পৃথিবীর ইতিহাসে মহান যেসব অভিযাত্রীর নাম পাওয়া যায় সেই তালিকায় অবশ্যই স্থান পাওয়ার যোগ্য ভিক্টর ভেসকোভো(Victor Vescovo) নাম। পাহাড়, সমুদ্র, মহাকাশ সবখানেই তাঁর বিচরণ। পাঁচটি মহাসাগরের গভীরতম বিন্দু যেমন তিনি স্পর্শ করেছেন তেমনই জয় করেছেন বিশ্বের সর্বোচ্চ সাতটি চূড়া। উত্তর ও দক্ষিণ মেরু পা রেখেছেন ভেসকোভো। তবে কেবল একজন অভিযাত্রী হিসেবেই তাঁর পরিচয় নয়, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত নৌ-অফিসার এবং অরবিটাল স্পেসফ্লাইটে অংশগ্রহণকারী অন্যতম একজন মানুষ। আবার ইনসাইট ইক্যুইটি হোল্ডিংসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এযাবৎকাল একাধিক বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন ভেসকোভো। সফল সমস্ত অভিযানের জন্য বিভিন্ন সময়ে পুরস্কৃতও হয়েছেন।
১৯৬৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অন্তর্গত ডালাসে ভিক্টর ভেসকোভোর জন্ম হয়। ডালাসেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি৷ ভেসকোভোর বাবা একটি বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেটে কাজ করতেন। ভেসকোভোর যখন মাত্র ষোল বছর বয়স তখন তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ভেসকোভোর বাবা তাঁকে সবসময় ব্যবসা সংক্রান্ত পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন কিন্তু ভেসকোভোর মাথায় চলত মিলিটারি ইতিহাস। ভেসকোভোর মা নার্সিং শিক্ষায় প্রশিক্ষিত ছিলেন এবং ভেসকোভোর কথা অনুযায়ী তিনি অনেক বেশি সংরক্ষণশীল, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং বুদ্ধিমতী। ২৩ বছর বয়সের একটা ঘটনা ভেসকোভোকে রোমাঞ্চের স্বাদ এনে দিয়েছিল। সেরেঙ্গেটিতে সাফারি করার জন্য নাইরোবিতে একটি একক ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। দূরে মেঘের আড়ালে দেখতে পেয়েছিলেন মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো।
ভেসকোভো উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। প্রথমে তিনি সেন্ট মার্কস স্কুল অফ টেক্সাসে অধ্যয়ন করে সেখানে কৃতকার্য হওয়ার পরে প্রবেশ করেন স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এরপর চলে যান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়াশুনা করতে। সেখানে প্রতিরক্ষা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিদ্যা (রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত) বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনে সক্ষম হন তিনি৷ এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বাবার পেশাটি সম্পর্কেও পড়াশুনার জন্য ভেসকোভো হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। সেখানে তিনি একজন বেকার স্কলার (Baker Scholar) ছিলেন।
পড়াশোনা শেষ করার পর ভেসকোভো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভি রিজার্ভে গোয়েন্দা অফিসার হিসেবে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০ বছর কাজ করেছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি একজন কমান্ডার হিসেবে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ইউএস নেভিতে তিনি ইরাক, কসোভা এবং আফগানিস্তানে মূলত একজন টার্গেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ৯/১১-এর ঘটনার পর ভেসকোভোকে বিদেশে সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল।
