ভারতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যশালী সংস্কৃতির মধ্যে বেশ কিছু খেলার কথাও আসে। ভারতে বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় কুস্তি খেলা (Wrestling) সেই ঐতিহ্যেরই ধারক ও বাহক। বহু প্রাচীন খেলা এই কুস্তি। রামায়ণ-মহাভারতে এর হদিশ পাওয়া যায়। এই কুস্তি আবার স্থানবিশেষে বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও পেহেলওয়ানি, কোথাও বা দঙ্গল বলা হয় এটিকে। কুস্তি মূলত দুজন খেলোয়াড় বা প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে খেলা হয়ে থাকে। কুস্তি সাধারণত একটি আউটডোর গেম তবে কখনও কোন প্রতিযোগিতায় ইনডোরেও অনুষ্ঠিত হতে পারে। ভারত এই খেলাটির জন্য জনপ্রিয় তো বটেই, এছাড়াও রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, কিউবা, ইরান ইত্যাদি দেশ কুস্তি খেলায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে।
কুস্তি খেলার ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এটি প্রাচীন এক খেলা। কুস্তির প্রাচীন ভারতীয় রূপটি মল্লযুদ্ধ নামে পরিচিত। রামায়ণ, মহাভারতে এর প্রসঙ্গ এসেছে কখনও কখনও। রাবণ এবং বালির মধ্যে মল্লযুদ্ধ কিংবা জরাসন্ধ এবং কৃষ্ণ ও বলরামের মধ্যে সংঘটিত মল্লযুদ্ধের কথা পাওয়া যাবে এই দুটি প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে। অন্তত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দ থেকে অনুশীলন হয়ে চলেছে এই খেলার। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মল্ল পুরাণে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে খেলাটি, সেটাকেই আধুনিক কুস্তির অগ্রদূত বলা হয়ে থাকে।
ষোড়শ শতকে উত্তর ভারত মধ্য এশিয়ার মুঘলরা জয় করেছিল। তাঁরা মূলত তুর্কো-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত ছিল। ইরানী ও মঙ্গোলীয় কুস্তির সঙ্গে আঞ্চলিক মল্লযুদ্ধকে মিশিয়ে আধুনিক কুস্তি খেলার সূত্রপাত ঘটেছিল বলা যায়। মুঘল সম্রাট বাবর নাকি নিজেও একজন কুস্তিগীর ছিলেন। এমন কথা প্রচলিত ছিল যে, বাবর দুই হাতের নীচে দুজন মানুষকে ধরে খুব দ্রুত অনেক দূর পর্যন্ত দৌড়তে সক্ষম ছিলেন। ভারতীয় কুস্তির ঐতিহ্যবাহী শৈলীটি বিকশিত হয়েছিল পারস্যে, বিশেষ করে ষোড়শ শতকে মুঘল যুগে। ‘ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের জনক’ নামে পরিচিত রামদাস সপ্তদশ শতকের শেষদিকে মানুষকে শক্তিশালী ভগবান হনুমানের উপাসনা হিসাবে শারীরিক ব্যায়ামে নিয়োজিত করতে অনুপ্রাণিত করবার জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেছিলেন। অন্যদিকে মারাঠা শাসকরাও একসময় কুস্তি খেলায় ভীষণই উৎসাহ দান করেছিলেন নানারকম পুরস্কারের মাধ্যমে। মনে করা হয় যে, সেই সময়ে, প্রতিটি মারাঠা শিশু কুস্তি করতে সক্ষম ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনামলেও কুস্তির গৌরব ম্লান হয়নি। রাজপুতরাও এই খেলা খুবই পছন্দ করতেন। ভারতের উত্তরপ্রদেশ এবং পাঞ্জাব কুস্তি খেলার সেরা আয়োজক হিসেবে পরিচিত। ১৯০৯ সালে, আবদুল জব্বার সওদাগর নামে একজন বাঙালি বণিক স্থানীয় যুবকদের একত্রিত করতে এবং একটি কুস্তি টুর্নামেন্টের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তাঁর প্রবর্তিত খেলা জব্বার-এর বলি খেলা নামে পরিচিত এবং আজও কোথাও কোথাও এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
কুস্তির অনুশীলন যেখানে করা হয় সেটি ‘আখড়া’ নামে পরিচিত। বালি-মাটি-কাদায় ভরা সেই আখড়ায় পালোয়ানরা কুস্তিচর্চা করে থাকেন। একটু বড় আকারের আখড়াতে কুস্তির প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত খেলোয়াড়রা একটিমাত্র ল্যাঙ্গোট পরে এই খেলা খেলেন। ছয় বছর বয়স থেকেই কুস্তির প্রশিক্ষণ শুরু হতে পারে। কুস্তিগীররা সূর্য নমস্কার, শীর্ষাসন, ডনবৈঠক ইত্যাদি ব্যায়াম, যেগুলি সাধারণত হঠযোগের মধ্যেও পাওয়া যায়, কুস্তিগীরেরা চর্চা করে থাকেন শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য। এছাড়াও তাঁদের শরীরচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলির মধ্যে রয়েছে নাল, গারনাল, গদা, মুগদার প্রভৃতি।
কুস্তির নিয়মকানুনের দিকে এবারে লক্ষ করা যাক। যে চৌহদ্দির মধ্যে লড়াই সম্পন্ন হয় সেটি সাধারণত বর্গাকার বা বৃত্তাকার হয় এবং তা মোটামুটি চোদ্দ ফুট মতো পরিসর জুড়ে থাকে। আধুনিক ম্যাট ব্যবহার করার পরিবর্তে, দক্ষিণ এশীয় কুস্তিগীররা ময়লা মাটিতেই প্রশিক্ষণ দেয় এবং প্রতিযোগিতা করে।
প্রতিটি ম্যাচের আগে কুস্তিগীররা আশীর্বাদস্বরূপ মাটি থেকে কয়েক মুঠো ধুলোমাটি নিজের এবং প্রতিপক্ষের উপর ছুঁড়ে দেয়।
খেলার চৌহদ্দির মধ্যে একজন রেফারি থাকেন এবং বাইরে থাকেন দুজন রেফারি খেলা পরিচালনা করবার জন্য।
সাধারণত কোন রাউন্ড হয় না, তাই একেকটি ম্যাচ কুড়ি থেকে তিরিশ মিনিটের হয়ে থাকে। তবে প্রতিযোগীদের সম্মতিক্রমে ম্যাচের মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। খেলোয়াড়রা খেলার চৌহদ্দি অর্থাৎ রিং-এর বাইরে যেতে পারে কিন্তু খেলাটি শেষ করতে রিং-এর মধ্যে আসতে হবেই তাদের। কোন খেলোয়াড়ই একে অপরকে ঘুষি বা লাথি মারতে পারে না এই খেলায়। কোন খেলোয়াড়ের কাঁধ এবং নিতম্ব মাটিতে স্পর্শ করাতে পারলে তার প্রতিপক্ষ পয়েন্ট স্কোর করতে পারেন। সম-ওজনের দুই কুস্তিগীরের মধ্যেই একমাত্র লড়াই হবে।
কুস্তি খেলার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। অলিম্পিক এবং কমনওয়েলথ গেমস ছাড়াও আরও কিছু প্রতিযোগিতা দেখা যায়। তেমনই কয়েকটি কুস্তি টুর্নামেন্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: সিনিয়র ন্যাশনাল রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপ, গ্র্যান্ড প্রিক্স টুর্নামেন্ট, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্ট, র্যাঙ্কিং সিরিজ, দিল্লি ক্যাডেট রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপ, জুনিয়র স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রো রেসলিং লীগ, ইত্যাদি।
কুস্তিতে যেসব খেলোয়াড় সারা বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন এমন কয়েকজন হলেন: আলেকজান্ডার কেরলিন (অলিম্পিকে তিনটি সোনা, একটি রুপো), মাভলেট বাটিরভ (দুটি অলিম্পিক সোনা), মিজেইন লোপেজ (অলিম্পিকে তিনটি সোনা), এলব্রুস তেদেইয়েভ (অলিম্পিকে একটি ব্রোঞ্জ ও একটি সোনা), সুশীল কুমার (বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক), গীতা ফোগাট (কমনওয়েলথ গেমসে সোনা), দীপক পুনিয়া (জুনিয়র ওয়ার্ল্ড রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা), সাক্ষী মালিক (অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ) প্রমুখ।
কুস্তি খেলা ভারতীয় ঐতিহ্যেরই একটি অন্যতম প্রধান অংশ। অতএব এই দেশ যে কুস্তি খেলায় অভূতপূর্ব দক্ষতা প্রদর্শন করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘রেসলিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া’ ভারতে কুস্তি খেলা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ভারতবর্ষের কোলাপুরকে ‘রেসলিং ক্যাপিটাল অব ইন্ডিয়া’ বলা হয়ে থাকে কারণ এখান থেকে বহু কুস্তিগীর পেয়েছে আমাদের দেশ। স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বতন্ত্র বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন কুস্তিগীর উদে চাঁদ। কুস্তির একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় গুলাম মোহাম্মদ বক্স বাট, যিনি মূলত গামা পালোয়ান নামেই পরিচিত, একজন ভারতীয় ছিলেন। আবার ব্রহ্মদেব মিশ্রের মতো ভারতীয় কুস্তিগীরও ছিলেন এককালে, যিনি কেবল ভারতে নয় সারা বিশ্বে তাঁর অসাধারণ কৌশলের জন্য পরিচিত ছিলেন। কিংবদন্তী বাঙালি কুস্তিগীর গোবর গোহ প্রথম এশীয় হিসেবে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। ভারতের বিশেষত, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্য কুস্তি খেলার আয়োজনের জন্য বিখ্যাত। সুশীল কুমার, গীতা ফোগাটের মতো ভারতীয় কুস্তিগীররা বিশ্বের দরবারে ভারতকে একটি সম্মানের আসনে বসিয়েছেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান