দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী শহর হায়দ্রাবাদকে বলা হয় মুক্তার শহর। আবার নিজামদের শহর নামেও একে উল্লেখ করা হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এই শহর ছিল রাজকীয় ঐশ্বর্য, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। কুতুব শাহী শাসন, নিজামদের দীর্ঘ শাসনকাল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও হায়দ্রাবাদ তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে। আজ এই শহর আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কেন্দ্র হলেও পুরনো শহরের অলিগলিতে এখনও ইতিহাসের গন্ধ মেলে। এখানে হায়দ্রাবাদের সেরা পাঁচটি দর্শনীয় স্থান নিয়ে আলোচনা করা হল।
১) চারমিনার
হায়দ্রাবাদের সেরা পাঁচটি দর্শনীয় স্থানের মধ্যে প্রথমেই চারমিনারের নাম উল্লেখ করতে হয়। হায়দ্রাবাদ শহরের আইকন এটা। ১৫৯১ সালে কুতুব শাহী শাসক মুহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ এটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবেই এই স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছিল। চারটি সুউচ্চ মিনার ও চারদিকের খিলানযুক্ত গঠনই এর নামের কারণ। প্রতিটি মিনারের উচ্চতা প্রায় ৫৬ মিটার। ভেতরে সরু সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা যায়। উপরের তলা থেকে পুরনো শহরের দৃশ্য দেখা যায়। চারমিনারের আশপাশে রয়েছে ব্যস্ত বাজার এলাকা। মুক্তো ও চুড়ির জন্য এই অঞ্চল বিশেষভাবে পরিচিত। দিনের আলোয় এর স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কারুকাজ চোখে পড়ে, আর সন্ধ্যায় আলো জ্বলে উঠলে এটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। চারমিনার শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, হায়দ্রাবাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। চারমিনার ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
আরও পড়ুন: হাজারদুয়ারি ভ্রমণ
২) গোলকোন্ডা দুর্গ
হায়দ্রাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হল গোলকোন্ডা দুর্গ। এই দুর্গের প্রাথমিক নির্মাণ কাকতীয় রাজাদের আমলে শুরু হলেও পরে কুতুব শাহী শাসকেরা এটিকে সম্প্রসারিত করেন। দুর্গটি পাহাড়ের উপর নির্মিত এবং এর চারপাশে রয়েছে শক্ত প্রাচীর। প্রাচীন কালে এটি ছিল সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। গোলকোন্ডা অঞ্চল একসময় হীরের বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। কোহিনূরসহ বহু ঐতিহাসিক হীরক এই অঞ্চলের খনি থেকে পাওয়া গিয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। দুর্গের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর ধ্বনিতন্ত্র। প্রবেশদ্বারের কাছে হাততালি দিলে উপরের অংশে সেই শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়। দুর্গের চূড়ায় উঠলে চারপাশের বিস্তৃত এলাকা চোখে পড়ে। সূর্যাস্তের সময় এখানকার পরিবেশ বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
৩) চৌমহল্লা প্রাসাদ
চৌমহল্লা প্রাসাদ ছিল হায়দ্রাবাদের নিজামদের আনুষ্ঠানিক বাসভবন ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। “চৌমহল্লা” শব্দের অর্থ চারটি প্রাসাদ। আঠারো ও উনিশ শতকে নির্মিত এই প্রাসাদে মুঘল, পারস্য ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব দেখা যায়। প্রাসাদের দরবার হল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাদা মার্বেলের মেঝে, উঁচু খিলান ও বিশাল ঝাড়বাতি এই হলঘরকে রাজকীয় আবহ দেয়। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সভা ও অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত। প্রাসাদের ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে নিজামদের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী, প্রাচীন গাড়ি এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র। পুরো প্রাসাদ চত্বর ঘুরলে নিজাম আমলের ঐশ্বর্য ও শাসনব্যবস্থার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। হায়দ্রাবাদের ইতিহাস বুঝতে এই স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতকে নির্মিত মন্দিরগুলোতে রয়েছে রাধা-কৃষ্ণের উপাসনা, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ছাপ। বীর হাম্বীরের সময় থেকেই বিষ্ণুপুর একটি বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, যা ভিন্নধর্মী ধর্মীয়, স্থাপত্য ও সঙ্গীতজগতের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল। ৯৯৪ সালে বিষ্ণুপুরে প্রথম দুর্গাপূজার সূচনা হয়। বিষ্ণুপুর ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
আরও পড়ুন: দার্জিলিং টয় ট্রেন ভ্রমণ
৪) হুসেন সাগর
হুসেন সাগর হ্রদ ১৫৬৩ সালে নির্মিত হয়। এটি হায়দ্রাবাদ ও সেকেন্দ্রাবাদ শহরকে সংযুক্ত করেছে। একসময় এটি পানীয় জলের প্রধান উৎস ছিল। হ্রদের মাঝখানে স্থাপিত বিশাল বুদ্ধমূর্তি বিশেষ আকর্ষণ। এই মূর্তিটি একখণ্ড পাথর দিয়ে তৈরি এবং নৌকায় করে সেখানে যাওয়া যায়। হ্রদের চারপাশে গড়ে উঠেছে বিনোদন ও অবকাশের নানা ব্যবস্থা। সন্ধ্যার সময় বহু মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। সূর্যাস্তের আলো জলে প্রতিফলিত হলে পরিবেশ শান্ত ও মনোরম হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি হুসেন সাগর হায়দ্রাবাদের আধুনিক ও সামাজিক জীবনেরও অংশ।
৫) রামোজি ফিল্ম সিটি
রামোজি ফিল্ম সিটি হায়দ্রাবাদের আধুনিক আকর্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম। এটি বিশ্বের বৃহত্তম চলচ্চিত্র স্টুডিও কমপ্লেক্সগুলির একটি হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রের সেট, উদ্যান, থিমভিত্তিক এলাকা ও বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট ভ্রমণপথ ধরে বিভিন্ন সেট ও আকর্ষণীয় স্থান দেখতে পারেন। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে একদিন কাটানোর জন্য এটি উপযুক্ত স্থান। ইতিহাসভিত্তিক শহরের মধ্যে এই আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র হায়দ্রাবাদের সমসাময়িক পরিচয় তুলে ধরে।
হায়দ্রাবাদের সেরা পাঁচটি দর্শনীয় স্থান বলতে আমরা যে পাঁচটি জায়গার কথা বললাম, সেগুলি এই শহরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রধান স্তম্ভ। চারমিনার শহরের প্রতীক, গোলকোন্ডা তার সামরিক ও বাণিজ্যিক শক্তির স্মারক, চৌমহল্লা প্রাসাদ নিজামদের রাজকীয় ঐতিহ্যের সাক্ষ্য, হুসেন সাগর নাগরিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র এবং রামোজি ফিল্ম সিটি আধুনিক বিনোদনের প্রতিচ্ছবি।
আরও পড়ুন: ভারতীয় জাদুঘর ভ্রমণ
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৬
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব সংকলন


আপনার মতামত জানান