ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস যে সকল বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন মানুষের অবদানে সমৃদ্ধ, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ত্রিভুবন নারায়ণ সিং (Tribhuvan Narain Singh)। যাঁরা কেবলমাত্র সক্রিয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকেননি বরং বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রেও তাঁদের একইরকম দক্ষ বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে, ত্রিভুবন নারায়ণ তাঁদেরই একজন। তিনি একাধারে একজন সাংবাদিক, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং দক্ষ রাজনীতিবিদ ছিলেন। ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’-এর মতো বিভিন্ন নামজাদা সংবাদপত্রে কাজ করেছিলেন ত্রিভুবন। তবে এসবের বাইরেও তাঁর আরও একটি পরিচয় হল, তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের সক্রিয় সদস্য হওয়ার সুবাদে কারাবাসও করতে হয়েছিল তাঁকে। রাজ্য বিধানসভার সদস্য না হয়েও তিনিই প্রথম কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। লোকসভা এবং রাজ্যসভার সদস্যপদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের পদও অলঙ্কৃত করেছিলেন ত্রিভুবন নারায়ণ সিং। ১৯৭০-৭১ সালের মধ্যে তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং পরে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন তিনি। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি সবক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।
১৯০৪ সালের ৮ আগস্ট ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে ত্রিভুবন নারায়ণ সিং-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল প্রসিধ নারায়ণ সিং (Prasidh Narayan Singh)। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর বুদ্ধি ছিল ক্ষুরধার। তাঁর সহোদররা হলেন বিজয় নারায়ণ সিং, জগদীশ নারায়ণ সিং এবং অওদেশ নারায়ণ সিং। পরবর্তীকালে ত্রিভুবন নারায়ণ শ্রীমতী সুশীলা দেবীকে বিবাহ করেছিলেন। সুশীলা দেবী এবং ত্রিভুবন নারায়ণের দুই পুত্র এবং চার কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করার পর মাইদাগিনে অবস্থিত হরিশ্চন্দ্র পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ এবং পরবর্তীকালে কাশী বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চস্তরের শিক্ষালাভ করেন ত্রিভুবন নারায়ণ। ১৮৬০ সালে ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাইদাগিনের হরিশচন্দ্র পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজটি।
মূলত সাংবাদিকতার মাধ্যমেই ত্রিভুবন নারায়ণ নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তখন সমগ্র ভারত জুড়ে স্বাধীনতার লড়াই চলছিল পুরোদমে। ১৯২৬ সালে ত্রিভুবন নারায়ণ লক্ষ্ণৌ থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইংরেজি কাগজ ‘ইণ্ডিয়ান ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর সাংবাদিক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর তিনি কাশী বিদ্যাপীঠে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২৭ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত মাত্র এক বছর এই প্রতিষ্ঠানে তিনি অধ্যাপনা করেছিলেন। এরপর ১৯২৮ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত আরো এক বছর ত্রিভুবন নারায়ণ দিল্লির ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ নামক বিখ্যাত কাগজের সহ-সম্পাদক এবং ভারপ্রাপ্ত সহ-সম্পাদকের হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। এরপর তিনি কাজ করেন আরও এক নামজাদা সংবাদপত্রে যার নাম ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড অব লক্ষ্ণৌ’। এই সংবাদপত্রে তিনি সহকারী সম্পাদক, ব্যবস্থাপক এবং জেনারেল ম্যানেজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ‘জনতা প্রেস’-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন ত্রিভুবন নারায়ণ। এছাড়াও দিল্লির ‘টেক্সটাইল লেবার মিলস ইউনিয়ন’-এর সচিব পদেও বহাল ছিলেন তিনি।
ভারতবর্ষের দিকে দিকে যখন স্বদেশি আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, ত্রিভুবন নারায়ণ সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই বেড়ে উঠছিলেন। এমনকি তাঁর প্রথম যৌবন ব্রিটিশ অধ্যুষিত ভারতেই কেটেছিল। এমন স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে ত্রিভুবন নারায়ণের মধ্যেও দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবাদ এবং পরাধীনতার যন্ত্রণা জেগে উঠতে সময় লাগেনি। সেসময় ব্রিটিশ রাজের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলছিল তিলে তিলে, ত্রিভুবন নারায়ণ সেই সংগ্রামেরই অংশ হওয়ার জন্য কংগ্রেসে যোগদান করেন। বেনারসের তহসিল এবং জেলা কংগ্রেস কমিটির হয়ে কাজ করেছিলেন তিনি এবং সেখানে অনবদ্য দক্ষতা প্রদর্শন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ত্রিভুবন নারায়ণ লক্ষ্ণৌয়ের প্রাদেশিক এবং শহর কংগ্রেস কমিটির সদস্য পদও অলঙ্কৃত করেন। ১৯৩১-৩২ সালে গান্ধীজীর নেতৃত্বে সংঘটিত আইন অমান্য আন্দোলনে সক্রিয় যোগদানের ফলে ত্রিভুবন নারায়ণকে কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়। অবশ্য পরবর্তীকালে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদানকারী কংগ্রেসের সদস্য হওয়ার কারণে তাঁকে আরেক দফা কারাবন্দী করা হয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি সংবাদপত্রের কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলেন সমান তালে।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল অর্থাৎ সাধারণ নির্বাচনের আগের বছর পর্যন্ত ত্রিভুবন নারায়ণ অস্থায়ী সংসদের সদস্য ছিলেন। ১৯৫১ সালে সংসদে কংগ্রেসের সচিব পদে বহাল হন তিনি। ১৯৫২ সালের ১৭ এপ্রিল প্রথম লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। যদিও পরবর্তীকালে ১৯৫৭ সালে তিনি পুনরায় দ্বিতীয়বারের জন্য লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫২ এবং ১৯৫৭ সালে চান্দৌলি লোল সান্তা নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক নেতা রাম মনোহর লোহিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরাজিত হন। কেবলমাত্র লোকসভাই নয়, তিনি সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভারও সদস্য হয়েছিলেন দু’বার— প্রথম দফায় মেয়াদ ছিল ১৯৬৫ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ১৯৭০ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়বার ১৯৭০ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ১৯৭৬ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত। এছাড়াও পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত। এরপরে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ত্রিভুবন নারায়ণ শিল্প, সরবরাহ এবং লৌহ ও ইস্পাত শিল্প দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ত্রিভুবন নারায়ণ প্রেস কমিশনের সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন এবং তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া নির্মাণের জন্য ‘পরিকল্পনা কমিশন’-এর সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
ত্রিভুবন নারায়ণ সিং-এর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯৭০ সালে উত্তরপ্রদেশের ষষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো ব্যক্তি রাজ্য বিধানসভার সদস্য না হয়েও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদ লাভ করেন কোনো নির্বাচনে জয়লাভ ছাড়াই। ১৯৭০ সালে অক্টোবর মাসে কংগ্রেস সংগঠন, জনসংঘ, স্বতন্ত্র পার্টি এবং ভারতীয় ক্রান্তিদল মিলে তৈরি করেছিল ‘সংযুক্ত বিকাশ দল’ এবং তাঁদের নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল ত্রিভুবন নারায়ণ সিংকে। ১৯৭০ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মাত্র ছয় মাস ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের বিভাজন ঘটে। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চন্দ্রভানু গুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়। কমলাপতি ত্রিপাঠির সমর্থনে চৌধুরী চরণ সিং আবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন এবং কমলাপতি ত্রিপাঠী কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতির পদ পান। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কংগ্রেস চরণ সিংকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। সেসময় অর্থাৎ ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে কংগ্রেস সংগঠন, জনসংঘ, স্বতন্ত্র পার্টি এবং ভারতীয় ক্রান্তিদল মিলে গড়ে ওঠা ‘সংযুক্ত বিকাশ দল’-এর নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল ত্রিভুবন নারায়ণ সিংকে। সতেরো দিনের রাষ্ট্রপতি শাসনের পর ত্রিভুবন নারায়ণকেই তখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজ্য বিধানসভার সদস্য না হয়েও মুখ্যমন্ত্রী পদ পাওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং তাঁকে উপনির্বাচনে অংশ নিতে হয়। বিধানসভায় ত্রিভুবন নারায়ণের প্রবেশের পথ প্রশস্ত করার জন্য মোহান্ত অবৈদ্যনাথ গোরক্ষপুরের মণিরামের আসনটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। যদিও ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী প্রচার চালান রামকৃষ্ণ দ্বিবেদীর পক্ষে। এই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ত্রিভুবন নারায়ণ মুখ্যমন্ত্রীত্ব হারান। ত্রিভুবন নারায়ণের মুখ্যমন্ত্রীত্ব নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলাও শুরু হয়েছিল যা ‘হর শরণ বর্মা বনাম ত্রিভুবন নারায়ণ সিং’ মামলা নামেই পরিচিত।
পরবর্তীকালে ১৯৭৯ সালের ৬ নভেম্বর ত্রিভুবন নারায়ণ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের নবম রাজ্যপাল হিসেবে তিনি ১৯৮১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ভীষণ ঘনিষ্ঠ ছিলেন ত্রিভুবন নারায়ণ সিং। যখন রহস্যজনকভাবে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়, ত্রিভুবন নারায়ণ এই মৃত্যুর তদন্তের দাবি তুলেছিলেন। এমনকি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে ত্রিভুবন নারায়ণ ১৯৭৯ সালে লেখা এক চিঠিতে একটি গোপন তথ্য তুলে ধরেছিলেন যেখানে ত্রিভুবন নারায়ণ দাবি করেন যে, নেতাজি এক বিদেশি কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁদের এক কন্যাসন্তানও ছিল। এই চিঠিটি তাঁর নাতি অনুগ্রহ নারায়ণ সিং জনসমক্ষে এনেছিলেন।
১৯৮২ সালের ৩ আগস্ট ত্রিভুবন নারায়ণ সিং-এর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to আজকের দিনে ।। ৮ আগস্ট | সববাংলায়Cancel reply