সববাংলায়

২১ মার্চ | আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশে কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস (International Day of Forests)।

প্রতি বছর ২১ মার্চ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস পালন করা হয়। অরণ্যাঞ্চলের গুরুত্ব এবং বন ও গাছ সম্পর্কে সচেতনতা প্রসারের উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি এবং ক্রম পরিবর্তনশীল জলবায়ু থেকে মানব সমাজকে রক্ষা করতে অরণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা, সমৃদ্ধি ও কল্যাণার্থে এই অরণ্য সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি আর এই বার্তা বিশ্ববাসীকে পৌঁছে দিতেই আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস পালন করা হয়।

আদিম মানুষেরা গাছের কোটরে থাকত, গাছের ফল খেত, কাঠ কেটে জ্বালানি বানিয়ে ঘর গরম রাখত বা শিকার করা পশুর মাংস পুড়িয়ে খেত। সভ্যতা যত উন্নত হয়েছে, আমাদের গাছের উপর নির্ভরতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু গাছের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ কমেছে। প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা যত বেড়েছে মানুষের, ততই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এই মানবসমাজ। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বন তথা অরণ্যের দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থাপনা আর তার সম্পদের ব্যবহারই জলবায়ু পরিবর্তনকে সামাল দিতে পারে। এর ফলেই একমাত্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন সুরক্ষিত ও নিরাপদ হবে। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রেও বনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এছাড়া বাস্তুতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এবং সামাজিক অনেক সুযোগ-সুবিধা এই বন থেকেই পেয়ে থাকি আমরা।

বর্তমান বিশ্বের সবথেকে বড় সমস্যা হল অরণ্য ধ্বংস হওয়া যা দ্রুত হারে মানব সমাজের এক বিশাল বিপদ ডেকে আনছে। কাঠের উনুনে রান্না করে জীবাণু-মুক্ত খাদ্য পাওয়া সম্ভব, এমনকি জলের জীবাণুও এভাবে দূর হয়ে যায়। প্লাস্টিকের কিংবা ফাইবারের বদলে কাঠের আসবাবপত্র, বাসন ইত্যাদি ব্যবহার করা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশ-বান্ধব। আমাদের জীবনে কাঠের এবং গাছের খুবই প্রয়োজন, এই প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে এ কথা সত্য। কিন্তু আমাদের সর্বাগ্রে খেয়াল রাখতে হবে এই প্রয়োজন সাপেক্ষে গাছের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতে করা উচিত। অরণ্যের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুনর্নবীকরণযোগ্য এই শক্তি উৎসকে মানুষের কাছে ব্যবহার্য করে তুলতে হবে।

পরিসংখ্যান অনুসারে প্রতি বছর সমগ্র বিশ্বে ১ কোটি ৩০ লক্ষ হেক্টর অরণ্যভূমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। গোটা ইংল্যান্ড দেশটির আয়তনের সমান এই অরণ্যভূমির পরিমাণ। এই বনভূমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সেই বনভূমিতে বাস করে এমন প্রাণীকুল, এমন উদ্ভিদও মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। সমগ্র বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য এভাবেই প্রতি বছর বিনষ্ট হচ্ছে। সবথেকে বড় বিষয় হল, জলবায়ু পরিবর্তনে এই বনভূমি অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। তাই বনভূমি ধ্বংসের ফলে পৃথিবীর মোট কার্বন নিঃসরণের হার ১২-১৮ শতাংশ বেড়ে গেছে। পরিবহন ব্যবস্থা থেকেই এর বেশিরভাগ অংশের কার্বন নিঃসৃত হয়। সুস্থ বনভূমি একইভাবে ‘কার্বন শোষক’ (Carbon Sink) হিসেবে কাজ করে।

বর্তমান বিশ্বে মোট স্থলভূমির আয়তনের ৩০ শতাংশ বনভূমি রয়েছে এবং এই বনভূমিতে প্রায় ৬০ হাজারেরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে এখনও বহু প্রজাতির উদ্ভিদের শনাক্তকরণই হয়নি। আদিবাসী তথা উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে বনভূমিই জল, কাঠ, খাদ্য, তন্তু ও ঔষধের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে এবং সমগ্র বিশ্বে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের জীবন আজও কেবলমাত্র এই বনভূমি ও গাছের উপর নির্ভরশীল। ২০১৯ সালের দ্বিবার্ষিক স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট অনুসারে ভারতে ২০১৭ সাল থেকে বনাঞ্চলের পরিমাণ ৩৯৭৬ বর্গ কিমি. অর্থাৎ ০.৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।  

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ষোড়শ সম্মেলনে প্রথম প্রতি বছর ২১ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক অরণ্য গবেষণা সংস্থা (Centre for International Forestry Research) পরপর ছয় দিন অরণ্য দিবস পালন করে। এই উদ্যোগের পাশে ছিল ‘ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্স অফ পার্টিস’ (United Nations Framework On Climate Change Conference Of Parties)। এছাড়া রাষ্ট্রসংঘ মূলত ‘কোলাবরেটিভ পার্টনারশিপ অন ফরেস্টস’ (Collaborative Partnership On Forests) সংস্থার সহযোগিতাতেই এই আয়োজন সম্পন্ন করেছিল।

২০১১ সালে আন্তর্জাতিক অরণ্য বর্ষ পালিত হওয়ার পর থেকেই ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর তারিখে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস পালনের প্রস্তাব পাস হয় এবং ২০১৩ সাল থেকে সর্বসম্মতিক্রমে এই দিনটি সমগ্র বিশ্ব জুড়ে পালন করা শুরু হয়। এর অনেক আগে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডের দুই জীববিজ্ঞানী পরস্পরের মধ্যে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে অনুভব করেছিলেন যে বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বনের গুরুত্বকে অবহেলা করার অবকাশ নেই।

২০০৭ সালেই প্রথম ইন্দোনেশিয়ার বালিতে আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস পালিত হয়েছিল, তবে সেদিন ছিল ৮ ডিসেম্বর। তারপরে ২০০৮ সালে ঐ একই দিনে পোল্যান্ডের পোজনানে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস পালিত হয়। ২০০৯ সালে ১৩ ডিসেম্বর ডেনমার্কের কোপেনহাগেনে, ২০১০ সালে মেক্সিকোর কানকানে, ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এবং ২০১২ সালে ২৬ নভেম্বর থেকে ৭ ডিসেম্বর কাতারের কোয়েটাতে আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবস পালিত হয়। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে বনসৃজন উৎসব, বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান, প্রকৃতি বা অরণ্য পরিক্রমা কিংবা পাতা দিয়ে নোটবুক বানানোর প্রয়াস অনুষ্ঠিত  হয়।

আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য

  • ২০২৫ – অরণ্য এবং খাদ্য (Forests and Food)
  • ২০২৪ – বন এবং উদ্ভাবন: একটি উন্নত বিশ্বের জন্য নতুন সমাধান (Forests and Innovation: New Solutions for a Better World)
  • ২০২৩ – অরণ্য ও স্বাস্থ্য (forests and health)
  • ২০২২ – অরণ্য এবং স্থিতিশীল উৎপাদন ও ব্যবহার (Forests and sustainable production and consumption)
  • ২০২১ – অরণ্য পুনরুদ্ধার : আরোগ্য ও কল্যাণের পথ (Forest Restoration : The Path to Recovery and Welfare)
  • ২০২০ – অরণ্য এবং জীববৈচিত্র্য : হারিয়ে ফেলা মানে অপূরণীয় ক্ষতি (Forest and Biodiversity : Too Precious to lose)
  • ২০১৯ – অরণ্য এবং শিক্ষা (Forest and Education)
  • ২০১৮ – বনভূমি এবং দীর্ঘস্থায়ী শহরগুলি (Forests and Sustainable Cities)।
  • ২০১৭ – অরণ্য এবং শক্তি (Forests and Energy)

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading