেরও খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। সদ্য সংগৃহীত টার্ডিগ্রেড গুলি কম শক্তির অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে দেখা যায়, যা ছাত্র ও অপেশাদার বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে সুবোধ্য। 

টার্ডিগ্রেডদের প্রায়ই লাইকেন ও মসের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে একটুকরো মস জলে ভিজিয়ে সেই জল অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখলে তাতে এদের দেখা যেতে পারে। অন্যান্য যে পরিবেশে এদের দেখা যায় সেগুলির মধ্যে আছে টিলা ও উপকূলের মাটি, জমা পাতা এবং সামুদ্রিক বা মিষ্টি জলের পলি। 

টার্ডিগ্রেডরা ‘ওভিপেরাস’ (oviparous) শ্রেণীর অর্থাৎ এরা ডিম পাড়ে এবং নিষেক হয় দেহের বাইরে। খোলস ছাড়ার সময় এদের মিলন ঘটে এবং স্ত্রী প্রাণীর খোলসের নিচে রাখা ডিম শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয়। কিছু প্রজাতির নিষেক দেহের ভিতরেও ঘটে। মোটামুটি ১৪ দিন পরে নিষিক্ত ডিমগুলি ফোটে। বাচ্চা টার্ডিগ্রেডরা পূর্ণবয়স্ক প্রাণীদের মতোই দেখতে হয়। বৃদ্ধির সময় তাদের কোষগুলি বিভাজিত হয় না, বরঞ্চ আয়তনে বাড়ে। একটি টার্ডিগ্রেড সারা জীবনে প্রায় ১২ বার খোলস ত্যাগ করে। টার্ডিগ্রেডদের জীবনকাল সাধারণতঃ ৩-৪ মাস থেকে শুরু করে ২ বছর পর্যন্ত হতে পারে। 

টার্ডিগ্রেডদের মধ্যে আকারের অনুপাতে জিনোম সংখ্যা পরিবর্তিত হয়। মোটামুটি তাদের মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০০ মেগাবেসপেয়ার ডিএনএ থাকে। H.dujardini – এর মধ্যে প্রায় ১০০মেগা বেসপেয়ার ডি এন এ আছে এবং এদের জেনারেশন টাইম প্রায় ২ সপ্তাহ।

এখন দেখা যাক, কোন কোন প্রতিকূল পরিবেশে টার্ডিগ্রেডরা বেঁচে থাকতে পারে —

• উষ্ণতা:- এরা ১৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কয়েক মিনিট, -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় প্রায় ৩০ বছর, -২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় কয়েক দিন এমনকী পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি অর্থাৎ -২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও কয়েক মিনিট বেঁচে থাকতে পারে।

• চাপ:- এরা একটি ভ্যাকুয়ামের মধ্যে পুরোপুরি চাপশূন্য অবস্থায় যেমন বেঁচে থাকতে পারে, তেমনই বায়ুমন্ডলীয় চাপের প্রায় ১২০০ গুনপর্যন্ত বেশি চাপও সহ্য করতে পারে। কিছু কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে এটি প্রায় ৬০০০ গুণ পর্যন্ত হয়। 

• জলশূন্যতা:- এরা জল ছাড়াও ১০ বছর অবধি বেঁচে থাকতে পারে। 

• তেজস্ক্রিয় বিকিরণ:- এরা অন্য কোনো প্রাণীর থেকে ১০০০ গুণ বেশি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সহ্য করতে পারে। যেখানে ৫ থেকে ১০টি গামা রশ্মির বিকিরণ মানুষের ক্ষেত্রে মারাত্মক হতে পারে, সেখানে টার্ডিগ্রেডরা ৫০০০টি রশ্মির বিকিরণও সহ্য করতে পারে। 

যখন টার্ডিগ্রেডরা কোনো প্রতিকূল পরিবেশে থাকে, তখন তারা তাদের বিপাকীয় হার স্বাভাবিকের থাকে অনেক কম করে দেয়। এই সময় তাদের বিপাকের হার স্বাভাবিকের প্রায় ০.০১%-এ পৌঁছে যায়। তখন তারা খাদ্য ও জল ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। এবং এইভাবে তারা কখনো কখনো ৩০ বছরেরও বেশি সময় কাটাতে পারে। তাদের বৃদ্ধি ও বংশবিস্তারও তখন বন্ধ হয়ে যায়। আবার যখন পরিবেশ তাদের অনুকূলে আসে, তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ক্রিপ্টোবায়োসিস (cryptobiosis)। 

তাদের এই শুষ্ক পরিবেশে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার ক্ষমতার জন্য বিজ্ঞানীরা দায়ী করেছিলেন একটি দ্বিশর্করা (disaccharide) ট্রিহ্যালোজ কে। শুষ্ক পরিবেশে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণীদের মধ্যে এই শর্করাটি পাওয়া যায় এবং টার্ডিগ্রেডদের মধ্যেই আছে ট্রিহ্যালোজ জিন। দেখা গেছে, টার্ডিগ্রেডদের নির্দিষ্ট মাত্রায় ট্রিহ্যালোজ সংশ্লেষণ করার ক্ষমতা আছে যা শুষ্কতা সহনশীলতায় কাজে লাগে।  

এই অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায়, এই প্রাণীরা কীভাবে চরম অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে তা নিয়ে অনেক গবেষণা করা হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে যে, কিছু প্রোটিন তাদের এই অবস্থার জন্য সাহায্য করে। সাধারণভাবে এই প্রোটিনগুলিকে বলা হয় intrinsically specific proteins বা IDPs, এবং এই ধরনের তিনটি নতুন প্রোটিন পাওয়া গেছে যারা বিশেষ ভাবে টার্ডিগ্রেডদের মধ্যেই পাওয়া যায়। এদের নাম দেওয়া হয়েছে টার্ডিগ্রেড স্পেসিফিক প্রোটিনস (tardigrade specific proteins) বা TDPs । ফসফোলিপিড বাইলেয়ারের সহযোগিতায় এই প্রোটিনগুলি কোষ পর্দার গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।  এছাড়াও, প্রবলভাবে জলযোজী (hydrophilic) হওয়ার জন্য এই প্রোটিনগুলি শুষ্ক অবস্থায় কোষীয় অঙ্গাণুগুলিকে ঠিক রাখার জন্য কাচের মতো একটি ছাঁচ গঠন করতে সাহায্য করে। এছাড়াও dsup (damage repressor) নামে একটি প্রোটিন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে এদের ডিএনএকে রক্ষা করে। এই ক্রিপ্টোবায়োসিস প্রক্রিয়ায় থাকার সময় টার্ডিগ্রেডদের ‘টন’ (tun) বলা হয়। 

তবে কি টার্ডিগ্রেড দের বিনাশ করা যায় না? হ্যাঁ, এটি আংশিক সত্য যে এরা অমর। অনেক বেশি বয়স হয়ে গেলে প্রতিটি প্রাণীর মতো এরাও মারা যায়। দেখা গেছে, প্রতিকূল পরিবেশে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় কাটালে টার্ডিগ্রেডরা মারাত্মক দুর্বলতার শিকার হয়। একটি অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল যে, এরা ৩০৩.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় এক ঘণ্টার জন্য সিদ্ধ হলেও বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু, খুব বেশি সময় পর্যন্ত এটি হয় না। আরো দেখা গেছে, ৪৮ ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে পরিবেশের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন কেবল ২৮% স্বাভাবিক অবস্থার টার্ডিগ্রেডরা মারা যায়। কিন্তু যদি হঠাৎ করে তাপমাত্রা এই উচ্চতায় পৌঁছে যায় এবং টার্ডিগ্রেডদের একটি কলোনিকে এর মধ্যে ৪৮ ঘণ্টা রাখা হয়, তবে প্রায় ১০০% স্বাভাবিক টার্ডিগ্রেডরা মারা পড়ে। 

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন