বিজ্ঞান

সাপের নিউরোটক্সিন বিষ প্রাণীদেহে কাজ করে কীভাবে

বিভিন্ন সাপের কামড়ের ফলে শারীরিক প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন হয়। এর কারণ হল বিভিন্ন সাপের বিষ বিভিন্ন ধরণের হয়। সাপের কামড়ে মানুষ মারা যায় কেন জানতে গিয়ে সাপের বিষের বিভিন্ন প্রকারভেদ সম্বন্ধে আমরা জেনেছি। এর মধ্যে সাপের হিমোটক্সিন বিষ প্রাণীদেহে কাজ করে কীভাবে আমরা জেনেছি। আমরা এখানে সাপের নিউরোটক্সিন বিষ প্রাণীদেহে কাজ করে কীভাবে সেই বিষয়ে জানব।

সাপের বিষ একটি অত্যন্ত জটিল জৈব যৌগের সমাহার। এতে প্রচুর সংখ্যক সক্রিয় প্রোটিন, উৎসেচক ইত্যাদি বর্তমান থাকে। এগুলির বেশিরভাগই বিষাক্ত, সাধারণত সাপ তাদের শিকার ধরতে এই বিষের ব্যবহার করে থাকে। গোখরো, কেউটে, শাঁখামুটি ইত্যাদি সাপের বিষে থাকে স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করার উপাদান – এগুলিকে বলে নিউরোটক্সিন (neurotoxin)।

বিষধর সাপ যখন কোন প্রাণীর শরীরে তাদের বিষদাঁত বসায় তখন সাপের মুখের বিষগ্রন্থি থেকে প্রাণীদেহে বিষ ঢুকে যায়। সাপের কামড়ের জায়গা থেকে সেই বিষ রক্তে মিশলে তা সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। সেই বিষে যদি নিউরোটক্সিন থাকে তাহলে সেটা প্রাণীদেহের অসংখ্য স্নায়ুকোষ বা নিউরোন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কোষের ওপর প্রভাব ফেলে। প্রাণীদেহে দুটি স্নায়ুকোষের মাঝে স্নায়ুসন্নিধি (synapse) থাকে, যেটি এক স্নায়ুকোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষের সংযোগ রক্ষা করে। দেখা গেছে যে কিছু কিছু সাপের নিউরোটক্সিন বিষ প্রাক-সন্নিধি স্নায়ুকোষে (pre-synaptic neuron) প্রভাব বিস্তার করে,  কিছু সাপের বিষ উত্তর-সন্নিধি স্নায়ুকোষের (postsynaptic neuron) ওপরে কাজ করে, আবার কিছু সাপের বিষ উভয়ের উপরেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

ক্রেট (krait) গোত্রের সাপের বিষে বাঙ্গারোটক্সিন (bungarotoxin) থাকে। এটি সাধারণত প্রাক-সন্নিধি স্নায়ুকোষের শেষপ্রান্তের নিউরোট্রান্সমিটার (neurotransmitter)-পূর্ণ গুটিগুলো (vesicle)-কে ধ্বংস করে দেয়। নিউরোট্রান্সমিটার একটা স্নায়ুকোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষে বার্তা নিয়ে যায়, তাই বাঙ্গারোটক্সিনের প্রভাবে নিউরোট্রান্সমিটারপূর্ণ গুটিগুলো নষ্ট হয়ে গেলে পরের স্নায়ুকোষে আর কোন খবর পৌঁছয় না। ট্যাপিটক্সিন (tapitoxin)-ও এভাবেই কাজ করে। কিছু কিছু বাঙ্গারোটক্সিন উত্তর-সন্নিধি স্নায়ুকোষে থাকা নিউরোট্রান্সমিটারের গ্রাহক (receptor)-কে ধ্বংস করে,  স্নায়ুকোষে ক্যালসিয়াম ও সোডিয়াম আয়ণের আদানপ্রদানে বাধা দেয়। সাপের বিষে থাকা কোষপর্দা-ভঙ্গকারী প্রোটিন (phospholipase-A2) স্নায়ুকোষের কোষপর্দাকে ফাটিয়ে দিয়ে স্নায়ুকোষকে মেরে ফেলে। কিছু সাপের বিষে পাওয়া ডেন্দ্রোটক্সিন (dendrotoxin) স্নায়ুকোষের পটাসিয়াম  আয়ণের সাম্যাবস্থা বিঘ্নিত করে। কোবরা গোত্রের সাপের বিষে থাকা কিছু নিউরোটক্সিন নিউরোট্রান্সমিটারকে ভেঙ্গে দেয়।
বিভিন্ন ধরনের সাপের বিষে থাকা এইসব নিউরোটক্সিনের প্রভাবে উত্তর-সন্নিধি স্নায়ুকোষ বুঝতে পারে না যে তাকে কী কাজ করতে হবে। মনে রাখা দরকার যে আমরা রোজ প্রত্যেক মুহূর্তে যে কাজ করি তার প্রায় প্রত্যেকটির পিছনেই স্নায়ুতন্ত্রের অবদান আছে। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, হেঁটে চলে বেড়ানো, দেখা, শোনা, ঘ্রান নেওয়া, স্বাদ অনুভব করা – সবই স্নায়ুতন্ত্রের কাজ। সাপের বিষের নিউরোটক্সিনগুলো এক স্নায়ুকোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষে খবর আদানপ্রদানে বাধা দিয়ে এইসব শারীরবৃত্তীয় কাজের অন্তরায় হয়। এরফলে নিউরোটক্সিনযুক্ত সাপের বিষ প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তার চোখ স্থির হয়ে যায় (ptosis), ধীরে ধীরে তার শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, চলাফেরা করতে পারে না (paralysis), এবং ফুসফুসের সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা শেষ হলে তার মৃত্যু হয়। বিষের নিউরোটক্সিন উপাদান সাপের শিকারকে পঙ্গু করে মেরে ফেলতে সাহায্য করে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. Ranawaka et al, 2013. Neurotoxicity in Snakebite—The Limits of Our Knowledge. PLOS Neglected Tropical Diseases, 7(10): e2302.
  2. Kang et al, 2011. Enzymatic toxins from snake venom: structural characterization and mechanism of catalysis. The FEBS Journal, 278: 4544-4576.
  3. http://jrscience.wcp.muohio.edu/
  4. http://www.toxinology.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।