সববাংলায়

ফিক্কালে গাঁও ভ্রমণ

ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাহাড় যাদের প্রথম পছন্দ তাঁদের জন্য অবশ্যই উপযুক্ত হতে পারে ফিক্কালে গাঁও (Fikkalay Gaon) নামের একটি পার্বত্য অঞ্চল। এখান থেকে পাহাড়ি উপত্যকার সৌন্দর্য যেমন উপভোগ করা যয়, তেমনি মেঘের চাদরে মোড়া এই জায়গা থেকে সুন্দরী কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার সুযোগও রয়েছে। খুব বেশি জনপ্রিয় ও পরিচিত না হওয়ার কারণে পর্যটকদের ভীড় কম এই নির্জন পাহাড়ী গ্রামটিতে৷ রোদ ঝলমলে তিস্তা নদীর নয়নাভিরাম দৃশ্যে মন ভরে যেতে বাধ্য। রোদ-বৃষ্টির মেলবন্ধনে এই অপরূপ ফিক্কালে গাঁও যেন সুন্দরের উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ। ভ্রমণপিপাসুদের তালিকায় হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের এই গ্রাম উপরের দিকেই স্থান পাবে নিঃসন্দেহে।

কালিম্পং থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার এবং ডেলো থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে সাংসের গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি গ্রাম হল ফিক্কালে গাঁও। নেওরা ভ্যালি ন্যাশানাল পার্কের সাংসের খসমহলের ভিতরে সাংসেরের অবস্থান। শিলিগুড়ি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে থাকা ফিক্কালে গাঁও সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৫০০ ফুট অর্থাৎ প্রায় ৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।

চতুর্দিক ডেলো পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত এই ছোট্ট সুন্দর গ্রামটিতে মেঘেরা আনাগোনা করে হাতের কাছে। গায়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে কখনও, ঘরের জানালা খোলা থাকলে ঢুকে পড়তেও তাদের বাধা নেই। রৌদ্রে ঝলমল করে খাপ খোলা তরোয়ালের মতো জ্বলে তিস্তার জল। অপরূপ সেই রুপোলি রেখার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েন পর্যকটের দল। প্রকৃতি এখানে যেন উদারহস্তে সুন্দরের সম্পদ দান করছে সৌন্দর্যপিপাসুদের। তিস্তার পাড় ধরে সবুজের বুক চিরে খানিকদূর উঠে গেলে দেওরালি দাড়া নামের একটি ভিউপয়েন্টে পৌঁছনো যাবে। সেখান থেকে পাহাড়ি এক উপত্যকার মধ্যে দিয়ে তিস্তার ঝলমলানি স্বর্গীয় সৌন্দর্যেরই সমান যেন। সেই ভিউপয়েন্টে বসলে জীবনের সব ক্লেদ, গ্লানি, মুছে যাবে এক মুহূর্তে। সেই বিরাটের সামনে বসে ছোটখাটো দৈনন্দিন ক্ষুদ্রতা এক লহমায় হয়ে যাবে তুচ্ছ। চোখের সামনে মেঘাবৃত সবুজ পাহাড়ের সারি সম্মোহিত করে ফেলবে পর্যটকদের। সেই ভিউ পয়েন্টেই আবার রয়েছে একটি মনাস্ট্রি। বৌদ্ধ সংগীতের ধুন সেই নির্জন, প্রশান্ত উপত্যকায় মুহুর্মুহু ছড়িয়ে পড়ছে, এ-জিনিস জীবনে একবার উপভোগ করলে তা আজীবন অভিজ্ঞতায় থেকে যাবে। এই স্মৃতি মোছবার নয়, বরং বারেবারে সেই সবুজ নির্জন পাহাড়ের কোলে ছুটে যেতে চাইবেন ভ্রমণপিপাসুর দল। পাহাড়ের ধাপে ধাপে এখানে জৈব পদ্ধতিতে ভুট্টা এবং অন্যান্য সবজীর চাষও হয়ে থাকে। কিন্তু এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যোদয়ের সময় সোনালি মুকুট পরিহিত কাঞ্চনজঙ্ঘার যে-রূপ এই ফিক্কালে গাঁও থেকে লক্ষ্য করা যায় তা অতুলনীয়, ভাষায় প্রকাশ করা তা অসম্ভব। সুন্দরী কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে, তিস্তার রুপোলি প্রবাহের ধারে কিছুদিন কাটিয়ে আসা যায় অবশ্যই। রাত্রিবেলা দার্জিলিং আর

হাওড়া স্টেশন থেকে শতাব্দী এক্সপ্রেস ছাড়াও সরাইঘাট এক্সপ্রেস, কামরূপ এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনগুলিতে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে, সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যাবে ফিক্কালে গাঁওতে। অবশ্য শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে শিলিগুড়িও নামা যায় এবং তারপর সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে ৮০ কিলোমিটার অতিক্রম করে পৌঁছনো যায় এই নির্জন পাহাড়ী গ্রামটিতে। শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়িতে মোটামুটি ৩ ঘন্টা সময় লাগবার কথা। এছাড়াও নিকটতম বিমানবন্দর হল বাগডোগরা। সেখান থেকেও গাড়িতে করে ফিক্কালে গাঁও পৌঁছনো যায়।

নির্জন হলেও বেশকিছু পর্যটকের আনাগোনা লেগেই থাকে ফিক্কালে গাঁওতে বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে। ফলে আগন্তুকদের থাকবারও উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এখানকার হোটেল বা হোম স্টে-গুলির মধ্যে জনপ্রিয় একটি হল মিস্টি মিডোজ হোমস্টে। কারেন্টার নামে একটি ভিউ পয়েন্ট এই হোম স্টে থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। এছাড়াও এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য খুবই স্পষ্ট চোখে পড়ে। বাঙালি খাবার পছন্দ হলে এখানে সে-ব্যবস্থাও রয়েছে। এমনকি বনফায়ারের ইচ্ছে থাকলেও সেই সুবিধাও এই হোম স্টে-তে পাওয়া যাবে। এরপর আরেকটি চমৎকার থাকবার জায়গা হিসেবে কেপচাকে ফার্মস্টে-র নাম করা যায়। কালিম্পং থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। এখানে ফ্যামিলি রুমের বন্দোবস্তও আছে। আবার রুমের মধ্যে ফায়ারপ্লেস পর্যন্ত রয়েছে। পাথুরে পথ পেরিয়ে বন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ভিউ পয়েন্টে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এই হোম স্টে-তে থাকলে পাওয়া যেতে পারে। আরেকটি হোমস্টের কথা এখানে উল্লেখ্য। সেটি হল গ্রীণ হিলস স্যাংসে হোমস্টে। যেহেতু ছোট গ্রাম এবং পর্যটকদের ভীড়ও কম তাই খুব বেশি পরিমাণে হোম স্টে এখানে পাওয়া যায় না।

ফিক্কালে গাঁও থেকে আশেপাশে আরও অনেক দর্শনীয় স্থানে যেতে পারবেন পর্যটকেরা। যেহেতু কালিম্পং এখান থেকে মাত্র আধঘন্টা দূরে সেখানে তো যেতে পারবেনই, এছাড়াও গাড়িতে করে ঘুরে আসা যায় রিশপ, কোলাখাম, লাভা, পেডং, রামধুরা, ছাঙ্গে জলপ্রপাত, ইচ্ছেগাঁও-এর মতো অত্যন্ত সুন্দর সব পাহাড়ী অঞ্চলে। এছাড়াও ডেলো পার্ক এখান থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার, সেখানেও ঘুরে আসতে পারেন পর্যটকের দল।

মূলত সারাবছরই ফিক্কালে গাঁওতে পর্যটকেরা আসেন বেড়াতে। আসলে পাহাড়ের সৌন্দর্য তো একেক ঋতুতে একেকরকম। প্রকৃতি কখনই নিরাশ করে না পর্যটককে। কিন্তু সাধারণত বর্ষাকালে ফিক্কালে গাঁওতে না-যাওয়ারই পরামর্শ দেওয়া হয়। যখন-তখন পাহাড়ী রাস্তায় বিপজ্জনকভাবে ধস নামার সম্ভাবনাই এর একমাত্র কারণ। মার্চ থেকে জুন মাস এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসকেই এই গ্রাম ভ্রমণের উৎকৃষ্ট সময় বলা হয়ে থাকে। রোদ ঝলমলে প্রকৃতি এবং শীতের শুরুতে কুয়াশাবৃত পাহাড় অন্য এক জগতে নিয়ে যায় ভ্রামণিকদের।


ট্রিপ টিপস

  • কীভাবে যাবেন:– নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়িতে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যাবে। বিমানে গেলে বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গাড়ি বুক করে নিতে হবে ফিক্কালে গাঁও যাওয়ার জন্য।
  • কোথায় থাকবেন:– যেহেতু পর্যটকদের ভীড় তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়, সেকারণে হোটেল বা হোম স্টে বেশি নেই৷ তবে দুটি উৎকৃষ্ট এবং আরামদায়ক থাকবার জায়গা হল মিস্টি মিডোজ হোম স্টে এবং কেপচাকে ফার্মস্টে। এই দুই জায়গা থেকে চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন উপভোগ করা যায় তেমনি পরিবার নিয়ে আরামে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে।
  • কী দেখবেন:- ফিক্কালে গাঁওতে দ্রষ্টব্য হল কাঞ্চনজঙ্ঘার অসামান্য দৃশ্য, পাহাড়ী উপত্যকার মধ্যে দিয়ে প্রবহমান তিস্তা নদী, দেওরালি দাড়া ভিউপয়েন্ট এবং তৎসংলগ্ন মনাস্ট্রি, কারেন্টার ভিউপয়েন্ট ইত্যাদি।
  • কখন যাবেন:– সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাস এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কেই ফিক্কালে গাঁও যাওয়ার উৎকৃষ্ট সময় বলে মনে করা হয়।
  • সতর্কতা:
    • পর্যটকদের সাধারণত বর্ষাকালে না-যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া। এর অন্যতম কারণ হল পাহাড়ী রাস্তায় বিপজ্জনকভাবে ধস নামার সম্ভাবনা।
  • বিশেষ পরামর্শ:-
    • গাছপালা ঘেরা পাহাড়ী চড়াইয়ের পথ অতিক্রম করে ভিউপয়েন্টের দিকে যেতে পারলে পাওয়া যাবে অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদও। এটিকে একটি ছোটখাটো ট্রেকিংও বলা যেতে পারে।

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading