ধর্ম

যমপুকুর ব্রত

যমপুকুর ব্রত কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকে কার্তিক মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত পালন করা হয়। আবার কোন কোন মতে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি থেকে কার্তিক মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত যমপুকুর ব্রত পালন করা হয়। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক দেশে এক বামুনি এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে বাস করত। কিছু সময় পর বামুনির মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় যমরাজের সাথে। তারপর সে তার শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। বামুনির বাড়ি ফাঁকা লাগে তাই সে তার ছেলের বিয়ে দিয়ে বাড়িতে বউ নিয়ে আসে।বউ তার কাজের গুণে সবার মন জয় করে নেয়। দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে কার্তিক মাস আসে। কার্তিক মাস পড়তেই বউ উঠোনে পুকুর কেটে তাতে যম পুকুর পুজো আরম্ভ করল। তা দেখে শাশুড়ি ভাবে বউ বোধহয় তাকে তুকতাক করছে। তাই সে বউকে গালমন্দ করে পুকুর বুজিয়ে দেয়। বউ কাঁদতে কাঁদতে যমকে বলে, "আমি এক বছর যমপুকুর ব্রত পালন করলাম। তুমি সাক্ষী থাকলে।"
বছর ঘুরে কার্তিক মাস পড়লে বউ আবার যম পুকুর ব্রত পালন করে। শাশুড়ি আবার দেখতে পেয়ে তা বুজিয়ে দেয়। বউ যমকে আবার স্মরণ করে বলে, "আমি এই দুইবছর যমপুকুর ব্রত পালন করলাম।"
আবার পরের বছর কার্তিক মাস পড়লে বউ তার শাশুড়িকে লুকিয়ে রান্না ঘরের পিছনে যমপুকুর ব্রত পালন করে। বউকে ঘরে দেখতে না পেয়ে শাশুড়ি তাকে খুঁজতে খুঁজতে দেখে আবার সে একই ব্রত পালন করছে। তা দেখে শাশুড়ি তার চুলের মুঠি ধরে গালমন্দ করে পুকুরে থুতু দিয়ে তা আবার বুজিয়ে দেয়। বউ কাঁদতে কাঁদতে যমকে বলে, "আমি এই নিয়ে তিন বছর যম পুকুর ব্রত পালন করলাম,তুমি সাক্ষী।"
চতুর্থ বছর পড়লে বউ ছাইগাদায় পুকুর কেটে যম পুজো শুরু করল। আবারও শাশুড়ির চোখে পড়ে গেল এবং সে তার বউকে কটূ কথা শুনিয়ে পুকুর বুজিয়ে দেয়। বউ যমরাজকে কাঁদতে কাঁদতে আবার স্মরণ করে বলে, "আমার পুজো চার বছরে শেষ হলো তুমি সাক্ষী থাকলে।"

কিছু দিন যাবার পর বামুনির খুব শরীর খারাপ হল এবং সে মারা গেল। বামুনির ছেলে তার বোনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে এল। তাদের মায়ের শ্রাদ্ধশান্তি হয়ে গেলে মেয়ে আবার যমরাজের সাথে শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেল। সেখানে যমরাজা তার বউকে বলল, "রানী,তুমি যেরম ঘুরে বেড়াতে তাই ঘুরো কিন্তু দক্ষিণ দিকে আর কখনো যাবে না।"
এই শুনে তো রানীর মনে বেশি করে কৌতূহল হল। সে সুযোগ খোঁজে ওই দিকে কি আছে তা দেখার। একদিন কেউ কোথাও নেই দেখে দক্ষিণদিকে গিয়ে যা দেখল তাতে তার প্রাণ কেঁদে উঠল। সে দেখল তার মায়ের মতো দেখতে একজন স্ত্রীলোককে যমদূতের নরককুণ্ডে ডোবাচ্ছে ,নানা উপায়ে শাস্তি দিচ্ছে আর সেই স্ত্রীলোকটি তার আর তার দাদার নাম ধরে চিৎকার করছে।এসবকিছু দেখে বামুনির মেয়ে ঘরে এসে খুব কাঁদছে যখন, তখন যমরাজ ঘরে এল। তাকে দেখে মেয়ে আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগল। যম কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে যমরাজকে সে সব খুলে বলল। সবশুনে যমরাজা বলে, "তোমার মা তো মহাপাপী। তাই তার এই দশা। বেঁচে থাকাকালীন তার বউকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। বউ যখন যমপুকুর ব্রত পালন করত তখন তো নানাভাবে তাকে বাধা দিয়ে খুব কষ্ট দিয়েছে। তাই আমি তো তার উদ্ধারের আশা দেখছি না।"
বামুনির মেয়ে তখন তার মায়ের উদ্ধারের উপায় যমরাজের কাছে জানতে চাইল। অনেক ভেবে যমরাজ বলল, "একটাই উপায় যদি তোমার বৌদি তোমার মায়ের নামে একসাথে চারটি যমপুকুর ব্রত পালন করে তবে তার উদ্ধার হবে। কিন্তু তোমার বৌদিকে এত কষ্ট দিয়েছে যে, তার জন্য সে কি আর রাজী হবে?"

যমের বউ নাছোড়বান্দা। তাই দেখে যমরাজ বলল,  "একটা উপায় করা যায়। তোমার বৌদি এখন ন'মাসের পোয়াতি। ছেলে হবার সময় আমি ওকে ভর করব। তখন যদি ওকে দিয়ে যমপুকুর পুজো করিয়ে নিতে পারো তাহলে তোমার মা উদ্ধার পাবে।"
বামুনির মেয়ে সেই শুনে বাপের বাড়ি এসে তার বৌদির খুব যত্ন করতে লাগল। দশমাস দশদিনে প্রসব বেদনা উঠলো,কিছুতেই ছেলে আর হয় না বামুনির মেয়ে তখন বলে, "বৌদিভাই তুমি মায়ের নাম করে চারটি যমপুকুর ব্রত করো তাহলে এখুনি তোমার ছেলে হবে।"
কিন্তু বউ কিছুতেই রাজি হয় না। তার ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে। বামুনির মেয়েও সমানে বলে চলে,  "তুমি পুজো করো দেখবে তোমার সোনার চাঁদের মতো ছেলে হবে।"
শেষে বউ তার শাশুড়ির নামে চারটি যমপুকুর পুজো করল আর অমনি তার ছেলে হয়ে গেল। সঙ্গে তার শাশুড়িও উদ্ধার পেয়ে গেল। বামুনির মেয়ে তারপর ছেলের নামে পুজো করিয়ে ভাইয়ের সংসার গুছিয়ে দিয়ে যমপুরীতে ফিরে গেল। এরপর আস্তে আস্তে এই ব্রতকথা পৃথিবীতে প্রচারিত হল।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৯৫
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১২২

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!