বিজ্ঞান

শীতকালে চোট লাগলে বেশি ব্যথা করে কেন

গ্রীষ্মকালের তুলনায় শীতকালে চোট লাগলে বেশি ব্যথা করে এমনকি বাত, পুরনো চোটের ব্যথা বা অস্থি সন্ধির ব্যথা ইত্যাদি শীতকালে বৃদ্ধি পায় বলে অনেকে মনে করেন। এর পিছনে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ না পাওয়া গেলেও বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন এবং আবহাওয়ার সঙ্গে ব্যথার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে আপাতত, আমরা সেই সব সম্ভাব্য কারণগুলি ও সর্বাপেক্ষা সমর্থিত মতামত এখানে জেনে নেব।

প্রথমেই আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে স্নায়ুতন্ত্র কিভাবে কাজ করে। আমাদের স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্ক, সুষুম্নাকান্ড (মেরুদন্ড) ও অসংখ্য স্নায়ু নিয়ে গঠিত। সারাদেহের বিভিন্ন অংশ থেকে স্নায়ু বিভিন্ন তথ্য সুষুম্নাকান্ডে পৌঁছে দেয় এবং সেখানে থেকে আমাদের শরীরের প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র মস্তিষ্কে পৌঁছায়। আমাদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও শরীরের লক্ষ লক্ষ স্নায়ু সর্বক্ষণ কোন না কোন সংবেদন গ্রহণ করছে। যদি সারা দেহের সমস্ত স্নায়ু দ্বারা গৃহীত সংবেদন মস্তিষ্কে পৌঁছাত তাহলে সেই সকল সামাল দেওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার হত। তাই কোন বিশেষ সংবেদন একটা নির্দিষ্ট মাত্রা (threshold) পেরোলেই তা মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কিন্তু সেই সংবেদন যদি অনেকক্ষণ একই রকম থাকে তাহলে সেই সংবেদন পাঠানোর নির্দিষ্ট মাত্রা আরও বেড়ে যায় যাতে মস্তিষ্ক নতুন উদ্দীপকে সাড়া দিতে পারে – ফলত সেই পূর্বের মাত্রার মধ্যে থাকা সংবেদন মস্তিষ্কে আর পৌঁছায় না। যেমন, কোন জামা পড়লে প্রাথমিক ভাবে দেহে জামার স্পর্শের অনুভূতি আসে, কিছুক্ষণ পরে সেই অনুভূতি চলে যায় ও মনেই হয় না জামা পড়ে আছি – কারণ সংবেদন পাঠানোর প্রাথমিক সীমা বেড়ে যায় ফলত একই রকম স্পর্শ হলেও মস্তিষ্কে সেটা যায় না। এরপর হঠাৎ জোরে হাওয়া দিলে জামা শরীর ছুঁলে স্পর্শের পরিমান বাড়ে ফলে সংবেদনের মাত্রা পরিবর্তন হয় ও তা মস্তিষ্কে পৌঁছায়। প্রসঙ্গত বলা যায়, রেল লাইনের পাশে বাড়ি হলে, অথবা একটানা বা নির্দিষ্ট সময়ে মাইক বাজার শব্দ এই একই কারণে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে না যাকে আমরা বলি ‘অভ্যাস’ হয়ে যাওয়া।

এর একই সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রে আরও একটা ব্যাপার কাজ করে যাকে বলে ‘সম্পূর্ণ বা শূন্য’ (all or none) প্রভাব। অর্থাৎ, কোন সংবেদন যতক্ষণ পৌঁছায় না ততক্ষণ একটুকুও পৌঁছায় না কিন্তু যখন পৌঁছায় তখন পুরোটাই পৌঁছায়।

ব্যথার ক্ষেত্রেও ঠিক একই ভাবে কাজ করে। কখনো কখনো ব্যথার সংবেদন, নির্দিষ্ট সীমার কম থাকায় তা মস্তিষ্কে পৌঁছায় না কিন্তু তার সঙ্গে সামান্য সংবেদন যোগ হলেই সেই সীমা পেরোতে পারে – শীতকালে ঠান্ডার সংবেদন সেই বাকি সংবেদনের পরিমান হিসেবে কাজ করে। ফলত সামগ্রিক সংবেদন নির্দিষ্ট সীমা পেরিয়ে যায় ও মস্তিষ্ক বোঝে সেই অঞ্চলের উদ্দীপনা বা ব্যথার কথা। আর ‘অল-অর-নান’ নীতি মেনে এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সংবেদন পৌঁছায় ও মস্তিষ্ক বেশি ব্যথা বোধ করে।

পুরনো ব্যথা, বাতের ব্যথা, অস্থি সন্ধির ব্যথা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য – এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক পুরোনো ব্যথার একই ধরণের সংবেদন-এ অভ্যস্ত হয়ে যায় – অর্থাৎ সংবেদন পাঠানোর নির্দিষ্ট সীমা বর্ধিত হয় কিন্তু ঠান্ডার সংবেদন সেই সীমাকে পের করে দেয়।

এছাড়া আরও একটি মত প্রচলিত আছে। শীতকালে তাপ সংরক্ষণের জন্য দেহ সাধারণত ভিতরের অঙ্গ যেমন হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, কিডনি ইত্যাদিতে রক্ত বেশি পাঠায় ও দেহের বাইরের দিকের অঙ্গ যেমন হাত, পা, ত্বক ইত্যাদিতে কম রক্ত পাঠায়। ফলে এই অংশগুলি কঠিন, অনমনীয় হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষ বা যাদের পুরনো ব্যথা আছে তাদের ক্ষেত্রে পেশির এই কঠিনতার কারণে সন্ধিতে ব্যথা বাড়ে। রক্ত সঞ্চালন কম হওয়ায় সামান্য ঠোকা লাগলেই হাতে, পায়ে বেশি ব্যথা করে।

শীতকালে ব্যথার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে হাত, পা ও মাথা ভাল করে ঢেকে গরম রাখা দরকার কারণ এইসব অংশ থেকেই সব থেকে বেশি তাপ অপসারণ হয়। এর পাশাপাশি কিছু খালি হাতে ব্যয়াম করলে রক্ত সঞ্চালনের পরিমাণ বাড়বে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন