ধর্ম

পিয়াঁজ ও রসুন কে আমিষ ধরে নেওয়া হল কিভাবে

পিয়াঁজ ও রসুন কে আমিষ ধরে নেওয়া হল কিভাবে? সমস্ত সব্জির মধ্যে হঠাৎ পিয়াঁজ রসুন কি এমন দোষ করল, যাতে এদের নিরামিষ তকমা কেড়ে নিয়ে আমিষ হিসেবে গণ্য করা শুরু হল।

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে। উপনিষদ বলে, আমাদের এই পৃথিবী, আমাদের এই জগৎ গঠিত মূলত তিনটি গুণের সমন্বয়ে। যথা- সত্ত্বা, রাজ, তামঃ।”রাজ”- বলতে বোঝায় শুদ্ধতা ও জ্ঞান। “তামঃ”-, বলতে বোঝায়-অজ্ঞতা এবং জড়তা। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী খাদ্যকেও এই ‘ত্রিগুণ’ অর্থাৎ এই তিনটি গুণ অনুসারে ভাগ করা হয়েছে। যথা-, রাজসিক, সাত্ত্বিক, ও তামসিক।

সাত্ত্বিক বলতে মূলতঃ নিরামিষ শাক সবজি জাতীয় খাবারের কথাই বোঝায়।যেমন- ধান, গম,শশা, শাক,চিনি,ঘি, দারুচিনি,আখরোট ইত্যাদি।

রাজসিক বলতে মূলতঃ সেইসব খাবার বোঝায় যেগুলি অত্যন্ত উগ্র গন্ধ উদ্রেককারী, নোনতা কিংবা তেতো স্বাদের হয়।

আর তামসিক হল বাসি বা ঠান্ডা করা খাবার, অর্ধ সেদ্ধ, মাছ, মাংস, ডিম তথা আমিষ জাতীয় খাদ্য, মদ ইত্যাদি।

প্রাচীন আয়ুর্বেদ অনুযায়ী চরিত্রগত কারণে যেহেতু পিয়াঁজ ও রসুনের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আছে, তাই এগুলি রাজসিক খাদ্যের মধ্যে পড়ে।যেহেতু রাজসিক খাদ্য, রাজা গুণকে জাগিয়ে তোলে, যা কিনা মানুষের মনে ক্রোধ, ঈর্ষা, অহংকার, প্রচারমুখীতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও জাগতিক সুখভোগের ইচ্ছা বাড়িয়ে তোলে তাই এই ধরনের খাবার না খাওয়াই উচিত। মনের আধ্যাত্মিক উন্নতি চাইলে রাজসিক খাবার নৈব নৈব চ।

বিখ্যাত আয়ুর্বেদ পন্ডিত Dr. Robert.E.Svoboda এর মতে পিয়াঁজ ও রসুন খেলে মনে জাগতিক চিন্তা বড় প্রবল হয়ে ওঠে। যেহেতু আত্মার মুক্তি পেতে জাগতিক চিন্তার প্রতি মোহভঙ্গ সবার আগে দরকার তাই পিয়াঁজ ও রসুন পরিকল্পিতভাবে শাস্ত্রে নিষিদ্ধ করা হয়।

আমিষ হিসেবে পিয়াঁজ রসুনের অন্তর্ভুক্তি ও খাদ্যরূপে নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ আছে। পিয়াঁজ ও রসুন দুইই আ্যলিয়াম শ্রেণীভুক্ত হওয়ার কারণে এই দুইয়ের মধ্যে ভীষণ ভাবে ফেনোলিক ফাইটোকেমিক্যাল উপস্থিত যা কিনা মানুষের শরীরে আ্যনড্রোজেনিক, অর্থাৎ যৌন উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। আয়ুর্বেদ মতে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে এই দুটি, অর্থাৎ পিয়াঁজ ও রসুন ব্যবহার হয়।এগুলো খেলে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম সরাসরি উত্তেজিত হয়ে পড়ে।এখন এই কামনা বাসনা যেহেতু মানব মনের তামসিক প্রবৃত্তির মধ্যে পড়ে, তাই আত্মার শুদ্ধির প্রয়োজনেই এগুলি গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত।

‘মনু সংহিতা’-য় মনু সমগ্র মানবজাতিকে পিয়াঁজ ও রসুনকে খাদ্যরূপে গ্রহণে মানা করেন। উনি যেসব যুক্তি দেন তার বক্তব্যের সমর্থনে তার মধ্যে অন্যতম হল পিয়াঁজ ও রসুন যেহেতু মাটিতে জন্মায়,যা কিনা অশুদ্ধ, তাই পুনর্জাত মানুষের এগুলো গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই উচিত।মনুর মতে, পুনর্জাত মানুষ যদি মাশরুম, শূয়োর, রসুন, মোরগ, পিয়াঁজ ও পিয়াঁজপাতা এই ছয়টির যেকোন একটি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে তাকে ‘কৃক্ষরা’ বা ‘কান্দ্রায়ন’ কৃচ্ছসাধন করতে হবে। অর্থাৎ যা কিনা একরাত্রি পূর্ন উপবাস বোঝায়।এটিই হল তার প্রায়শ্চিত্ত।

আবার প্রচলিত এক কিংবদন্তি অনুসারে- সমুদ্র মন্থনের সময় বিষ্ণু যখন তার মোহিনী রূপ ধারণ করে দেবতাদের মধ্যে অমৃত বিতরণ করছিলেন তখন দেবতাদের সারিতে রাহু ও কেতু এই দুই অসুর দাঁড়িয়েছিল। বিষ্ণু খেয়াল না করে তাদের ও অমৃতের ভাগ দিয়ে ফেলেন। পরে খেয়াল হতেই রাহু ও কেতুর মাথা এক কোপে কেটে ফেলেন।মাথা যখন কাটছেন বিষ্ণু, তখনও রাহু কেতু’র গলা দিয়ে অমৃত নামেনি। মুণ্ডচ্ছেদের ফলে সেই অমৃত গলা হয়ে মাটিতে পড়ে এবং সেখান থেকে জন্ম নেয়  পিয়াঁজ ও রসুন। যেহেতু পিয়াঁজ রসুন অসুরের গলাধঃকৃত অমৃত  থেকে জাত সেহেতু  এগুলি গ্রহণে মানব দেহে আসুরিক শক্তির আবির্ভাব হবে সুতরাং এগুলি গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

কেবল সনাতন হিন্দু ধর্মই নয়, খাবার পাতে পিঁয়াজ রসুনের বিপক্ষে মতদান করেছে  বৈষ্ণবরাও। বৈষ্ণব ধর্মেও পিয়াঁজ ও রসুনের বিপক্ষেই যাবতীয় ধারণা, গল্প ও নিয়ম জন্ম নিয়েছে।এরকমই এক পৌরাণিক গল্পে বলা হয়েছে- এক ঋষি গোমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন যখন তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। গর্ভবতী হওয়ার ফলে ঋষি ভার্যার গো মাংসের প্রতি বিশেষ টান তৈরী হয়। লোভ সামলাতে না পেরে উনি গো মাংসের স্তূপ থেকে একখন্ড মাংস লুকিয়ে রাখেন পরে সুযোগ বুঝে খাবেন বলে।ঠিক এই সময় ওই ঋষিও তার যজ্ঞ শেষ করে ওই গো মাংসের স্তূপের প্রতি মন্ত্রচ্চারণ শুরু করেছেন যাতে ওই মাংসস্তূপ থেকে আবার নতুন করে বাছুর জন্ম নিতে পারে। বাছুরতো সৃষ্টি হল, কিন্তু বাছুরের শরীর থেকে এক খন্ড মাংস কম পড়ছে।দিব্য দৃষ্টিতে তিনি দেখলেন মাংস কম পড়ার কারণ কি।স্ত্রী ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে স্বামী তার জেনে গেছেন ওই এক খন্ড মাংস কে নিয়েছে সুতরাং তিনি মাংস খণ্ডটি আর নিজের কাছে না রেখে তক্ষুনি দূরে মাঠের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেন। এখন ওই ঋষির মন্ত্রচ্চারণের প্রভাবে ওই মাংসপিন্ডের মধ্যেও প্রাণ সঞ্চার হয়। নতুন যে গরুর জন্ম তার মাংস থেকে জন্ম হয় পিয়াঁজের আর হাড় থেকে হয় রসুনের। যেহেতু এই দুটি সবজি প্রাণী দেহ থেকে উৎপন্ন সেহেতু বৈষ্ণবরা পিয়াঁজ রসুনকে আমিষ হিসেবেই গণ্য করে।

জৈন ধর্মেও পিয়াঁজ ও রসুনকে আমিষ হিসেবেই বিবেচিত করা হয়েছে। জৈনরা যেহেতু অহিংস ধর্মের প্রচারক ও প্রবর্তক সেহেতু তারা প্রাত্যহিক জীবনে যথা সম্ভব প্রাণীদেহে আঘাত বা কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে। এই অহিংসা নীতি একইভাবে উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জৈনদের মেনে চলা কঠোর অনুশাসনের মধ্যে পড়ে মূলজ উদ্ভিদ না খাওয়া।মূলজ উদ্ভিদ যেমন- আলু, পিয়াঁজ, রসুন, গাজর ইত্যাদি।জৈন ধর্মানুযায়ী এই সব মূলজ উদ্ভিদ ‘ অনান্থকায়’।অনান্থকায় বলতে বোঝায় এক দেহ, কিন্তু অফুরান,অনন্ত প্রাণ। মূলজ উদ্ভিদ যেমন, পিয়াঁজ যদিও বাইরে থেকে দেখে মনে হয় একটাই মূল অংশ, কিন্তু খোসা ছাড়ানোর পর বোঝা এটি অনেক প্রাণের মিলনস্থল।এই ক্ষুদ্র প্রাণ আঘাত পায় যখন একে মাটি থেকে তুলে নেওয়া হয়, উপড়ে নেওয়া হয়।যেহেতু এর মধ্যে থাকা চক্ষু (bulb), যা কিনা পিয়াঁজের সবথেকে ক্ষুদ্র ও মূল অংশ যেটা সময়ের সাথে সাথে বেড়ে ওঠে।তাই এই মূলজ উদ্ভিদের সম্পূর্ণ উৎপাটন, প্রাণের, এক অর্থে সমগ্র উদ্ভিদটিরই মৃত্যু ঘটায়, তাই এগুলি খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।

ইসলামে অবশ্য পিয়াঁজ ও রসুনকে এতটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। সেখানে কেবল বলা হয়েছে পিয়াঁজ ও রসুন খেলে তার দুর্গন্ধ দূর হওয়ার ব্যাপার নিশ্চিত না হওয়ার পর্যন্ত কোন ‍মুসলমানের মসজিদে যাওয়া উচিত না। কারণ এর ঝাঁঝালো গন্ধ অন্যের বিব্রত হওয়ার কারণ হতে পারে।

ব্যাখা হয়ত অনেক, কিন্তু মুল বক্তব্য সব ধর্মেই এক এবং অদ্বিতীয়। পিয়াঁজ ও রসুন মানব মনকে উত্তেজিত করে তোলে, যা মনঃসংযোগের পথে এক প্রবল অন্তরায়। আসলে সব ধর্মের অন্তরনিহিত অর্থটাই যে এক- মানুষের আত্মিক উন্নতি সাধন।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!