সববাংলায়

নিজাম জাদুঘর ভ্রমণ | হায়দ্রাবাদের পুরানি হাভেলি ভ্রমণ

বিভাগঃ ,

হায়দ্রাবাদের পুরনো শহর অর্থাৎ ওল্ড সিটিতে অবস্থিত নিজাম জাদুঘর ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। রাজদরবারের জাঁকজমক নয়, বরং নিজামদের ব্যক্তিগত জীবনযাপন, অভ্যাস ও রুচির ছবি তুলে ধরে এই জাদুঘর। আজ যে স্থানটিকে নিজাম জাদুঘর বলা হয়, তা একসময় ছিল নিজামদের পুরনো বাসভবন, তাই এটি স্থানীয়দের কাছে পুরানি হাভেলি নামে অধিক পরিচিত।

নিজাম জাদুঘর কোথায়

ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ শহরের পুরনো অংশে বা ওল্ড সিটিতে পুরানি হাভেলি অবস্থিত। এটি হায়দ্রাবাদের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান চারমিনারের কাছাকাছি অবস্থিত। হায়দ্রাবাদের প্রধান রেলস্টেশন সেকেন্দ্রাবাদ জংশন থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৭ কিলোমিটার এবং রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রাসাদের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার।

নিজাম জাদুঘরের ইতিহাস

নিজাম জাদুঘরের ইতিহাস আসলে হায়দ্রাবাদের নিজামি শাসনের ব্যক্তিগত অধ্যায়। এই ভবনটি একসময় পরিচিত ছিল পুরানি হাভেলি নামে এবং এটি ছিল আসাফ জাহী বংশের নিজামদের পারিবারিক বাসস্থান। আঠারো ও উনিশ শতকে এই হাভেলিতে নিজাম পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। রাজকীয় দরবার বসত চৌমহল্লা প্রাসাদে, আর ব্যক্তিগত জীবন কাটত এই হাভেলিতেই। বিশেষ করে সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলি খানের সময়ে এই ভবনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী, পোশাক ও আসবাবপত্র এখানেই সংরক্ষণ করতেন। ১৯৪৮ সালে হায়দ্রাবাদ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর নিজামি শাসনের অবসান ঘটে এবং এই ভবনের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যায়। দীর্ঘ সময় এটি সাধারণ মানুষের কাছে অজানা ছিল।

পরবর্তীকালে নিজাম পরিবারের উদ্যোগে ভবনের একটি অংশ সংরক্ষণ করে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সেই থেকেই এটি পরিচিতি পায় নিজাম মিউজিয়াম নামে। বর্তমানে দর্শনার্থীরা এখানে নিজামদের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পান।

নিজাম জাদুঘর কীভাবে যাবেন

হায়দ্রাবাদ শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকেই একদিনের জন্য নিজাম জাদুঘর ঘুরতে যান। বাইরে থেকে ঘুরতে গেলে হায়দ্রাবাদ শহরের কোনও হোটেলে থেকে এখানে একদিনের জন্য ঘুরতে যাওয়া যায়। তবে এটি হায়দ্রাবাদ পুরনো অংশে অবস্থিত হওয়ায় হওয়ায় যানজটের কথা মাথায় রাখা ভালো।

হায়দ্রাবাদ মেট্রো ব্যবহার করলে সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন হল এমজিবিএস। মেট্রোর গ্রিন লাইনে নেমে সেখান থেকে অটো বা ক্যাব নিতে হয়। এছাড়া হায়দ্রাবাদ শহরের সব জায়গা থেকেই অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব খুব সহজে পাওয়া যায় এবং সরাসরি প্রাসাদের বাইরে নামায়। নিজের গাড়িতে গেলে চারমিনার–আফজালগঞ্জ রুট ধরে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।

নিজাম জাদুঘরে কোথায় থাকবেন

নিজাম জাদুঘরের আশেপাশে খুব বেশি ভালো মানের হোটেল নেই। ভালো মানের হোটেলে থাকতে চাইলে আবিডস, নামপল্লি ও লাকড়িকাপুল এলাকায় থাকতে পারেন। বিলাসবহুল হোটেলে থাকতে হলে বাঞ্জারা হিলস বা জুবিলি হিলস এলাকায় থাকতে পারেন। যদিও এখান থেকে নিজাম জাদুঘর পৌঁছতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

নিজাম জাদুঘরে কী দেখবেন

নিজামদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ

নিজাম জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ হলো সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলি খানের ব্যবহৃত পোশাক, জুতো, টুপি, ঘড়ি ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী। এগুলো নিজামদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে।

বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ কাঠের আলমারি

এই মিউজিয়ামের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন হলো প্রায় ১৭৬ ফুট লম্বা কাঠের আলমারি। নিজাম পরিবারের পোশাক সংরক্ষণের জন্য তৈরি এই আলমারি দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।

আসবাবপত্র ও স্মারক

এখানে সংরক্ষিত রয়েছে নিজামদের ব্যবহৃত খাট, চেয়ার, টেবিল, আলমারি ও অন্যান্য আসবাবপত্র। প্রতিটি জিনিস নিজামি জীবনের বিলাসিতা ও রুচির পরিচয় বহন করে।

কাঠের স্থাপত্য ও অভ্যন্তরীণ নকশা

মিউজিয়ামের দরজা, জানালা ও করিডর জুড়ে সূক্ষ্ম কাঠের কাজ চোখে পড়ে। ইউরোপীয় ও দেশীয় শৈলীর মিশ্রণ এই ভবনের ভেতরের পরিবেশকে আলাদা মাত্রা দেয়।

নিজাম জাদুঘরে কখন যাবেন

নিজাম মিউজিয়াম সারা বছরই দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময় হায়দ্রাবাদের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে, ফলে মিউজিয়ামের ভেতরে ভালভাবে ঘোরা যায়। এপ্রিল থেকে জুন গ্রীষ্মকালে হায়দ্রাবাদের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই সময় দুপুরের দিকে ভিজিট করলে অস্বস্তি হতে পারে। গ্রীষ্মকালে গেলে সকাল বেলায় মিউজিয়াম ঘোরা ভালো। দিনের মধ্যে সকাল বা বিকেলের শেষ ভাগে নিজাম মিউজিয়ামে গেলে দর্শনার্থীর ভিড় তুলনামূলকভাবে কম থাকে। সপ্তাহান্ত ও সরকারি ছুটির দিনে ভিড় বেশি হয়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • টিকিট মূল্য জন্য মাথাপিছু ১৩০ টাকা।
  • মোবাইলে ছবি তুলতে হলে ১০০ টাকার টিকিট লাগে।
  • প্রাঙ্গণের ভেতরে যে কোনও ধরণের ভিডিওগ্রাফি, তা ব্যক্তিগত ভ্লগের জন্যই হোক বা প্রফেশনাল শুটিংএর জন্যই হোক, কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  • পর্যটকদের জন্য প্রাসাদটি সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫টা অবধি খোলা থাকে।
  • চত্বরে মদ্যপান, ধূমপান ও যেকোনো ধরনের তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • গাইড নিলে আনুমানিক ২৫০-৩০০ টাকা পড়বে।
  • সমগ্র প্রাসাদ চত্বর ঘুরতে হাতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় রাখুন। আরামদায়ক পোশাক এবং জুতো পড়ুন।

ট্রিপ টিপস

  • একদিনে পুরানি হাভেলির সঙ্গে চারমিনার এবং চৌমহল্লা প্রাসাদ ঘুরে দেখে নিন।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৬


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://thenizamsmuseum.com/
  3. https://en.wikipedia.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।