বিজ্ঞান

আমরা স্বপ্ন দেখি কেন

“স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে; স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না”। ডঃ কালামের এই বিখ্যাত উক্তিতে তিনি কঠিন বাস্তবের সাথে ঘুম ও স্বপ্নের দারুণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।স্বপ্ন আর বাস্তব -এই দুয়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি দার্শনিক, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ মানুষ নানান মতপ্রকাশ করে এসেছেন। কিন্তু স্বপ্ন আজও রহস্যময় রয়ে গেছে সবার কাছে। এই রহস্যের সম্পূর্ণ উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা চলতে থাকবে। গবেষণা চলতে থাকুক, পাশাপাশি আমরা জেনে নেব স্বপ্ন কি, আমরা স্বপ্ন দেখি কেন, অন্ধ মানুষ স্বপ্ন দেখে কিনা ইত্যাদি বিভিন্ন তথ্য।

স্বপ্ন হল একটি বিশেষ জটিল মানসিক অবস্থা। আমাদের ঘুমের প্রাথমিক অবস্থায়, যখন দ্রুত চোখ নড়াচড়া করে (Rapid Eye Movement বা REM SLEEP) তখন বতর্মান, নিকট ও দূরের অতীতে ঘটে যাওয়া বা ঘটার সম্ভবনা ছিল – এমন  বিভিন্ন কাল্পনিক টুকরো ঘটনা অবচেতনভাবে অনুভব করতে থাকি। এগুলোই স্বপ্ন। ঘটনাগুলি কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় সত্যি বলে মনে হয়।

স্বপ্নের বেশ কিছু আধুনিক তত্ত্বে বিশেষজ্ঞরা স্বপ্নের কারণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।নিউরো বায়োলজিক্যাল তত্ত্ব অনুযায়ী স্বপ্ন আলাদা  কিছু নয়, এটা মস্তিষ্কের একরকমের বৈদ্যুতিন সংকেত যা স্মৃতি থেকে এলোমেলো ভাবে টুকরো কিছু ছবি ও চিন্তাকে নিয়ে তৈরি। মানুষ ঘুম ভাঙার পর এই টুকরো ছবি ও চিন্তা নিয়ে অর্থপূর্ণ গল্প তৈরি করেন। বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা করে দেখেছেন মানুষ ছাড়াও আরও অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন জন্মান্ধ মানুষরাও দেখেন কিন্তু সেই স্বপ্নে কোনো ছবি থাকে না। শুধু শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শের অনুভূতি থাকে। দুর্ঘটনাজনিত কারণে যাঁরা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন তাঁদের বয়স বেড়ে গেলেও প্রিয়জনদের স্বপ্নে সেই আগের অবস্থাতেই দেখেন অর্থাৎ তাঁর স্মৃতিতে যে ছবি ধরা আছে তাই বারবার ফিরে আসে।

স্বপ্ন নিয়ে আরও কিছু তত্ত্ব আছে, যেমন –
জ্ঞান ও স্মৃতি সংগঠন ( Organization of knowledge and memories) – ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত এক তত্ত্ব অনুসারে, স্বপ্নের মাধ্যমে আমরা যা কিছু শিখি তার আত্তীকরণ হয় ও তাৎক্ষণিক স্মৃতি থেকে দীর্ঘকালীন স্মৃতি (permanent memory) তৈরি হয়। অর্থাৎ স্বপ্ন শিক্ষা ও স্মৃতি প্রক্রিয়া করার মূল হাতিয়ার। সাধারণত জেগে থাকা অবস্থায় পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোই স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়। ঘুমের মধ্যে শরীরে যে সমস্ত জৈব রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে ও বৈদ্যুতিন সংকেত আদান প্রদান হয় তার স্বপক্ষে মস্তিষ্কের উত্তরই হল স্বপ্ন।
জীবনের পরিস্থিত অনুযায়ী জৈবিক প্রতিক্রিয়া (Biological response to life circumstances) – স্বপ্নের মাধ্যমে মন দৈনন্দিন জীবনের কঠিন, জটিল, বিচলিত করে এমন সব সমস্যা, চিন্তা, আবেগ, অভিজ্ঞতাগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ এনে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখে।সেই জন্য ভালো ঘুম যেমন প্রয়োজন তেমন  স্বপ্ন দেখাও স্বাভাবিক।যাঁরা মনে করেন স্বপ্ন দেখেন না, তাঁরা আসলে স্বপ্নের প্রতিচিত্র (blueprint) ঘুম ভাঙার পর মনে রাখতে পারেন না।
হুমকি অনুলিপি তত্ত্ব (Threat-simulation theory) – স্বপ্নের মাধ্যমেই মস্তিস্ক বাস্তব জগতে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হুমকি, ভয় ও চ্যালেঞ্জের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। স্বপ্ন অবচেতনের সেই অবস্থা যেখানে অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতিকে নিয়ে  মস্তিস্ক বিবেচনা করে।
সক্রিয় সংশ্লেষ তত্ত্ব ( Activation-synthesis theory) – হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মনোবিদের মতে যখন মস্তিষ্কের কোন উদ্দীপনা আমাদের চেতনতায় চিন্তার উদ্রেক ঘটায় তখন আমরা স্বপ্ন দেখি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আরইএম ঘুম (REM SLEEP) ) এবং লিম্বিক সিস্টেমের (ইমোশনাল মোটর সিস্টেম) উদ্দীপনার ফলে ব্রেনস্টেম সক্রিয় হলে স্বপ্ন দেখি।

তবে যে তত্ত্বই ঠিক বলে ভবিষ্যতে প্রমাণিত হোক না কেন, এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা সকলেই সহমত যে স্বপ্ন নামক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াটি আমাদের সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। অ্যালকোহলযুক্ত ওষুধ সেবন, মদ্যপান, নেশা করা স্বাভাবিক ঘুমচক্রে ব্যাঘাত ঘটায় ফলে স্বপ্নেরও সমস্যা আসতে পারে। কোনো উৎকণ্ঠার বিষয় বা পরীক্ষার ভীতি যেমন দীর্ঘদিন দুঃস্বপ্ন হয়ে আসতে পারে, তেমনই গোপন কিছু আশা ও ইচ্ছে স্বপ্নের মাধ্যমে পূর্ণ করে শারীরবৃত্তীয় জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো সামঞ্জস্য বিধান করে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন মনে রাখতে না পারলেও প্রত্যেকে প্রতি রাতে গড়ে তিন থেকে ছ বার স্বপ্ন দেখেন। এই স্বপ্নগুলো পাঁচ থেকে কুড়ি মিনিট স্থায়ী হয়। ঘুম থেকে ওঠার পর শতকরা পচানব্বই শতাংশ স্বপ্নের কথা আমরা ভুলে যাই। স্বপ্নে আমরা চেনা মানুষগুলোকেই দেখি। পরিচিতি এলাকায় পরিচিত মুখ খুঁজে পাই। ভুল করে কেউ স্বপ্নে যদি দেখেন প্রিয়জন থুরথুরে বুড়ো হয়ে গেছেন, আপনার সঙ্গে ঝগড়া করছেন, আসলে সেটা মস্তিষ্কের একটা প্রক্রিয়াগত ভুল। সে স্মৃতিজাল  থেকে দৃশ্যগুলো/ অবয়বগুলো এনে জোড়া দিতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় একজনের অবয়বের মধ্যেই অন্যজনের অবয়ব লেপ্টে দিয়েছে ।এই ভুল খুব বেশি হয় না। সুতরাং সুস্থ থাকুন,ভালো ঘুমান এবং স্বপ্ন দেখুন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।