শীত প্রায় শেষ, আর কিছুদিন পর শুরু হবে বসন্ত। শীতের শেষে ঘুরে আসুন বাঁকুড়া পুরুলিয়া। এই সময়টা বাঁকুড়া পুরুলিয়া ঘুরবার আদর্শ সময়। গরমে এখানের তাপমাত্রা প্রচণ্ড বেশি থাকে, তবে বসন্তকালে এখানে পলাশের ছোঁয়ায় সেই পাহাড়েরা লাল হয়ে ওঠে, আবার বর্ষাকালে সবুজের রূপ নেয়। বাঁকুড়া পুরুলিয়ায় অনেক ঘোরবার জায়গা রয়েছে। এখানে দুই জেলার পাঁচটি জনপ্রিয় পাহাড় নিয়ে আলোচনা করা হল। সেই পাহাড়গুলোতে কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন সেসব বিস্তারিত জানতে উল্লিখিত লিঙ্কে ক্লিক করুন।
ঘুরে আসুন বাঁকুড়া পুরুলিয়া – শুশুনিয়া পাহাড়
পর্বতারোহীদের অন্যতম সেরা পছন্দের তালিকার মধ্যে পড়ে শুশুনিয়া পাহাড়। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম শিলালিপিটি এই পাহাড়েই অবস্থিত। ঐতিহাসিকদের মতে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে চন্দ্রবর্মণ তাঁর শিলালিপি পাহাড়ের বুকে লিখে রাখেন।পুরাতত্ত্ব বিভাগ থেকে এই শিলালিপি সংরক্ষিতও করা হয়েছে। এই শিলালিপি বা বিভিন্ন প্রাচীন জীবাশ্ম থাকার ফলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছেও এই জায়গার গুরুত্ব অপরিসীম।

পাহাড়ের নিচে ঝর্ণার মুখে একটি প্রাচীন এক পাথরের নরসিংহ মূর্তি দেখা যায়। সেই ঝর্ণার উৎস নাকি আজও অজানা। জনশ্রুতি অনুসারে এই ঝর্ণায় স্নান করলে আপনার শরীর-মন দুই ভাল হয়ে যাবে, আবার এই ঝর্ণার জল পান করলে আপনার হজম এর সমস্ত সমস্যা দূর হয়ে যাবে। শুশুনিয়া পাহাড়ের তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথম পাহাড় ওঠার পর উপর থেকে চারিদিকে সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। তারপর দ্বিতীয় পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রাস্তা চলে গেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। আপনি ইচ্ছা করলে সারা দিনই এই পাহাড়ে ট্রেকিং করতে পারবেন তবে সঙ্গে গাইড রাখা সুবিধাজনক।
ট্রেনে যেতে হলে ছাতনা স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে বাস বা অটো করে শুশুনিয়া পাহাড় যাওয়া যায়। থাকবার জন্য সেখানে বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। অন্যান্য জেলা থেকে পর্যটকেরা কয়েকদিনের ট্যুরে এলেও বাঁকুড়া বা তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি পিকনিক স্পট হিসেবে বেশি জনপ্রিয়। শুশুনিয়া পাহাড়ের পাথর নিয়ে এলাকায় গড়ে উঠেছে বিখ্যাত প্রস্তরশিল্প। যে শিল্পের কদর শুধু বাংলা নয়, তার খ্যাতি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা দেশে। এখানে রয়েছে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রস্তরশিল্পীরাও। তাদের থেকে কেনাকাটা করতে পারেন। শুশুনিয়া পাহাড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি পড়ুন এখানে।
ঘুরে আসুন বাঁকুড়া পুরুলিয়া – বিহারীনাথ পাহাড়

বিহারীনাথ পাহাড় হল বাঁকুড়া জেলার সর্বোচ্চ পাহাড়। এই পাহাড়কে পশ্চিমবঙ্গের আরাকু ভ্যালিও বলা হয়। এখনও অবধি এই পাহাড় আদিম রূপে আছে। পাহাড়ে ওঠার পথ ঘন জঙ্গলে ঘেরা। সবুজে ঘেরা এই পাহাড়ে অনেকরকম বিরল প্রাণীর বাস। পাহাড়ের নিচে আছে বিখ্যাত বিহারীনাথ মন্দির। বিহারীনাথ ধাম নামেই এই মন্দির প্রসিদ্ধ। ভগবান শিব এখানে বিহারীনাথ হিসেবে পূজিত হন এবং তাঁর নামেই এই পাহাড়ের নামকরণ। জনশ্রুতি অনুসারে বিহারীনাথের শিবলিঙ্গটি এখানের রাজা স্বপ্নাদেশে পেয়েছিলেন।
ট্রেনে যেতে হলে আসানসোল থেকে মধুকুণ্ড রেল স্টেশনে যেতে হবে। এছাড়াও আসানসোল থেকে ট্রেনে করে রানীগঞ্জ গিয়েও ভাড়া করা গাড়ি করে বিহারীনাথ যাওয়া যায়। রাত্রিযাপনের জন্য কয়েকটি হোটেল রয়েছে। অন্যান্য জেলা থেকে পর্যটকেরা কয়েকদিনের ট্যুরে এলেও বাঁকুড়া বা তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি পিকনিক স্পট হিসেবে বেশি জনপ্রিয়। বিহারীনাথ পাহাড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি পড়ুন এখানে।
ঘুরে আসুন বাঁকুড়া পুরুলিয়া – অযোধ্যা পাহাড়
পুরুলিয়া জেলার অন্যতম বিখ্যাত ভ্রমণস্থান হল অযোধ্যা পাহাড়। এই পাহাড় পূর্বঘাট পর্বতমালার একটি সম্প্রসারিত অংশ। অযোধ্যা পাহাড়ের গড় উচ্চতা প্রায় ২০০০ ফুট আর পাহাড়ের মাথাটি বেশ সমতল। জনশ্রুতি অনুসারে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র এই পাহাড়ে এসেছিলেন। সীতার তৃষ্ণা পেলে শ্রীরামচন্দ্র তীর ছুঁড়ে পাহাড়ের বুক চিরে জলের স্রোত বের করেন। সেই জায়গাটি এখন সীতাকুন্ড নামে পরিচিত। মাটির ভেতর থেকে অবিরাম জলের ধারা এই কুণ্ডে এসে পরে। বলা হয় গ্রীষ্মকালের প্রচন্ড গরমে নলকূপ ও জলের অন্যান্য উৎসগুলিতে জল না পাওয়া গেলেও সীতাকুণ্ডে জল পাওয়া যায়।

অযোধ্যা পাহাড়ে ওঠার জন্য অনেকগুলি ট্রেকিং রুট বা গ্রাম্য রাস্তা থাকলেও প্রধান প্রবেশদ্বার দুইটি। সিরকাবাদ, যেটি পুরুলিয়া শহরের দিক থেকে যাওয়া যায়। দ্বিতীয় রাস্তা হল বরাভূম স্টেশনের দিক দিয়ে গিয়ে বাঘমুন্ডি। শাল, সেগুন পলাশের বনের মধ্যে দিয়ে রাস্তা একে বেঁকে উঠে গেছে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। অযোধ্যা পাহাড়ের জঙ্গলে এখনও চিতা বাঘ, হায়না, জংলী কুকুর, বুনো শুয়োরের মতো বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া যেতে পারে।
ট্রেনে যেতে হলে বরাভূম বা পুরুলিয়া স্টেশনে নামতে হবে। থাকবার জন্য এখানে অনেক হোটেল রয়েছে। গরমকাল বাদ দিয়ে যে কোনো সময় যেতে পারেন। যদি লাল পলাশ ফুল দেখতে চান তাহলে মার্চে যেতে হবে। সেই সময় অযোধ্যা পাহাড়ের রূপ অন্যরকম। অযোধ্যা পাহাড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি পড়ুন এখানে।
ঘুরে আসুন বাঁকুড়া পুরুলিয়া – গড়পঞ্চকোট
পুরুলিয়ায় পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গড়পঞ্চকোট পুরুলিয়ার অন্যতম সুন্দর একটি গন্তব্য। গড়পঞ্চকোট ছিল এখানকার পুরাতন রাজাদের দুর্গ। ‘গড়’ মানে দুর্গ, ‘পঞ্চ’ মানে পাঁচ এবং ‘কোট’ মানে গোষ্ঠী। জনশ্রুতি অনুসারে পুরুলিয়ার ঝালদা অঞ্চলের পাঁচ আদিবাসী গোষ্ঠীর সর্দারদের সাহায্যে পঞ্চকোটের প্রথম রাজা দামোদর শেখর তাঁর রাজত্ব গড়ে তোলেন। সেই থেকেই এই জায়গার নাম গড়পঞ্চকোট। এই রাজার উত্তরসূরীরাই ছোট বড় মিলে প্রায় চল্লিশটি মন্দির তৈরি করেছিলেন। মারাঠা বর্গীদের আক্রমণে মন্দিরগুলো ধ্বংস হয়। গড়পঞ্চকোট দূর্গের চিহ্ন যদিও খুঁজে পাওয়া কঠিন, তবে গড়পঞ্চকোটের গেট, জোড় বাংলো, ওয়াচ টাওয়ার, রানি মহল এইসব ঘুরে দেখলে এখনও এক উজ্জ্বল ইতিহাস চোখে পড়বে।

পঞ্চকোট পাহাড়ের তলদেশে গোটা এলাকা ঘন জঙ্গলে ঢাকা। শাল, পিয়াল, মহুল, হরিতকি থেকে নানারকম বনৌষধি গাছগাছড়ায় সমৃদ্ধ এই পাহাড়। জনশ্রুতি অনুসারে সুদূর দাক্ষিণাত্য থেকে এখানে আসতেন আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা। পাখি এবং প্রজাপতির পাশাপাশি গড়পঞ্চকোটের জঙ্গলে প্রচুর ময়াল ও পাইথনও রয়েছে। জঙ্গলের মধ্যে হায়না এবং অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর দেখা পাওয়া যায়।
ট্রেনে যেতে চাইলে গড়পঞ্চকোটের নিকটবর্তী স্টেশন হল পশ্চিম বর্ধমানের বরাকর। গড়পঞ্চকোটে থাকার মধ্যে আছে কিছু সরকারি বাংলো, লজ ও গুটি কয়েক প্রাইভেট লজ। গড়পঞ্চকোট ভ্রমণের খুঁটিনাটি পড়ুন এখানে।
ঘুরে আসুন বাঁকুড়া পুরুলিয়া – জয়চণ্ডী পাহাড়
১৯৭৮ সালে সত্যজিৎ রায় তাঁর হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রটির শুটিং করার পর থেকেই পুরুলিয়ার জয়চণ্ডী পাহাড় বাঙালিদের ভ্রমণের তালিকায় ঢুকে পড়ে। এখানে সেই দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল, যেখানে উদয়ন পন্ডিত একটি পাহাড়ের গুহায় লুকিয়েছিল। তারপর তার সাথে গুপী ও বাঘার সাক্ষাৎ হয়। পাহাড়ের সামনে গেলেই চোখের সামনে আজও ভেসে উঠবে গুপি বাঘার ভোজন দৃশ্য অথবা উদয়ন পন্ডিতের সঙ্গে গুপি বাঘার প্রথম দেখা হওয়ার সেই দৃশ্যটি। পাহাড়ের ওপর রয়েছে মা চণ্ডীর মন্দির। বলা হয় এই মন্দির থেকেই পাহাড়ের নামকরণ করা হয়েছে।

এই পাহাড় ছোট নাগপুর মালভূমির অংশ। পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ৮০০ ফুট। পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বড় বড় পাথর বা বোল্ডার। তারই মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে প্রধান তিনটি পাহাড়। জয়চন্ডী, দক্ষিণাকালী বা কালী পাহাড় এবং যুগঢাল। এর মধ্যে জয়চন্ডী পাহাড়েই ওঠার রাস্তা রয়েছে।
ট্রেনে যেতে হলে জয়চন্ডী পাহাড় স্টেশনে নামতে হবে। জয়চন্ডী পাহাড় যাওয়ার জন্য এই স্টেশনটি বর্তমানে তৈরি হয়েছে। আগে আদ্রা স্টেশন থেকে যেতে হত। জয়চন্ডী পাহাড়ে থাকবার খুব বেশি হোটেল নেই। বসন্তকালে গেলে পাহাড়ের গায়ের জঙ্গলে লাল পলাশের রঙ দেখতে পাওয়া যাবে। জয়চণ্ডী পাহাড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি পড়ুন এখানে।
এই পাঁচটি পাহাড় ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পাহাড় বা ভ্রমণস্থান নিয়ে জানতে এখানে পড়ুন।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব সংকলন


আপনার মতামত জানান