ভারতবর্ষের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্রাচীন ভারতবর্ষের অন্যতম সম্পদশালী শহর ছিল মুর্শিদাবাদ। আর এই শহরের তথা ভারতের অন্যতম সম্পদশালী পরিবার ছিল জগৎ শেঠের পরিবার। বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে বাংলার রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন এবং জগৎ শেঠের পূর্বপুরুষের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা ছিল। কিন্তু সেই জগৎ শেঠের বাড়িতেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদৌল্লার নিয়তি লেখা হয়েছিল। জগৎশেঠদের এতটাই প্রভাব ছিল যে তখনকার সময়ে নবাব বা রাজাকেও তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, জগৎশেঠের ধনভাণ্ডার দিয়ে বাঁধ গড়লে নাকি গঙ্গার গতিরোধ করা সম্ভব ছিল। তাই মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ করতে একবার অন্তত জগৎ শেঠের বাড়ি আপনার ঘুরে দেখা উচিত।
আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ
জগৎ শেঠের বাড়ি কোথায়
মুর্শিদাবাদ জেলায় ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে মুর্শিদাবাদ স্টেশন থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে জগৎ শেঠের বাড়ি অবস্থিত। এটি হাজারদুয়ারী থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে, কাটরা মসজিদ থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এবং মোতিঝিল থেকে সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
জগৎ শেঠের বাড়ির ইতিহাস
নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মীরজাফরের পরেই আসে জগৎশেঠের নাম। তবে জগৎ শেঠ কোনও একজন ব্যক্তি নয়। জগৎ শেঠ হল একটি পারিবারিক উপাধি। হীরানন্দ সাহু নামে এক স্বর্ণকার রাজস্থান থেকে পাটনায় আসেন। সেখানে তিনি বেশ ভালরকম অর্থ উপার্জন করেন। তখন তাঁর ছেলেদের ব্যবসা করতে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান। তাঁদের মধ্যে মানিক চাঁদ আসেন মুর্শিদাবাদে এবং শীঘ্রই মুর্শিদকুলি খাঁর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। মানিক চাঁদের দত্তক নেওয়া ছেলে ফতেহ চাঁদের আমলে সম্পত্তি এত বেড়ে যায় যে মুঘল সম্রাট তাঁক ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি দেন। সেই থেকে জগৎ শেঠ তাঁদের পারিবারিক উপাধি।

জগৎ শেঠের নিজস্ব টাঁকশাল ছিল। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যা কাজকর্ম, সেটাই তখনকার সময়ে জগৎ শেঠরা করতেন। তবে সিরাজুদৌল্লা বাংলার সিংহাসনে বসলে জগৎ শেঠদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। জগৎশেঠ ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিরাজুদৌল্লাকে সিংহাসন থেকে সরানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরাই জগৎ শেঠের টাঁকশাল লুট করে তাঁদের সর্বস্বান্ত করে। এমন একটা সময় আসে, যখন জগৎ শেঠের পরিবার ইংরেজদের দেওয়া সরকারি ভাতায় দিন যাপন করতে থাকে।
জগৎ শেঠের বাড়ি কীভাবে যাবেন
মুর্শিদাবাদ স্টেশনের বাইরে টোটো পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ টোটো রিজার্ভ করে যেতে পারেন, আবার মাথাপিছু ভাড়াতে সহযাত্রীদের সাথেও যেতে পারেন। তবে সম্পূর্ণ টোটো রিজার্ভ না করলে ফেরার পথে কোনও গাড়ি পাবেন না। সাধারণত স্থানীয় মানুষেরা নিজের গাড়ি বা বাইকে করে ঘুরতে যায় এখানে।

মুর্শিদাবাদ শহরের বাইরে থেকে গেলে ট্রেন, বাস বা গাড়ি বিভিন্ন উপায়ে যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে হলে মুর্শিদাবাদ স্টেশনে নামতে হবে। হাওড়া বা বর্ধমান স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার কোনও ট্রেন নেই। সরাসরি ট্রেন না থাকলেও আজিমগঞ্জ স্টেশন অবধি ট্রেনে গিয়ে তারপর আজিমগঞ্জ থেকে গাড়ি ভাড়া করে মুর্শিদাবাদ যাওয়া যাবে। তাছাড়া কলকাতা স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার ট্রেন রয়েছে। বাসে করে যেতে হলে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাস পাওয়া যায়। বাস সাধারণত বহরমপুর অবধি যায়। তারপর বহরমপুর থেকে ১১ কিলোমিটার পথ ভাড়াগাড়ি বা অটোরিকশায় যাওয়া যেতে পারে। গাড়িতে যেতে হলে গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড বা জিটি রোড ধরে যাওয়া যায়। বর্ধমান থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় চারঘন্টা এবং কলকাতা থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা।
আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের সমস্ত দর্শনীয় স্থান
জগৎ শেঠের বাড়িতে কোথায় থাকবেন
স্থানীয়দের কাছে একদিনের মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের জন্য জগৎ শেঠের বাড়ি জনপ্রিয় একটি ভ্রমণস্থান। তবে মুর্শিদাবাদের বাইরে থেকে ঘুরতে গেলে মুর্শিদাবাদ শহরে, বিশেষ করে হাজারদুয়ারির কাছে থাকবার জন্য অনেক হোটেল রয়েছে। মোতিঝিলের আশেপাশেও অনেক হোটেল রয়েছে। এইসব হোটেলে থেকে একদিনের সাইটসিইং হিসাবে জগৎ শেঠের বাড়ি ঘুরতে যেতে পারেন।
জগৎ শেঠের বাড়িতে কী দেখবেন
জগৎ শেঠের বাড়ি তো শুধু একটি বাড়ি নয়, বরং একসময়ের বাংলার অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। এই বাড়ির প্রতিটি কোণে রয়েছে ইতিহাসের গন্ধ। যে ইতিহাস একদিকে আভিজাত্যের কাহিনী বলে, আবার অন্যদিকে বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনীও তুলে ধরে। বর্তমানে সম্পূর্ণ বাড়িটাই মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়েছে। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৩০ টাকা। যদি গাইড নিতে চান, তাহলে গাইডের মূল্য ৭০ টাকা নির্দিষ্ট করা রয়েছে।

টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলে প্রথমে বিশাল আঙিনা। আঙিনা পেরিয়ে বাড়ির গায়ে সুন্দর কারুকাজ লক্ষণীয়। মার্বেল-পাথরে তৈরি কারুকাজ করা দরজা-জানালা, মেঝে এবং চমৎকার ঝাড়বাতি তৎকালীন সময়ে জগৎ শেঠের আভিজাত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। মিউজিয়ামে রয়েছে নবাবী আমলের বিভিন্ন আসবাবপত্র, যেমন পালঙ্ক, বিশাল আয়না, কাঠের খোদাই করা সোফা, রূপা ও পিতলের বাসন ইত্যাদি। রয়েছে জগৎ শেঠ পরিবারের ব্যবহৃত সোনা ও রূপার জরির কাজ করা দামি পোশাক, মসলিন ও রেশমের কাপড়। বিশেষত, মহিলাদের ব্যবহৃত গহনার সংগ্রহ ঐ সময়ের আভিজাত্যের প্রতিচিত্র তুলে ধরে।
জগৎ শেঠ ব্যবসায়ী হলেও তাঁদের নিজেদের সৈন্য ছিল। বাড়িতে প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্রাগার ছিল। মিউজিয়ামে তৎকালীন সময়ের তলোয়ার, বন্দুক, বর্শা, ঢাল ইত্যাদি জগৎ শেঠের সৈন্যদের বিভিন্ন অস্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। তৎকালীন সময়ের ব্যবহৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার সংগ্রহ রয়েছে। মিউজিয়ামে জগৎ শেঠের সাথে ব্রিটিশদের গোপন চুক্তি এবং সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও চিত্র সংরক্ষিত আছে।
জগত শেঠের বাড়িতে কখন যাবেন
সারাবছরই জগৎ শেঠের বাড়িতে যাওয়া যায়। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ সবচেয়ে উপযুক্ত এবং আরামদায়ক। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকায় ভ্রমণের পক্ষে কষ্টকর। এটি বছরের সবদিন সকাল ছটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- জগত শেঠের বাড়ির চত্বরে বা ক্যাম্পাসে ছবি তোলা যায়। বাড়ির ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ।
- বছরের সবদিন সকাল ছটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে।
- প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৩০ টাকা।
- যদি গাইড নিতে চান, তাহলে গাইডের জন্য ৭০ টাকা পড়বে।
- মিউজিয়ামের জিনিসে হাত দেবেন না।
- মন্দিরের ভেতর জুতো খুলে প্রবেশ করবেন।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: কাঠগোলা বাগান ভ্রমণ
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- “মুর্শিদাবাদ ভ্রমণগাইড”, লেখিকা – কাকলি মজুমদার
- “নবাবী অন্দরমহল”, লেখিকা – কল্পনা ভৌমিক
- https://www.bongodorshon.com/
- https://www.anandabazar.com/
- https://banglanews24.com/


আপনার মতামত জানান