ধর্ম

ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির

ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরটি ভারতের  রাজ্য ত্রিপুরার উদয়পুর শহরে অবস্থিত।এটি একান্ন সতীপীঠের একটি বলা হয়।  পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধঙ্গুলি পড়েছিল। মতান্তরে বলা হয় এখানে সতীর ডান পা পড়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবীর নাম ত্রিপুরাসুন্দরী এবং ভৈরব হলেন ত্রিপুরেশ। স্থানীয়দের কাছে মন্দিরটি মাতাবাড়ি নামে পরিচিত।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন।  সেই দেহখন্ডগুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। বলা হয় এখানে সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধঙ্গুলি পড়েছিল। মতান্তরে বলা হয় এখানে সতীর ডান পা পড়েছিল।

বর্তমানে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে উদয়পুরের দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। এই মন্দিরের পৌরাণিক কাহিনী বাংলাদেশের সাথে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অদূরে এক গ্রাম ছিল। সেখানে এক ধোপা বাস করতো। তার একটি গাভী ছিল,সে ভালো দুধ দিত। কিন্তু সে লক্ষ্য করলো তার গাভী আর দুধ দিচ্ছে না। সে ভাবলো তার গাভীর দুধ কেউ চুরি করে নেয়। তাই গাভীকে জঙ্গলে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে সে লুকিয়ে দেখতে লাগলো। সে দেখে গাভী জঙ্গলে ঢুকে গেল তারপর একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে সেখানে দুধ দিচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখে সেখানে একটি শিবলিঙ্গ ও একটি দেবী মূর্তি রয়েছে। সে রাজা ধন্যমাণিক্যকে খবর করে। রাজা ভাবলেন এই শিবলিঙ্গের মন্দির বানিয়ে মহাদেবের প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু অনেক লোক লাগিয়ে, শেষে হাতিকে দিয়েও শিবলিঙ্গ টেনে তুলতে পারলেন না। রাজা ভগ্ন হৃদয়ে ফিরে গেলেন। রাত্রে মহাদেব রাজাকে স্বপ্ন দিয়ে বললেন, "তুমি কোনো দিনই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না ,তবে দেবী বিগ্রহটি নিয়ে যেতে পারো।এবং ভোরের আলো না ফোঁটা পর্যন্ত তুমি যেখানে পৌঁছাবে, সেখানেই এই দেবী মূর্তি স্থাপন করবে"।
রাজা মূর্তি নিতে রওনা হলেন,ও উদয়পুরে এসে পৌঁছালে সূর্য দেব উদিত হলেন।স্বপ্নে পাওয়া মহাদেবের আদেশমতো সেখানেই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু রাজা সেখানে তার ইষ্টদেবতা বিষ্ণুর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, বিষ্ণুকে সরিয়ে কি করে সেখানে মহাশক্তির নির্মাণ করবেন। রাত্রে দেবী রাজাকে স্বপ্ন দিয়ে বললেন, "ধন্যমাণিক্য তুমি যেখানে বিষ্ণু মন্দির তৈরি করেছ, সেখানে সতীর পদ পতিত হয়েছে, তুমি এখানে দেবী শক্তির প্রতিষ্ঠা করো।"
মায়ের আদেশে আর কোনো দ্বিধা না করে সেখানে মা ত্রিপুরাসুন্দরী কে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫০১ সালে রাজার বিষ্ণু মন্দির শক্তিপীঠে পরিবর্তিত হলো। এখানে মায়ের সাথে বিষ্ণুর একসাথে পুজো করা হয়।

ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরটি স্থানীয়দের কাছে মাতাবাড়ি নামে পরিচিত। মন্দিরটি ৭৫ ফুট উঁচু।এই মন্দির ত্রিপুরার নিজস্ব স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত।মন্দিরের গঠনে বিভিন্ন ধর্মের মন্দিরের গঠন রীতির সংমিশ্রণ রয়েছে।এটাই ত্রিপুরার নিজস্ব গঠনরীতি। কচ্ছপ আকৃতির এক অনুচ্চ টিলার উপর এই মন্দির অবস্থিত।কচ্ছপের পীঠের মতো দেখতে বলে একে (কূর্ম পীঠ) বলা হয়ে থাকে। মন্দিরের দরজাটি পশ্চিমমুখী। মন্দিরের পূর্ব দিকে একটি বড় দীঘি আছে যার নাম "কল্যাণসাগর"।ধন্যমাণিক্যর পরবর্তী রাজা কল্যাণমাণিক্য এই সুবিশাল দীঘি খনন করিয়েছিলেন তার নামেই কল্যাণসাগর নামকরণ হয়েছে। এই দীঘি খননের সময় মাটির নীচ থেকে একটি মূর্তি পাওয়া যায় যেটি কল্যাণমাণিক্য ত্রিপুরাসুন্দরী মায়ের পাশে স্থাপন করেন। অপেক্ষাকৃত ছোট এই মূর্তিটি  'ছোট মা' বা 'ছোটি মা' রূপে পূজিত হয়। মন্দিরের ভিতরে দুটি কষ্টি পাথরের মূর্তি রয়েছে। বড়টি ধন্যমাণিক্য চট্টগ্রামের পীঠভূমি চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে এনে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন এটি ত্রিপুরেশ্বরী নামে পরিচিত আর "ছোট মাকে" কল্যাণমাণিক্য প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রতিবছর দীপাবলির সময় এই মন্দিরে বড় উৎসব পালিত হয়। মেলা বসে মন্দির প্রাঙ্গন দর্শনার্থীদের ভিড়ে ভরে যায়। ভিন্ন পূজা-পার্বণে বলিপ্রথাও চালু আছে এখানে। এখানকার প্যাঁড়া খুব বিখ্যাত তার স্বাদের জন্য।

তথ্যসূত্র


  1. কান্ন পীঠ, হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়, দীপ প্রকাশন, পৃষ্ঠা ৫৩ , ত্রিপুরার ত্রিপুরেশ্বরী
  2. https://www.anandabazar.com/travel/holiday-trips/places-to-visit-in-tripura
  3. https://sajebbd.wordpress.com/soktipith
  4. https://www.poriborton.com/
  5. https://www.thedivineindia.com/51-shakti-peeths/

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!