ইউএস নেভিতে কর্মরত থাকাকালীনই ভেসকোভো ২০১০ সালের ২৪ মে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছিলেন। ২০১৭ সালের মধ্যে ভেসকোভো দ্বাদশতম আমেরিকান এবং বিশ্বের ৩৭তম ব্যক্তি যিনি মাউন্ট এভারেস্ট-সহ বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করেছেন। সেইসঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে পদার্পণ করে বরফের ওপর প্রায় ১০০ কিলোমিটার স্কিইং করেছিলেন তিনি। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ-সহ সাতটি সর্বোচ্চ শিখর জয় করার এই দুঃসাহসিক লক্ষ্য ‘এক্সপ্লোরার গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ নামে পরিচিত। এক্সপ্লোরার গ্র্যান্ড স্ল্যাম সম্পূর্ণ করবার জন্য ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে’ ভেসকোভোর নাম নথিভুক্ত হয়েছিল। তবে তাঁর বিশ্বরেকর্ডের তালিকা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করবার পাশাপাশি তিনি পাঁচটি মহাসমুদ্রের গভীরতম তলদেশকেও ছুঁয়ে এসেছিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর স্থান প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশ বেশ কয়েকজন স্পর্শ করেছিলেন আগেই কিন্তু ভেসকোভো হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি পাঁচটি মহাসমুদ্রেরই গভীরতম স্থানে পৌঁছেছিলেন। তবে মারিয়ানা ট্রেঞ্চেও একাধিকবার যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে তাঁরই।
পঞ্চাশোর্ধ ভেসকোভো পাঁচটি মহাসমুদ্রের অন্ধকার তলদেশ অন্বেষণ করতে চেয়েছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চ (যাকে ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ও বলা হয়) ছাড়াও আরও চারটি তলদেশ হল আটলান্টিক মহাসাগরের পুয়ের্তো রিকো ট্রেঞ্চ, দক্ষিণ মহাসাগরের সাউথ স্যান্ডউইচ ট্রেঞ্চ, ভারত মহাসাগরের জাভা ট্রেঞ্চ এবং আর্কটিকের মোলয় ডিপ। এক বছরের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন তিনি। এই উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১৮ সালে ভেসকোভো ‘ফাইভ ডিপস এক্সপিডিশন’-এর সূচনা করেছিলেন। কিন্তু সমুদ্রের একেবারে গভীরতম স্থানে জলের মারাত্মক চাপের মধ্যে টিকে থাকার মতো যান অর্থাৎ সাবমেরিনের প্রয়োজন ছিল। প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে সেখানে প্রায় ১৬০০০ পাউন্ড চাপ সহ্য করতে হবে। গুগলে খুঁজতে গিয়ে তিনি তখন ফ্লোরিডার এক সাবমেরিক প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘ট্রিটন’-এর সন্ধান পান। তখন সেই কোম্পানিকে নিজের উদ্দেশ্য জানিয়ে ইমেল করেছিলেন ভেসকোভো। প্রায় নয়-দশমাসের প্রচেষ্টায় যে সাবমেরিন নির্মিত হয়েছিল ভেসকোভো তার নাম দিয়েছিলেন ‘লিমিটিং ফ্যাক্টর’।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ভেসকোভো আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরতম বিন্দু পুয়ের্তো রিকো ট্রেঞ্চে পৌঁছেছিলেন। এরপরের অভিযান সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ভেসকোভো এই অভিযানে পৌঁছেছিলেন দক্ষিণ মহাসাগরের গভীরতম তলদেশ সাউথ স্যান্ডউইচ ট্রেঞ্চে। এই অভিযানে ট্রেঞ্চের সঠিক পরিমাপ করবার জন্য কংগসবার্গ ইএম ১২৪ নামের একটি সোনার সিস্টেম (শব্দপ্রচার করে নেভিগেট করতে, দূরত্ব পরিমাপ করতে, সমুদ্রের নীচে কোনো বস্তুকে শনাক্ত করতে ব্যবহৃত সিস্টেম) ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল ভেসকোভো বালির দক্ষিণে সুন্দা ট্রেঞ্চ বা জাভা ট্রেঞ্চের নীচে ডুব দিয়ে ভারত মহাসাগরের তলদেশে পৌঁছেছিলেন। নতুন প্রজাতির শামুক, মাছ ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছিল এই অভিযানে।
২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল ভেসকোভো সমুদ্রের সবচেয়ে গভীরতম বিন্দু প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চ বা চ্যালেঞ্জার ডিপে অবতরণ করেছিলেন। প্রথম অবতরণের সময় তিনি লিমিটিং ফ্যাক্টরকে ১০,৯২৮ মিটার গভীরতায় চালিত করেছিলেন। ১ মে তিনি এই ট্রেঞ্চে দ্বিতীয়বার যাত্রা করেন এবং ভেসকোভোই প্রথম ব্যক্তি হন যিনি দুবার এখানে নেমেছিলেন৷ অবাক কান্ড হল এই দ্বিতীয়বারের চ্যালেঞ্জার ডিপ অভিযানে ভেসকোভো কিছু প্লাস্টিক খুঁজে পেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনটি নতুন প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী আবিষ্কৃত হয়েছিল।
২০১৯ সালের ২৪ আগস্ট আর্কটিক মহাসাগরের মোলয় ডিপে পৌঁছে এই ‘ফাইভ ডিপস এক্সপিডিশন’ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। ভেসকোভো এই মোলয় ডিপে পৌঁছনো প্রথম ব্যক্তি ছিলেন।
পাঁচটি মহাসমুদ্রের গভীরতম তলদেশে পৌঁছনো ছাড়াও ভেসকোভো পৃথিবীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় গভীরতম বিন্দু যথাক্রমে হরাইজন ডিপ এবং সিরেনা ডিপেও পৌঁছেছিলেন।
এছাড়াও বহুবার সমুদ্রের তলদেশে অভিযান চালিয়ে আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করেছিলেন তিনি৷ ডুবে যাওয়া আরএমএস টাইটানিকের কাছে পৌঁছনোর জন্য একক অভিযান চালিয়েছিলেন। এছাড়াও ডুবে যাওয়া ফরাসি সাবমেরিন মিনার্ভের ধ্বংসাবশেষের কাছে গিয়ে তার গায়ে একটি স্মারক ফলক স্থাপন করে এসেছিলেন। ২০২১ সালে, ভেসকোভো ফিলিপাইন সাগরে ৬,৪৫৬ মিটার গভীরতায় ইউএসএস জনস্টন-এর ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত ও জরিপ করেছিলেন। ১৯৪৪ সালে ব্যাটেল অব সমর-এর সময় এই জনস্টন ডুবে গিয়েছিল। সেই একই যুদ্ধে ডুবে যাওয়া ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস-এর ধ্বংসাবশেষ ফিলিপাইন সাগরের গভীরে গিয়ে শনাক্ত করেছিলেন তিনি।
ভেসকোভো ছয়জন যাত্রীকে চ্যালেঞ্জার ডিপে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে একজন মহাকাশচারী ছিলেন। সেই অভিযানে এনওএএ-এর প্রশাসক ক্যাথরিন সুলিভান ছিলেন, যিনি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে যাওয়া প্রথম মহিলা হিসেবে পরিচিত হন। ২০২২ সালের শেষদিকে চ্যালেঞ্জার ডিপে প্রায় পনেরোটি ডাইভের রেকর্ড ছিল ভেসকোভোর।
কেবল পাহাড় এবং সমুদ্রই নয়, একবার মহাকাশেও পাড়ি দিয়েছিলেন ভেসকোভো। ২০২২ সালে ব্লু অরিজিন এনএস-২১ মিশনের অংশ হিসেবে নিউ শেফার্ড নামক মহাকাশযানে করে মহাকশে পাড়ি দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি যিনি মাল্টি-ইঞ্জিন জেট, হেলিকপ্টার এবং সেই সাথে সাবমার্সিবল টেস্ট পাইলট হিসাবেও ভীষণই দক্ষ।
একজন অভিযাত্রী হিসেবে পরিচিত হলেও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ভেসকোভোর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। ইনসাইট ইক্যুইটি নামক প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। এটির আগে ভিক্টর বেইন অ্যান্ড কোম্পানির একজন সিনিয়র ম্যানেজার ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে তিনি লেহম্যান ব্রাদার্সের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বিভাগে কাজ করেন, যেখানে তিনি কোম্পানির যথাযথ পরিশ্রম এবং লেনদেন সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন। ব্যবসায় বিনিয়োগের বিষয়ে সৌদি সরকারকেও পরামর্শ দিয়েছিলেন একসময়।
নিজের জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলিকে ভেসকোভো লিপিবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছেন। সেই কারণে ২০২০ সালে ভেসকোভা তাঁর সামুদ্রিক অভিযানগুলির ওপর ‘এক্সপিডিশান ডিপ ওশিয়ান’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য ভেসকোভো ‘দ্য এক্সপ্লোরার মেডেল’, ‘ক্যাপ্টেন ডন ওয়ালশ’-এর মতো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।
বর্তমানে (২০২৩ সালে) এই অসাধারণ অভিযাত্রী ভিক্টর ভেসকোভোর বয়স ৫৭ বছর।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান