দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ার ভোল্গা নদীর তীরে অবস্থিত স্টালিনগ্রাদ (বর্তমানে ভোল্গোগ্রাদ) দখলকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধ (Battle of Stalingrad) সংঘটিত হয়েছিল। একদিকে অ্যাডলফ হিটলার চেয়েছিলেন তাঁর শত্রু জোসেফ স্ট্যালিনের নামাঙ্কৃত শহরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে। আর অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি স্টালিনগ্রাদে নিজেদের অধিকার বজায় রাখার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। এই যুদ্ধে বোমা বর্ষণের ফলে বহু সেনা ও সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছিল। এই যুদ্ধে জার্মানির বিমান হামলাকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর বিমান হামলা বলে মনে করা হয়। স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধে পরাজয়ের পর নাৎসি বাহিনী ধীরে ধীরে পূর্ব রণাঙ্গনের (Eastern Front) উপর অধিকার হারাতে শুরু করে। এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে হিটলারের অপরাজেয় হওয়ার অহংকার চূর্ণ হয় ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তাঁর অন্যান্য বাহিনীর মনোবলে আঘাত করে। অন্যদিকে এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিত্রবাহিনী আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঐতিহাসিক স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধে একপক্ষে ছিল জার্মানি ও তাদের অক্ষশক্তির মিত্ররা আর অপরপক্ষে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
ভোল্গা নদী ইউরোপের দীর্ঘতম নদী। রাশিয়ার স্টালিনগ্রাদ শহরটি ভোল্গার তীরে অবস্থিত। রাশিয়ার গৃহযুদ্ধে জোসেফ স্ট্যালিনের অবদানকে স্বীকার করে ১৯২৫ সালে জারিৎসিন (Tsaritsyn) নামক এই শহরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্টালিনগ্রাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে এই শহর শিল্প কেন্দ্র এবং পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৩৯ সালের নাৎসি-সোভিয়েত চুক্তির শর্তাবলী অমান্য করে ১৯৪১ সালের ২২ জুন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন বারবারোসা’ শুরু করে। এই সময় হিটলার নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী স্ট্যালিনের নামাঙ্কিত এই শহরকে দখল করে সোভিয়েত মনোবল ভেঙে দিতে এবং স্ট্যালিনের মর্যাদায় আঘাত হানতে চেয়েছিলেন। এছাড়া ভোল্গা নদীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং ককেশাস অভিযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ছিল জার্মানদের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই হিটলার যেকোন মূল্যে স্টালিনগ্রাদ দখল করতে চেয়েছিলেন। এই কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উভয় পক্ষই স্টালিনগ্রাদ শহরে অধিকার কায়েম রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
হিটলার জার্মানির সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ সিক্সথ আর্মিকে স্টালিনগ্রাদ দখল করার আদেশ দেন। এই সময় জার্মান সিক্সথ আর্মির কমান্ডার ছিলেন ফ্রেডরিখ পাউলুস (Friedrich Paulus)। এর আগে এই বাহিনী ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ইউক্রেনে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান চালিয়েছিল। প্রায় সাত লক্ষ লোকের আবাসস্থল স্টালিনগ্রাদকে হিটলার একেবারে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দেন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে, এই শহরটি দখল করতে জার্মান সেনাবাহিনীর খুব বেশি দিন লাগবে না।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে জার্মানির সিক্সথ আর্মির সাথে ফোর্থ প্যাঞ্জার আর্মিরও (Fourth Panzer Army) এই অভিযানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কৌশলগত পুনর্বিন্যাস ও বাহিনীর দিক পরিবর্তনের কারণে এই আর্মির যোগ দিতে দেরি হয়। এই সময় একটি বাহিনী রাশিয়ার ককেশাসের তৈলক্ষেত্রের দিকে ও অন্য বাহিনী স্টালিনগ্রাদ দখলের জন্য এগিয়ে যায়। জার্মান সেনার এই বিভাজনের ফলে তাদের বাহিনী অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
১৯৪২ সালের ১৭ জুলাই স্টালিনগ্রাদ শহরের প্রবেশপথে জার্মান সামরিক বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মির সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৪২ সালের ২৩ আগস্ট জার্মান বিমান বাহিনী (লুফ্টওয়াফে) স্টালিনগ্রাদের উপর এক বিধ্বংসী বিমান হামলা চালায়। এই সময় সোভিয়েতের প্রায় ৩২টি জাহাজ ডুবে যায় এবং আরও নয়টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বিমান হামলায় স্টালিনগ্রাদে ১,০০০ টনেরও বোমা ফেলে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। স্টালিনগ্রাদের উপর এই বিমান হামলাটি ছিল পূর্ব ফ্রন্টে সেই সময়কার সবচেয়ে তীব্র বোমা হামলা। ২৮ জুলাই সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নেতা জোসেফ স্ট্যালিন ‘অর্ডার ২২৭’ জারি করেছিলেন। সেই সময় তিনি বার্তা দিয়েছিলেন যে ‘এক পা-ও পিছু হটা চলবে না’ (Not one step back)। স্ট্যালিন স্টালিনগ্রাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জেনারেল আন্দ্রেই ইয়েরিওমেনকোকে (Andrey Yeryomenko) দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রন্টের কমান্ডার নিযুক্ত করেছিলেন।
২৩ আগস্টের বিমান হামলার পর স্টালিনগ্রাদের নগর যুদ্ধের মূল পর্ব শুরু হয়। ১১ সেপ্টেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভাসিলি চুইকভকে (Vasily Chuikov) অতিরিক্ত সোভিয়েত ইউনিটগুলি নিয়ে গঠিত ৬২ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দিয়েছিলেন জোসেফ স্ট্যালিন। জার্মান বিমান বাহিনী ক্রমাগত বোমাবর্ষণের পর সিক্সথ আর্মির পদাতিক সেনারা স্টালিনগ্রাদ শহরের ভিতরে প্রবেশ করতে থাকে।সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসজুড়ে স্টালিনগ্রাদের ধ্বংসাবশেষে মুখোমুখি ও হাতাহাতি যুদ্ধ চলতে থাকে। শহরের ভগ্ন বিল্ডিংগুলো তখন হয়ে উঠেছিল সোভিয়েত সেনাদের এক একটি দুর্গ। সোভিয়েত বাহিনী ৮ থেকে ১০ জনে বিভক্ত হয়ে জার্মানির সেনাদের উপর আক্রমণ করে। এই ছোট দলগুলো হালকা অস্ত্র, সাব-মেশিন গান নিয়ে দ্রুত ও নিঃশব্দে ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে যাতায়াত করত। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য ছিল জার্মান বাহিনী যাতে কামান এবং বিমান হামলা করতে না পারে। ইঁদুরের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে গর্তে বা ভূগর্ভে থেকে যুদ্ধ করার কৌশলের কারণে জার্মানরা একে ইঁদুরের যুদ্ধ (Rattenkrieg বা Rat War) বলে অভিহিত করে। এই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ক্রমাগত অতিরিক্ত সেনা আসার কারণে এই লড়াই মারাত্মক আকার নেয়। এরপর ১৯৪২ সালের ১৯ নভেম্বর সোভিয়েতরা ‘অপারেশন ইউরেনাস’ (Operation Uranus) শুরু করে। তারা প্রধানত রোমানিয়ান বাহিনীর প্রতিরক্ষা ভেঙ্গে ২ লাখেরও বেশি জার্মান সেনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
রাশিয়ান অবরোধের শুরুর দিকে জার্মানরা চাইলেই অবরোধ ভেঙে পিছু হটে আসতে পারত। অন্তত জার্মান সিক্সথ আর্মির প্রধান জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলুস সেটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কোন মূল্যেই স্টালিনগ্রাদ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। পরিবর্তে তিনি সেনাবাহিনীকে রসদ সরবরাহ বাড়ানো এবং বাইরে থেকে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করার কথা বলেছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৪৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জেনারেল পাউলুসকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রমোশন দিয়ে তাঁকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন এবং অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু শীতকাল চলে আসায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শীতকাল ঐ অঞ্চলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়।
এক সময় জার্মানদের গোলাবারুদ এবং রসদ ফুরিয়ে গেলেও হিটলার বিমানের সাহায্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, অস্ত্র সরবরাহের দিতে পারেননি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে জার্মানদের দখলে থাকা বিমান ঘাঁটিগুলি সোভিয়েতের রেড আর্মি দখল করে নেওয়ার পর জার্মান সেনারা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অস্ত্র ও খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জার্মান সেনার পক্ষে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব ছিল না। অনাহার, উপযুক্ত বস্ত্র ও অস্ত্রের অভাবে একের পর এক সিক্সথ আর্মির সেনারা মারা যেতে থাকলে ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি পাউলুস আত্মসমর্পণ করেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি অবশিষ্ট জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
সমালোচকরা মনে করেন যে, গোলাবারুদ, খাবার সরঞ্জাম ও সেনার ঘাটতির পাশাপাশি হিটলারের কিছু হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে স্টালিনগ্রাদে জার্মানদের পরাজয় হয়েছিল। হিটলার স্টালিনগ্রাদ বিজয়ের ব্যাপারে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচণ্ড শীতে লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত গরম কাপড় সরবরাহের বিষয়ে আগে থেকে কোনও প্রস্তুতি ছিল না। এছাড়া রেড আর্মির অবরোধের শুরুতে যদি জেনারেল পাউলুসকে পিছু হটার অনুমতি দিত তাহলে হয়ত সিক্সথ আর্মি রক্ষা পেত। তারা আবার পরের বছর গ্রীষ্মে পুনরায় আক্রমণ করতে পারত। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও জাত্যভিমানে ভুগতে থাকা হিটলারের ভুল সিদ্ধান্ত স্টালিনগ্রাদের শুধু কয়েক লক্ষ জার্মান সেনার মৃত্যু পথকে প্রশস্ত করেনি পাশাপাশি বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয়েরও সূচনা করেছিল।
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকূলে চলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হিটলারের সবচেয়ে শক্তিশালী সিক্সথ আর্মি প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এই যুদ্ধে আনুমানিক ৪ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ জার্মান সেনাসহ অক্ষশক্তির প্রায় ৮ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ সেনা হতাহত হয়েছিল। এই যুদ্ধে ফিল্ডমার্শাল ফ্রেডরিখ পাউলুসকে বন্দী করা হয়েছিল। স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধে সোভিয়েত রেড আর্মিরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তাদের সামরিক হতাহত প্রায় ১১ থেকে ১৩ লক্ষ; বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কয়েক লক্ষ।
এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জেনারেল ভাসিলি চুইকভ ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সম্মান ‘হিরো অফ দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস মেডেল’ (Distinguished Service Medal) পান। স্ট্যালিনের বিতর্কিত রাজনৈতিক নীতি ও দমনপীড়ন সমালোচিত হলেও, নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক এই বিজয় আজও রাশিয়ায় সম্মানের সঙ্গে পালিত হয়।
জার্মান ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সম্পূর্ণ ফিল্ড আর্মি হিসেবে সিক্সথ আর্মি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই পরাজয়ের ফলে বিশ্বমঞ্চে নাৎসি বাহিনীর অপরাজেয় ভাবমূর্তি চিরতরে ভেঙে যায়। ইতালি এবং হাঙ্গেরির মতো অক্ষশক্তি মিত্র দেশগুলোর সেনাবাহিনীর বিরাট ক্ষতি হওয়ায়, হিটলারের প্রতি তাদের আস্থা ও নির্ভরতা কমে যায়। এছাড়া হিটলারের নিজের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যেও যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। স্টালিনগ্রাদের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তারা পূর্ব রণাঙ্গণে জার্মানির অগ্রগতি থামিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে বার্লিন দখল করতে এগিয়ে যায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান