সববাংলায়

ভ্যান্টা ব্ল্যাক

বিভাগঃ ,

কাজল কালো, মিশিকালো, ঘন কালো, আলকাতরার মত কালো… কোনও তুলনা দিয়েই এই কালোকে বোঝানো যাবে না। এ হল কালোর থেকেও কালো, ঘোর কালো। ইংরেজিতে বললে বলতে হয় Blackest Black। সারে ন্যানোসিস্টেমের তৈরি করা এই কালো রঙ একাই একটি বিশ্ব রেকর্ড গড়ে তুলেছে। পৃথিবীর মধ্যে মানুষের তৈরি সবথেকে কালো পদার্থ এই রঙ যার নাম ভ্যান্টা ব্ল্যাক (Vanta Black)। এই রঙ এতটাই কালো যে তা আলোর ৯৯.৯৬৫ শতাংশ পর্যন্ত শোষণ করে নেয়। পৃথিবীতে এবং মহাশূন্যে ইনফ্রারেড ক্যামেরার (Infrared Camera) সক্রিয়তার পিছনেও এই ভ্যান্টা ব্ল্যাক অনেকাংশে দায়ী। ২০১৯ সালে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা ব্র্যান্ড বিএমডব্লিউ (BMW) ভ্যান্টাব্ল্যাক রঙ ব্যবহার করে তাদের একটি ‘এক্স ৬’ মডেলও বাজারে এনেছে। কীভাবে তৈরি করা হল এই কালো রঙ? আসুন জেনে নেওয়া যাক।

২০১৪ সালে সারে ন্যানো সিস্টেম  (Surrey Nano System) এই ভ্যান্টা ব্ল্যাক নামের একটি রঞ্জক আবরক  (Pigment Coating) তৈরি করে। ‘ভ্যান্টা ব্ল্যাক’ কথাটির পুরো নাম আসলে ‘ভার্টিকালি অ্যালাইনড ন্যানো টিউব অ্যারে ব্ল্যাক’(Vertically Aligned Nano Tube Array Black)। সংস্থার মতে, এই রঞ্জকটি ৯৯.৯৬৫ শতাংশ আলোই শোষণ করে নেয়। এই কারণেই একে কালোর চেয়েও কালো বলে দাবী করা হচ্ছে। মহাকাশ ভ্রমণ এবং টেলিস্কোপের সাহায্যে সংবেদনশীল বস্তুর দৃশ্যমানতা উন্নত করার জন্য এই রঞ্জকটি মূলত তৈরি করা হয়েছিল।টেলিস্কোপে এই ভ্যান্টা ব্ল্যাকের প্রলেপ আলোক শোষণ করে দূরবর্তী বস্তু, নক্ষত্র, চাঁদ ইত্যাদি ব্যবহারকারীর চোখে স্পষ্ট করে তুলতে সাহায্য করে। সদ্য আবিষ্কৃত একটি সুপার-ব্ল্যাক শ্রেণির আবরণের ব্র্যান্ড হিসেবেই প্রচলিত হয়ে গিয়েছে ভ্যান্টা ব্ল্যাক। মূলত স্যাটেলাইট-সংক্রান্ত ব্ল্যাকবডি ক্যালিব্রেশন (Black-body Calibration) প্রক্রিয়ার জন্যেই এই ভ্যান্টা ব্ল্যাক রঞ্জকটি আবিষ্কৃত হয়েছিল। সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে টেরাহাৎর্জ বর্ণালী সীমার (Terahertz Spectrum Range) বাইরেও স্প্রে-জাতীয় ভ্যান্টা ব্ল্যাক রঞ্জকটি অতি-বেগুনি রশ্মিকেও শোষণ করে নেয়। এই রঞ্জক আবরণের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে তা ধীরে ধীরে ডিপ স্পেস ইমেজিং (Deep Space Imaging), স্বয়ংচালিত সেন্সিং (Automotive Sensing), আলোক ব্যবস্থা (Optical System) এবং নানাবিধ নান্দনিক শিল্পের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কার্বন ন্যানোটিউব থেকেই মূলত এই ভ্যান্টা ব্ল্যাক তৈরি হয়েছে যা কিনা প্রায় সমস্ত রঙের আলো শোষণ করে। মনে হয় যেন আসলে তা বস্তুটি নয়, বস্তুর ছায়ামাত্র। কার্বন ন্যানোটিউবের বিভিন্ন প্রকার বিন্যাসের ফলে নতুন ধরনের ভ্যান্টা ব্ল্যাক রঙ তৈরি হয়েছে। প্রস্তুতকারক সংস্থার মতে রোবটের সাহায্যে এই নতুন ধরনের রঞ্জক বস্তুর উপর স্প্রে করা যাবে। যেহেতু সিভিডি রিয়্যাক্টরের (CVD Reactor) উপস্থিতি ছাড়াই এই রঙ প্রস্তুত সম্ভব ফলে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য স্প্রে হিসেবেই এই রঞ্জকের উৎপাদন করা হয়ে থাকে। একপ্রকার রাসায়নিক বাষ্পের শোষণ ও ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে একটি সাবস্ট্রেটের (Substrate) মধ্যে প্রচুর উল্লম্ব টিউবের সমাহারে এই সিভিডি ভ্যান্টা ব্ল্যাক তৈরি হয়। আলো এতে আঘাত করার পরে লাফিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার বদলে টিউবের মধ্যে ক্রমাগত বিচ্যুত হতে হতে তাপ হিসেবে শোষিত হয় এবং শেষে বিলীন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে ‘সিভিডি’ কথার অর্থ হল কেমিক্যাল ভেপার ডিকম্পোজিশন (Chemical Vapour Decomposition)। মোটামুটিভাবে ৪০০ ডিগ্রি সেলিসিয়াস তাপমাত্রায় তৈরি করা হয় এই রঞ্জকটি, যদিও এর আগে ‘নাসা’ ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই একই ধরনের উপাদান বানিয়েছিল। ২০১৯ সালে আমেরিকার ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’র বিজ্ঞানীরা এমন এক সিভিডি উপাদান তৈরি করতে সক্ষম হয় যা কিনা আলোর দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র প্রতিফলিত করে। এছাড়া যান্ত্রিক কম্পন প্রতিরোধের ক্ষমতা এবং তাপীয় সহনশীলতাও এই ভ্যান্টা ব্ল্যাকের অত্যধিক বেশি।

ইউরোপের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে এই ভ্যান্টাব্ল্যাক প্রথমে আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং ঐ সময়ই ন্যানো-ল্যাব (Nano Lab), সান্তা বারবারা ইনফ্রারেড (Santa Barbara Infrared) ইত্যাদি সংস্থা প্রচুর পরিমাণে এই রঞ্জক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করেছিল। কিন্তু তখনও ভ্যান্টা ব্ল্যাক নামে এটি পরিচিত হয়নি। ‘সারে ন্যানোসিস্টেম লিমিটেড’ কোম্পানির মাধ্যমেই এই নাম একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। মূলত বাণিজ্যীকরণের সুবিধার্থে দুই রকমের স্প্রে-যোগ্য ভ্যান্টা ব্ল্যাক রঙ তৈরি করা হয়েছে বর্তমানে যাদের নাম যথাক্রমে ভ্যান্টা ব্ল্যাক এস-ভিআইএস (Vanta Black S-VIS) এবং ভ্যান্টা ব্ল্যাক এস-আইআর (Vanta Black S-IR)। প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টিই বেশি পরিমাণে ইনফ্রারেড রশ্মি শোষণ করতে সক্ষম। এই রঙ তৈরির জন্য বিশেষ প্রকারের অনুমোদনের (License) প্রয়োজন হয় এবং ১০০-২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার দরকার পড়ে।

বিখ্যাত ভারতীয়-ব্রিটিশ শিল্পী অনীশ কাপুর তাঁর স্টুডিওতে ইনস্টলেশন আর্ট এবং অন্যান্য শিল্পকর্মের জন্য এই রঙ ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছেন। তাছাড়া ২০১৯ সালেই ফ্রাঙ্কফুর্ট অটো শো-তে ‘বিএমডব্লিউ’ (BMW) কোম্পানি ভ্যান্টা ব্ল্যাক রঙ সহ একটি ‘এক্স ৬’ (X6) নামের একটি গাড়ির মডেল উন্মোচন করেছে। বাণিজ্যিকভাবে এই রঙ বিক্রির অনুমোদন পাওয়া গিয়েছিল ২০১৪ সালেই। ঠিক তার পরের বছর ২০১৫ সালে মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতে ক্রেতাদের চাহিদা মেটানোর জন্য রঙ উৎপাদনও অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কালোর থেকেও আরও কালো এই ভ্যান্টা ব্ল্যাক এখন পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়।   


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।