৩০শে মে, ভোর ৬টা
আজ ভোর থেকেই এখানে হাল্কা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কাল রাতে সেইভাবে বৃষ্টির আশঙ্কা ছিল না। আর ছিল না বলেই আমরা বক্সা ফোর্টের প্ল্যানটা করেছিলাম। কিন্তু এখন ভাবছি কি করা যায়। দূরের জয়ন্তী পাহাড়টা পুরোটাই প্রায় মেঘে ঢেকে গেছে।বক্সা ফোর্টে আমাদের যাওয়ার যা বর্ণনা শুনলাম, তাতে পাহাড়ের একটা নির্দিষ্ট জায়গা অবধি গাড়ি পৌঁছে দেবে।তারপর প্রায় তিন কিলোমিটার ট্রেক করে উঠতে হবে।গাইড ছাড়া নিজেরা যাওয়া ঝুঁকি হয়ে যাবে। বাংলো থেকেই একজন গাইড ঠিক করে দেওয়ার কথা। কিন্তু সে গাইড এখনও আসে নি। যেমন রুবাইও এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি।
সকাল ৮টা
প্রায় আধ ঘন্টা হল আমরা হাঁটছি বক্সা ফোর্টের পথে।এই খাড়াই পথে আধ ঘন্টা হাঁটা মানে সমতলে প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা। এই আধ ঘণ্টা হেঁটেই কিছুটা ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তাই ডায়েরীটা খুলে বসলাম এখানেই। এখন একটা পাথরের ওপর বসে লিখছি।আমাদের বেরোতে বেরোতে প্রায় সকাল সাতটা বেজে গেল। আমাদের সঙ্গী নেপালি গাইডটির নাম বাহাদুর। বৃষ্টি একটু ধরতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম।গত দুদিনের পর আজ প্রথমবার আমরা এইদিকটা এলাম। এই দিকটার নাম সানতালাবাড়ি। সানতালাবাড়ি হল বক্সা পাহাড়ে ওঠার আগে সমতলের শেষ গ্রাম। আমরা সেই গ্রামের মধ্যে দিয়ে গাড়ি নিয়ে ছুটে চললাম। গাড়ি করে কিছুদূর এসে এখানে একটা চেক পয়েন্ট পড়ল।সেখানে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দেখিয়ে, সই করে আমাদের গাড়ি পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল।২৬০০ ফিট উচ্চতার বক্সা পাহাড়ে আগে সানতালাবাড়ি থেকে বক্সা ফোর্ট অবধি পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা পুরোটাই হেঁটে যেত হত।কিছুদিন আগে গাড়ি চলাচলের রাস্তা হওয়ায় দু কিলোমিটার অবধি গাড়ি যায়।
দুপাশে ঘন জঙ্গল নিয়ে ছুটতে ছুটতে প্রতিবারই মনে হয় এই যদি রাস্তায় দেখা হয়ে যায় কোন বুনো জানোয়ারের সাথে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। হঠাৎ বাহাদুরদার “ঐ দেখুন” শুনেই বুকের মধ্যে হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠল। তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলাম না। রুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ও চোখে বাইনোকুলার লাগিয়েও কিছু দেখতে পাচ্ছেনা। তারপর অনেক কষ্টে দেখতে পেলাম আমরা। একটা ময়ূর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এতটাই জঙ্গলের মধ্যে মিশে গেছে যে আমরা দুজনেই খেয়াল করতে পারিনি। বাহাদুরদার দৃষ্টির তারিফ না করে পারলাম না।
যেতে যেতে বাহাদুরদার থেকে বক্সার এই জঙ্গল নিয়ে অনেক তথ্য পেলাম।১৯৮৩ তে ভারতের পনেরোতম সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান হিসেবে বক্সা জাতীয় উদ্যান গঠন হয়। পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই জাতীয় উদ্যানের মধ্যে থেকে প্রায় ৭৬০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলকে বক্সা সংরক্ষিত ব্যাঘ্র অরণ্য ঘোষণা করে। এখানে একটু বলে রাখি এমনি ফরেস্টের সাথে রিজার্ভ ফরেস্টের বেশ কিছু পার্থক্য আছে।রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত অরণ্য হল এমন একটি ফরেস্ট যার, অর্থাৎ ফরেস্টটি যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই রাজ্যের সরকার আইন করে তার যাবতীয় সম্পত্তির মালিকানার একমাত্র অধিকারী হয়।এক্ষেত্রে বক্সার মালিকানা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের।রিজার্ভ ফরেস্টে কোন রকম শিকার, বা গবাদি পশু চড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বক্সার এই জঙ্গলের উত্তরে রয়েছে ভুটানের ফিপশু ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারী আর পূর্বদিকে আসামের মানস জাতীয় উদ্যান।এখানে হাতি, গৌর (ভারতীয় বাইসন), ক্লাউডেড লেপার্ড, হরিণ ছাড়াও নাকি প্রায় ২৭৪টা প্রজাতির পাখি আর ৭৩টা প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। বাহাদুরদাকে জিজ্ঞেস করলাম “সবই তো আছে দেখছি।কিন্তু বাঘ কই?”
বাহাদুরদা হেসে বলল “বাঘ আছে শুনেছি।কিন্তু এতই কম যে দেখা প্রায় মেলেনা বললেই চলে।যা দেখা মেলে তা হল লেপার্ড।”
রুবাই ডাক দিল। ও দেখছি উঠে হাঁটাও শুরু করে দিয়েছে । এখন লেখা বন্ধ করছি।
সকাল ৮টা ৪৫
প্রায় ৪৫ মিনিট একটানা হাঁটছি আমরা।আমরা এখন একটা পাহাড়ি চায়ের দোকানে বসে আছি।অয়ন মোমো খাচ্ছে।বাহাদুরদা একটু দূরে কিছু স্থানীয় লোকের সঙ্গে কথা বলছে।আমি এই ফাঁকে ডায়েরীটা লিখে নিচ্ছি। রাস্তা খাড়াই না খুব একটা, কিন্তু এত এবড়ো খেবড়ো পাথরে ভর্তি যে অনায়াসভাবে হাঁটা একেবারেই যাচ্ছে না।
আসবার পথে বাহাদুরদার থেকে একটা ভাল জিনিস জানলাম। অয়নই আসলে বাহাদুরদার থেকে যত সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে। সেই রকমই একটা তথ্য হল এই যে ডুয়ার্স সফর আমরা করছি, এই ডুয়ার্স নামটা কিভাবে এল।এই ডুয়ার্সের একেবারে গায়ে গা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভুটান।একটা সময় ছিল যখন ভুটানের মানুষ ভারতের সমতলে যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন গিরিপথ ব্যবহার করত।এই গিরিপথ গুলো যেহেতু ভারতের প্রবেশ পথ হিসেবে ব্যবহার হত, এগুলোকে door বা ‘দোর’ বলা হত।লোকমুখে এই ‘ডোর’ কালক্রমে ‘দুয়ার’ হয়ে ওঠে।ভুটান থেকে ভারতে প্রবেশের এরকম ১৮টা প্রবেশ পথ আছে যার মধ্যে ৬টা পড়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আর বাকি ১২টা আসামে।বক্সা এরকমই একটা দুয়ার।বক্সাদুয়ার একসময় পরিচিত ছিল ‘পাশাখা’ নামে। পাশাখা একটি ভুটানি শব্দ, যার মানে অরণ্য। তেরোর শতকে পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর আসামে কামাতা সাম্রাজ্যের পত্তন হয় কুচ বংশের অধীনে।পরবর্তীকালে কুচ রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে ডুয়ার্স দখল করে নেয় ভুটান রাজারা।১৮৬৫-তে ভুটানের সাথে যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়ী হলে এই ডুয়ার্স ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন হয়। হাঁটতে হাঁটতে বাহাদুরদা বলছিল এই বক্সাদুয়ারে আজ প্রায় ২৮ বছর আছে।হাতের তালুর মত চেনা এখানকার প্রতিটা জঙ্গল, গিরিপথ সব। দুপাশে ঘন গাছের সারির মধ্যে থেকে বাহাদুরদা আমাদের চেনাচ্ছিল কোনটা গামার , কোনটা চাঁপ, কোনটা বহেড়া গাছ।হঠাৎ দেখলাম একটা গাছের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল।বলল “দাদা এই গাছটা দেখুন।এটা একটা স্পেশাল গাছ আছে।” আমি এগিয়ে গিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে কিছু বিশেষত্ব খুঁজে না পেয়ে, শেষে বললাম ” কি স্পেশালিটি তুমিই বল।আমি তো কিছু বুঝতে পারছিনা।”
অয়ন তখনও হাল ছাড়েনি। বিভিন্ন ব্যাপারে ওর পড়াশোনাটা আছে তো। দেখি গুঁড়িটা টিপে টিপে দেখছে, কিন্তু কিছু বুঝতে পারছে বলে তো মনে হয় না।
“দাদা কিছু বুঝতে পারলেন?” হাসতে হাসতে অয়নকে জিজ্ঞেস করল বাহাদুরদা ।বুঝলাম, গাছ সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞানতা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে ।
অয়ন হাতটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল “ঠিক বুঝতে পারলাম না।তবে গাছের ছালটা বেশ নরম মনে হল।”
“ঠিক ধরেছেন। ঠিক ধরেছেন।” বাহাদুরদা প্রশংসার হাসি হেসে বলল, ” এই গাছটার নাম চিলাউনি।বৈজ্ঞানিক নাম- স্কিমা ওয়ালিচি। মেইনলি উত্তর পুরব ভারতে এই গাছ জন্মায়। এই গাছের ছাল থেকে পাওয়া রস মাছ মারবার বিষ হিসেবে ব্যবহার হয়।আবার এই একই ছাল পায়ের ফাটা গোড়ালি সারাতেও কাজে লাগে।এর থেকে পাওয়া রস কানের ইনফেকশন সারাতেও লাগে।”
আমি এই প্রথম কোন মেডিসিনাল প্লান্ট দেখলাম।প্রকৃতির এই দুর্গম অঞ্চলে তার যে সন্তানেরা থাকে, সেখানে রিং গার্ড, ইচ গার্ড কিছুই পৌঁছয়না।প্রকৃতি নিজেই তাই উপস্থিত তার সন্তানের ব্যথা উপশম করতে।আমরা এগিয়ে চললাম।নিস্তব্ধ এই সকালে আমরা ছাড়া মাঝে মাঝেই দেখছি ওপরের পাহাড়ি মেয়েরা কাঁধে বেতের ঝুড়ি ব্যাগের মত করে দু কাঁধে নিয়ে নিচে যাছে।
বাহাদুরদাকে এরা কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সানতালাবাড়িতে প্রতি মঙ্গলবার হাট বসে। এরা সেই সানতালাবাড়িতে বাজার করতে যাচ্ছে। কোন কোন পাহাড়ি যুবক আবার পিঠে চালের বস্তা নিয়ে ওপরে চলেছে। কি অমানুষিক পরিশ্রম। আমি যেতে ভাবছিলাম, আমরা যারা সমতলে থাকি তারা বাড়ির কাছে ছাড়া বাজার করি না।পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে সারা সপ্তাহের বাজারটা রিক্সা কিংবা বাইকে না এনে নিজের পিঠে চাপিয়ে পাঁচ কিলোমিটার আবার পাহাড়ি পথে চড়াই ভেঙে ভেঙে ফেরা কল্পনাও করতে পারি না।আমরা যারা পরিশ্রম করি বলে আত্মশ্লাঘা বোধ করি, তারা এই পাহাড়ি মানুষ গুলোর ধারে কাছেও আসিনা যদি জীবিকা উপার্জনে খাটুনি, পরিশ্রম ইত্যাদির কথা ওঠে।
মাঝে একটা সরু রাস্তা দিয়ে চলছিলাম। একপাশে খাদ, অন্যপাশে ঘন জঙ্গল। খাদের ওইপাশটা দেখিয়ে বলল বাহাদুরদা, “ঐ যে রাস্তাটা গেছে… ”
“কোথায় রাস্তা?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“ঐ যে দূরের যে পাহাড় মত জায়গাটা…” বাহাদুরদা বলল, “এখন যেটা পাহাড় বলে ভাবছেন, ওটা আসলে রাস্তা ছিল”
“মানে?”
“এই কয়েক সপ্তা আগে তো ধস নামলো!” বাহাদুরদা কত স্বাভাবিক ভাবে বলল, “এখন তাই এখান দিয়ে যেতে হচ্ছে।”
ধস। খবরে পড়েছি, টিভিতে দেখেছি, কিন্তু ধস নামা এলাকার পাশ দিয়ে এই প্রথম। প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনই ভয়ঙ্কর।
কিছুদূর চলার পর ঝরনার শব্দ শুনতে পেলাম। জলের প্রতি আমার টান চিরকালের। বাহাদুরদাকে জিজ্ঞেস করতে আমায় এগিয়ে নিয়ে খাদের দিকে এল। নিচের দিকে তাকাতে জলের উৎস বুঝতে পারলাম। স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে পাথরের ওপর দিয়ে। তার জলোচ্ছাসের শব্দ এত ওপরেও কি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। শুধু জলের ছিটেটাই যা গায়ে আসছে না। চোখ বুজিয়ে সেই ছিটেটাও আমি যেন অনুভব করতে পারলাম।
“বক্সাঝোরা” বলল বাহাদুরদা। এখানে বিভিন্ন নদীকে যে ওরা ঝোরা বলে সেটা অয়নের থেকে জেনেছি।
অয়ন দেখছি ক্যামেরা নিয়ে দূরের ছবি তুলছে। আমি যেখানটায় বসে লিখছি তার পেছনে পুরো বক্সাদুয়ারের একটা অসাধারণ ভিউ যেটা অয়ন তার ক্যামেরায় বন্দী করছে। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দূর থেকে দুটো নদীর রেখা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ঠিক যেন ভূগোল বইয়ের ছবির মত। এই প্রাকৃতিক শোভা ঠিক বলে ব্যাখা করা কঠিন। বাহাদুরদার থেকে জানতে পারলাম নদীদুটো জয়ন্তী ও বালা নদী। নদীগুলো ছাড়াও পাহাড়ের এত ওপর থেকে নিচের ওই টুকরো টুকরো বসতি, নদী, গাছপালা সব কতটা অচেনা লাগছে। কত তুচ্ছ, ছোট লাগছে। দূরে একদল পাহাড়ি বাচ্চা মজা করতে করতে স্কুল ইউনিফর্মে আসছে।ভাবা যায় এই দূরত্ব অতিক্রম করে রোজ স্কুল যাওয়া! পাহাড়িদের যত দেখছি তত সম্মান বাড়ছে ওদের প্রতি।
বাহাদুর দা এবার যেতে বলছে। আবার হাঁটা শুরু হবে।
বেলা ১০টা।
যেখানটায় বসে এই ডায়রি লিখছি সেখান থেকে মিটার দশেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমাদের অভীষ্ট বক্সা ফোর্ট।শেষ যেখানে ডায়রি শেষ করেছিলাম সেখান থেকে আবার হাঁটা শুরু করলাম।অন্তহীন এ হাঁটা যেন।হাঁটছি তো হাঁটছি, কত যে বাঁক, কত যে খাদ পেরোলাম তার হিসেব নেই।এমনকি একজনের বাড়ির ভেতর দিয়েও রাস্তা চলে গেছে, সেখান দিয়েও গেলাম, তাদের পাহাড়ি রঙীন ফুলের বাগানের মধ্যে দিয়ে।ভূ পৃষ্ঠ থেকে এত ওপরে, এত কষ্ট করে থাকা, তবু জীবন নিজের নিজের মত করে রঙীন এখানে।প্রতিটা বাড়ি কাঠের অথবা টিনের।কিন্তু প্রতিটা বাড়িতে একটা উঠোন থাকবেই।আর সেই উঠোনে পাহাড়ি ফুলের বাগান।কি অসম্ভব পরিচ্ছন্ন বাড়িগুলো না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।এখানে এই একবছর হল বিদ্যুৎ এসছে।তার আগে এই দুর্গম পাহাড়ে মানুষ রাতে কোন ল্যাম্পপোস্টের আলো ছাড়াই হেঁটে ফিরত, নিজে না দেখলে এ সত্য বিশ্বাস করা কঠিন। বক্সা ফোর্ট থেকে আরো পাঁচ কিলোমিটার সোজা উঠলে পাবো এখানকার সর্বোচ্চ গ্রাম, লেপচাখাঁ।পাহাড়ের এত ওপরে চার্চ রয়েছে, রয়েছে ছোট্ট একটা বাজার।কিন্তু কোন স্কুল চোখে পড়ল না।আসবার পথে আলাপ হল ইন্দ্রশঙ্কর থাপা’র সাথে।এনার এই পাহাড়ে একটি লজ আছে।অসাধারণ মানুষ।আমাদের ওনার লেখা দুটো কবিতা, আর ওনার গাওয়া দুটো গান শুনিয়ে তবেই ছাড়লেন।
এই প্রতিভা সমতল থেকে এত ওপরে রয়েছে,না এলে জানতেই পারতাম না।পাহাড়ি একটি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ওনার নেপালি উচ্চারণে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’- গান শোনাটাও একটা অভিজ্ঞতা।বলছিলেন- সব রয়েছে এখানে কিন্তু জীবন ধরণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দুটো জিনিসই এখানে নেই।হাসপাতাল আর স্কুল।ছোট খাটো চিকিৎসা এখানে কিছু হাতুড়ে ডাক্তারকে দিয়ে চলে গেলেও, বড় অসুখ কিংবা এমার্জেন্সির জন্য কাঁধে করে রুগীকে নিয়ে এই পাঁচ কিলোমিটার চড়াই উৎরাই ভেঙে তারপর ৩২কিলোমিটার দূরে আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে যেতে হয়।হাসপাতাল অবধি পৌঁছনোর আগেই বেশিরভাগ রুগী মারা যায়। বলছিলেন স্কুলের কথা।কিছুদিন আগে দুজন শিক্ষক কে পাঠিয়েছিল সরকার থেকে।কিন্তু দুজনই বদলি নিয়ে চলে যান, জয়েন করার দু মাসের মধ্যে।সেই থেকে স্কুল বন্ধ শিক্ষকের অভাবে। ইন্দ্র বাবু দেখাচ্ছিলেন কি অসম্ভব ঝুঁকির মধ্যে গোটা একটা গ্রাম বাস করছে।দূরে পাহাড়ে এক জায়গায় ধস নেমে অর্ধেক গ্রামের মানুষ নিচে তলিয়ে গেছে।যেকোন মুহূর্তে ওনাদের নিচের পাথরও সরে যেতে পারে।এই নিয়েই জীবন চলছে তার নিজস্ব উদ্দীপনায়।অয়ন জিগেস করছিল এত ঝুঁকি নিয়ে থাকাই বা কেন।নিচে নেমে যেতে পারেন তো।উনি বললেন- আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর এই পাহাড়ে ওনাদের বাস।পাথর সরে যেতে পারে জেনেও এই পাথরের প্রতি কি এক অদম্য টানে এই পাহাড়, প্রকৃতি ছেড়ে গ্রামের কেউই নিচে নামবেন না তারা। সমতলে একেই আমরা মাটির টান বলি।এও এক ভারতবর্ষ, এও এক স্বদেশ প্রীতি, যেখানে প্রাণের ভয়ও কত গৌণ হয়ে যায়।আমরা কিছু বললাম না।ওনাকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে গেলাম।কিই বা বলতাম আমরা।মৃত্যুকে রোজ আলিঙ্গন করে, অমানুষিক পরিশ্রম করে দুমুঠো চাল জোগাড়ের পরও মানুষের গলায় এত সুর, এত কবিতা আসে কি করে ভাবতেই অবাক লাগছে।
আমাদের হাঁটা আবার শুরু হল। যেতে যেতে কত শুকিয়ে যাওয়া পাহাড়ি ঝর্ণা দেখলাম, যেগুলোর রূপ বর্ষায় আবার অন্যরকম।এখানে ঝর্ণাকে ঝোরা বলে আগেই বলেছি।যাওয়ার পথে আমরা এরকম কত যে ঝোরা দেখলাম গুণে শেষ করা যাবে না।কোনটায় জল প্রায় নেই, আবার কোনটার তেজ এই গরমেও অটুট। জলোচ্ছ্বাসের প্রবল আওয়াজ এতদূর থেকে শোনা যাচ্ছে। আমি এক এক সময় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, যুগ যুগ ধরে, সৃষ্টির সেই কোন কাল থেকে এই সব ঝোরায় কোন না জানা উৎস থেকে বিরামহীন ভাবে জল স্রোত বয়ে চলেছে সব বাধা পেরিয়ে কোন এক লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে।কেউ খেয়াল রাখেনা, খবরও পৌঁছয়না সমতলে এদের এই অধ্যবসায়ের।তবু এই এক একটা ঝোরা, যেন এখানকার মানুষেরই মত। অকল্পনীয় পরিশ্রমী।অবিশ্বাস্য তেজস্বী,দুর্দমনীয়।জেদী।আমাদের হাঁটার কোন বিরাম নেই।প্রায় পৌনে দু ঘন্টা হয়ে গেল আমরা হাঁটছি। সমতলে যা কল্পনার বাইরে, পাহাড়ে আমরা তাই করছি। ঝির ঝিরে বৃষ্টিতে পাথর গুলো খুব পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে।অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে।কিন্তু বাহাদুরদা সত্যি নামে শুধু না, কাজেও বাহাদুর।ওর কোন ভ্রক্ষেপই নেই যেন পিচ্ছিল রাস্তা না শুকনো।হাঁটছে যেন,মনে হচ্ছে আমাদের কলকাতার রেড রোডে হাঁটছে।এতটাই অনায়াসে এক একটা স্টেপ ফেলছে।ভূমিপুত্র হলে যা হয় আরকি।সামনের একটা বাঁক ঘুরতেই বাহাদুরদা আঙ্গুল তুলে দেখালো-ওই যে, বক্সা ফোর্ট।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান