হায়দ্রাবাদ শহরের ইতিহাস মূলত নিজাম শাসনকালকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার, দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক কেন্দ্র এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ—সব মিলিয়ে এই শহরে নির্মিত হয়েছিল একাধিক রাজপ্রাসাদ। এই প্রাসাদগুলো কখনও ছিল শাসকের বাসভবন, কখনও দরবার, কখনও অতিথিশালা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রাসাদ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে, আবার কিছু প্রাসাদ চলে গেছে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারে। আমরা এখানে সেই সমস্ত হায়দ্রাবাদের প্রাসাদের ব্যাপারে জানাব, প্রাসাদের ইতিহাস, স্থাপত্য শৈলী এবং কোন প্রাসাদ সাধারণের জন্য উন্মুক্ত আর কীভাবে যাবেন।
চৌমহল্লা প্রাসাদ
চৌমহল্লা প্রাসাদ ছিল নিজামদের প্রধান দরবার ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে এই প্রাসাদের নির্মাণ শুরু হয় এবং পরবর্তী কয়েক দশকে এটি সম্পূর্ণ রূপ পায়। এখানেই রাজকীয় সভা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। প্রাসাদটির স্থাপত্যে মুঘল, পারসিক ও ইউরোপীয় শৈলীর সংমিশ্রণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বিশাল দরবার হল, ঝাড়বাতি, খোলা উঠোন এবং অলঙ্কৃত ভবনসমূহ এই প্রাসাদকে হায়দ্রাবাদের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনায় পরিণত করেছে।
বর্তমানে চৌমহল্লা প্রাসাদ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। এটি হায়দ্রাবাদের পুরনো শহর এলাকায়, চারমিনারের খুব কাছেই অবস্থিত। নির্দিষ্ট টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করা যায়। শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই এখানে পৌঁছানো সম্ভব, বিশেষ করে চারমিনার এলাকায় এলে পায়ে হেঁটেই প্রাসাদে যাওয়া যায়।
পুরানি হাভেলি
পুরানি হাভেলি ছিল নিজামদের প্রাথমিক বাসভবনগুলোর একটি। বিশেষ করে নিজাম দ্বিতীয় ও নিজাম ষষ্ঠের সময়ে এই প্রাসাদটির ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজপরিবারের দৈনন্দিন জীবন, পোশাক, অস্ত্র ও মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য এই হাভেলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। প্রাসাদটির অভ্যন্তরীণ বিন্যাস নিজামদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। প্রাসাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো বিশ্বের দীর্ঘতম পোশাক রাখার আলমারি, যা নিজামদের রাজকীয় জীবনযাত্রার এক অনন্য নিদর্শন। এই আলমারিতে রাখা পোশাক নিজাম একবার ব্যবহার করার পর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করতেন না।
বর্তমানে পুরানি হাভেলিতে নিজাম জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে এবং এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খোলা। এটি চারমিনারের অদূরে অবস্থিত। এখানে প্রবেশের জন্য টিকিট কাটতে হবে।
কিং কোঠি প্রাসাদ
কিং কোঠি প্রাসাদ ছিল শেষ নিজাম মীর ওসমান আলি খানের ব্যক্তিগত বাসভবন। একসময় এটি হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে বড় প্রাসাদগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এই প্রাসাদ থেকেই নিজাম তাঁর শাসনকালের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। স্থাপত্যের দিক থেকে এটি রাজকীয় হলেও এর নকশায় ব্যক্তিগত আবাসের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট।
বর্তমানে কিং কোঠি প্রাসাদের পুরো অংশ সাধারণ মানুষের জন্য খোলা নয়। তবে প্রাসাদের একটি অংশে জাদুঘর রয়েছে, যেখানে সীমিত পরিসরে প্রবেশ করা যায়। এটি হায়দ্রাবাদ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত তুলনামূলকভাবে সহজ।
ফালাকনুমা প্রাসাদ
ফালাকনুমা প্রাসাদ হায়দ্রাবাদের একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ, যা একসময় নিজামদের বিলাসবহুল বাসভবন ও অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। উর্দু ভাষায় ফালাকনুমা শব্দের অর্থ আকাশের মতো বা আকাশের দর্পণ। চারমিনার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে, পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই প্রাসাদটি প্রায় বত্রিশ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। নির্মাণকালে এটি ছিল তৎকালীন হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে উঁচু ভবন। বর্তমানে এটি বিলাসবহুল হেরিটেজ হোটেল হওয়ার কারণে সাধারণ পর্যটকদের জন্য সবসময় খোলা থাকে না। তবে একদিনের ট্যুর হিসেবে ফালাকনুমা প্রাসাদ দেখা সম্ভব, যদি হোটেলের রেস্টুরেন্টে আগে থেকে বুকিং করা হয় বা নির্দিষ্ট গাইডেড প্যালেস ট্যুর নেওয়া হয়। গাইডেড প্যালেস ট্যুরে দুপুর বা সন্ধ্যায় খাবারের সঙ্গে প্রাসাদ দেখানো হয়। বিলাসবহুল এই হোটেলে অতিথি হিসেবে ঘর বুক করা যায়, তবে দামের জন্য বেশিরভাগ মানুষ এখানে থাকার বদলে শুধু খাওয়া বা গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমেই প্রাসাদটি দেখেন।
এই প্রাসাদের নির্মাণ শুরু হয় ১৮৮৪ সালে। নির্মাতা ছিলেন হায়দ্রাবাদ রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নবাব স্যার ভিকার-উল-উমরা। ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ইউরোপীয় ধাঁচে একটি প্রাসাদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। প্রায় নয় বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর ১৮৯৩ সালে প্রাসাদটি সম্পূর্ণ হয়। পরে এটি ষষ্ঠ নিজাম মীর মাহবুব আলি খানের মালিকানায় আসে এবং নিজামরা এই প্রাসাদকে মূলত রাজকীয় অতিথিদের থাকার জন্য ব্যবহার করতেন। একসময় এই প্রাসাদে অতিথি হিসেবে এসেছেন ব্রিটেনের রাজা ও রানি, এডওয়ার্ড অষ্টম এবং রাশিয়ার জার নিকোলাস দ্বিতীয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা। এখানের শেষ গুরুত্বপূর্ণ অতিথি ছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ। ১৯৫০-এর দশকের পর ধীরে ধীরে প্রাসাদটির ব্যবহার কমে যায় এবং এটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় কয়েক দশক ছিল। ২০০০ সালে তাজ গ্রুপ ঐতিহাসিক এই প্রাসাদটি লিজ নিয়ে সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজ শুরু করে। প্রায় এক দশক ধরে প্রাসাদের প্রতিটি অংশ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংস্কার করা হয়, যাতে এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যমূল্য অক্ষুণ্ণ থাকে। অবশেষে ২০১০ সালে এটি একটি বিলাসবহুল হেরিটেজ হোটেল হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে।
স্থাপত্যের দিক থেকে ফালাকনুমা প্রাসাদ অত্যন্ত অনন্য। সম্পূর্ণ ইতালিয়ান মার্বেল দিয়ে তৈরি এই প্রাসাদটি উপর থেকে দেখলে বিছের মতো আকৃতির দেখতে লাগে। এর নকশা করেছিলেন ইংরেজ স্থপতি উইলিয়াম ওয়ার্ড মারেট। প্রাসাদের ভেতরে ইতালিয়ান, টিউডর ও ইউরোপীয় বারোক শৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়। এখানে রয়েছে সুশোভিত স্টেট রিসেপশন রুম, ফ্রেস্কো ও সোনালি অলংকরণে সাজানো ছাদ, বিশাল বলরুম এবং একটি বিরল হাতে চালানো অর্গান, যা পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। প্রাসাদের লাইব্রেরিটি উইন্ডসর ক্যাসেলের আদলে তৈরি এবং সেখানে হাজার হাজার বিরল বই ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া নিজামদের সংগ্রহ করা মূল্যবান আসবাব, শিল্পকর্ম, জেড পাথরের সংগ্রহ ও ঝাড়বাতিগুলো প্রাসাদের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আসমান গড় প্রাসাদ
আসমান গড় প্রাসাদ একটি দুর্গসদৃশ স্থাপনা, যা পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত। নিজাম শাসনকালে এটি নিরিবিলি আবাস ও বিশ্রামের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর স্থাপত্য ইউরোপীয় দুর্গের মতো হওয়ায় এটি অন্যান্য প্রাসাদ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
বর্তমানে আসমান গড় প্রাসাদ একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে। সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ভেতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটি হায়দ্রাবাদের পূর্ব অংশে অবস্থিত এবং বাইরে থেকে দেখার সুযোগ থাকলেও পর্যটনস্থল হিসেবে এটি খোলা নয়।
বেলা ভিস্তা প্রাসাদ
বেলা ভিস্তা প্রাসাদ একসময় রাজকীয় আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীকালে এর ব্যবহার পরিবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে এটি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে বেলা ভিস্তা প্রাসাদ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ। এটি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের আওতায় থাকায় ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না।
হিল ফোর্ট প্রাসাদ
হিল ফোর্ট প্রাসাদ একসময় রাজকীয় আবাস ও প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। উঁচু স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীকালে এর ব্যবহার পরিবর্তিত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হয়। বর্তমানে হিল ফোর্ট প্রাসাদ সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখানে পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
হায়দ্রাবাদের প্রাসাদগুলো শহরের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের সাক্ষী। চৌমহল্লা প্রাসাদ ও পুরানি হাভেলির মতো কিছু প্রাসাদ আজও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। ফালাকনুমা প্রাসাদ আলাদাভাবে বুক করলে দেখা যায়। অন্যদিকে আসমান গড়, বেলা ভিস্তা ও হিল ফোর্ট প্রাসাদগুলো বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত ব্যবহারে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। হায়দ্রাবাদের প্রাসাদ ভ্রমণের আগে এই তথ্যগুলো জানা থাকলে প্রাসাদ ভ্রমণ আরও পরিকল্পিত ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান