ইতিহাস

মেহেরবাঈ টাটা

ভারতীয় ইতিহাসে নারী জাগরণের ও নারীবাদী আন্দোলনের উদ্‌গাতা ও পথ প্রদর্শক হিসেবে অন্যতম ব্যক্তিত্ব মেহেরবাঈ টাটা (Meherbai Tata)। সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজের সঙ্গে জড়িত মেহেরবাঈ উনিশ শতকের ভারতে এক শিক্ষিতা আদর্শ পার্সি নারীর প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন। স্যার দোরাবজি টাটার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। মেহেরবাঈ টাটার উদ্যোগেই ১৯২৯ সালে ভারতে স্থাপিত হয় ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ইণ্ডিয়ান ওমেন। এই কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা বস্তিবাসী মহিলাদের কল্যাণে কাজে নামেন। এর পাশাপাশি মেহেরবাঈ একজন দক্ষ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবেও নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তবে খেলার সময় পশ্চিমি পোশাকের বদলে শাড়ি পরতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন তিনি যা একপ্রকার ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পরিচয় দেয়। ১৯১২ সালে তিনিই প্রথম মহিলা হিসেবে আকাশপথে সফর করেন। আজও স্নাতক উত্তীর্ণ ভারতীয় দুঃস্থ মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুবিধার্থে লেডি মেহেরবাঈ টাটা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট প্রতি বছর একটি বৃত্তি প্রদান করে।

১৮৭৯ সালের ১০ অক্টোবর বম্বেতে মেহেরবাঈ টাটার জন্ম হয়। তাঁর যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তাঁর পরিবার ব্যাঙ্গালোরে চলে আসে এবং সেখানেই পাকাপাকিভাবে থাকা শুরু করে। তাঁর বাবা হোরমুসজি জাহাঙ্গীর ভাবা ছিলেন বিলেতে পড়াশোনা করা প্রথম পার্সি। পশ্চিমী  আদব-কায়দার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন ভাবা যার ফলে প্রথমে তিনি তাঁর কন্যার নাম রেখেছিলেন ‘মেরি’। পরে সেই নামের বানান পরিবর্তন করে পার্সি উচ্চারণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি তাঁর কন্যার নাম দেন ‘মেহের’। ১৮৮৪ সালে হোরমুসজি জাহাঙ্গীর ভাবাকে মহারাজা কলেজের অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত করে মহীশূরে বদলি করে দেওয়া হয়। মেহেরবাঈয়ের বোনপো ছিলেন ভারতে পরমাণু বিদ্যার জনক হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা।

বাড়িতে গুজরাতি ও প্রাথমিক ইংরেজি শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় মেহেরবাঈয়ের। তারপর তিনি ভর্তি হন বিশপ কটন স্কুলে। বাবার কাছেই মেহেরবাঈইংরেজি ও লাতিন শিখতেন। শুধু বিজ্ঞান পড়ার জন্যই তিনি কলেজে ভর্তি হন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মেহেরবাঈ। তারপরে বাবার অসাধারণ একটি লাইব্রেরিতেই পড়াশোনা করতে থাকেন তিনি। তাঁকে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে আসতেন যে মিশনারী মহিলা, তাঁর কাছেই তিনি সঙ্গীতের তালিম নেন। পরে একজন দক্ষ পিয়ানোবাদক হয়ে ওঠেন মেহেরবাঈ। মহীশূরের প্রায় প্রতিটি গণ অনুষ্ঠানে মেহেরবাঈ পিয়ানো বাজাতে শুরু করেন। ‘দ্য টাইমস অফ ইণ্ডিয়া’ সংবাদপত্রের পূর্বতন সম্পাদক স্ট্যানলি রিডের কথায় মধ্যম উচ্চতাসম্পন্ন, মোটামুটি ফর্সা মেহেরবাঈটাটা একইসঙ্গে সুশিক্ষিতা, ক্রীড়ায় দক্ষ এবং বাড়ির ঘরকন্নার কাজেও পারদর্শী ছিলেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৮৯০ সালে যখন মহীশূরের দেওয়ান শেষাদ্রি আইয়ারের আমন্ত্রণে টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা স্যার জামশেদজী টাটা মহীশূরে আসেন, সেই সময়েই ভাবা পরিবারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, আলাপও হয়। সেখানে মেহেরবাঈকে দেখেই জামশেদজী টাটা সিদ্ধান্ত নেন তাঁকে পুত্রবধূ করে ঘরে নিয়ে আসার। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র স্যার দোরাবজী টাটা যাতে নিজের পছন্দ বিচার করে তবেই তাঁর মতে সায় দেন আর তাই দোরাবজীকে মহীশূরে আসতে নির্দেশ দেন তিনি। এই ডাকে সাড়া দিয়ে দোরাবজী যখন ভাবা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন, সে সময় খাবার দিতে আসা মেহেরবাঈকে এক ঝলক দেখেই তাঁর প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। ১৮৯৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি স্যার দোরাবজী টাটার সঙ্গে মেহেরবাইয়ের বিবাহ হয়। দোরাবজীর সঙ্গে দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করতে করতে অনেক কিছু শিখছিলেন মেহেরবাঈ যা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ করে তোলে। জামশেদজী টাটার শারীরিক অবস্থার অবনতির ফলে ক্রমবর্ধমান ব্যবসার হাল ধরতে হয় দোরাবজীকে আর যে বাড়িতে তাঁরা থাকতেন সেই এসপ্ল্যানেড হাউসের আভ্যন্তরীণ সব ঘরকন্নার দায়িত্ব একা হাতে সামলাতে হয় মেহেরবাইকে। ১৯২৭ সালে স্যার দোরাবজী ও মেহেরবাঈ একত্রে ইউরোপ ও আমেরিকার বহু দেশে ভ্রমণ করেন। আমেরিকায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার এসমে হাওয়ার্ডের মধ্যস্থতায় আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কেলভিন কুলিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে তাঁদের। কানাডার গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিংডনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয় তাঁদের যার ফলে বহু আমেরিকান ক্লাবের সম্মানীয় সদস্যপদ গ্রহণ করেন। প্রথম বাঙালী মহিলা ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা ভারতের প্রথম মহিলা সংগঠন ভারত স্ত্রী মহামণ্ডলের প্রতিষ্ঠাতা সরলা দেবী চৌধুরাণীর সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাঁর।

দোরাবজী টাটা এবং মেহেরবাঈ উভয়েই আউটডোর গেমসের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। আউটডোর গেমসের মধ্যে টেনিস খেলতে খুবই ভালবাসতেন মেহেরবাঈটাটা । বহু টুর্নামেন্টে টেনিস খেলেছেন তিনি এবং ষাটটির মতো পুরস্কার অর্জন করেছেন। ওয়েস্টার্ন ইণ্ডিয়া টেনিস টুর্নামেন্টে ‘ট্রিপল ক্রাউন’ লাভ করেন মেহেরবাই। দুজনে একত্রে বহু অল-ইণ্ডিয়া চ্যাম্পিয়নশিপে সাফল্য অর্জন করেছেন। উইম্বলডন, কিসেঞ্জেন এবং বেডন-বেডনে মেহেরবাঈ টাটা টেনিস জগতের এক জনপ্রিয় নাম হয়ে ওঠেন। দর্শকদের মধ্যে মেহেরবাঈকে ঘিরে সবথেকে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি হতো কারণ তিনি পশ্চিমি পোশাকের বদলে ভারতীয় জাতীয় পোশাক শাড়ি পরে টেনিস খেলতে নামতেন। ১৯২৪ সালের প্যা রিস অলিম্পিকে মিক্সড ডাবলসে মেহেরবাঈটাটা অংশগ্রহণ করলেও শেষ তৃতীয় রাউন্ডে ওয়াক ওভার দিয়ে দেন তিনি কোন এক অজ্ঞাত কারণে।

শুধু টেনিস খেলাই নয়, একইসঙ্গে খুব ভালো ঘোড়া চালাতে পারতেন তিনি এবং নিজের গাড়ি নিজেই চালাতে শিখেছিলেন মেহেরবাঈ। এই সব গুণাবলী উনিশ শতকীয় ভারতে আপামর নারীদের মধ্যে বিরল ছিল। তাঁর সবথেকে বড় ইচ্ছা ছিল প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে আকাশে ওড়ার আর সেই ইচ্ছাই তাঁর সফল হয় ১৯১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। জেপেলিনে চড়ে তিনি কিছুক্ষণের জন্য আকাশে ওড়েন এই দিনে। ভারতীয় ইতিহাসে এই দিনটি তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়। আর্থিক সচ্ছলতা থাকায় কোনো রকম চিন্তা না করেই তিনি তাঁর শখ ও প্রাণের ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছেন। কখনো টেনিস খেলা, কখনো সঙ্গীতশিক্ষা, কখনো ভ্রমণ কিংবা থিয়েটার করা কোনো কিছুতেই কখনও প্রতিবন্ধকতা আসেনি তাঁর জীবনে। বেশিরভাগ মহিলাই হয়তো এই অবস্থায় সমাজের অভিজাত অংশের মতো এই সুবিধেগুলি যথেচ্ছভাবে উপভোগ করে এটিকেই শিরোধার্য বলে মানবেন। কিন্তু মেহেরবাঈ ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। সেকালের প্রেক্ষিতে এক উদারমনস্ক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন তিনি। তাই শুধু আত্মকেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না থেকে সমাজের অন্য সকল স্তরের নারীদের অবস্থার কথা চিন্তা করেছেন তিনি।

তিনিই ভারতে প্রথম ‘বম্বে প্রেসিডেন্সি ওমেন্স কাউন্সিল’ এবং ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ওমেন’ নামে দুটি নারীহিতকারী সংস্থা গড়ে তোলেন। বাল্য বিবাহ বন্ধ করার লক্ষ্যে পাশ হওয়া ‘সারদা আইন’-এর সপক্ষে কথা বলেন মেহেরবাই। পর্দা প্রথা এবং অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা করে নারীশিক্ষার ব্যাপারে প্রথম তিনি সোচ্চারে কথা বলেন ভারতে। তাঁর স্বামী স্যার দোরাবের সহায়তায় স্থানীয় স্কুলকে অধিগ্রহণ করে সেখানে নারীশিক্ষার একটি আদর্শ স্কুল নির্মাণ করেন মেহেরবাঈটাটা। ভারতে নারীশিক্ষার সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান বিচার করার জন্য তিনি ইংল্যাণ্ডকে একজন দক্ষ ব্যক্তিকে আহ্বান জানান যিনি দীর্ঘ এক বছর ধরে সমীক্ষা চালিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এই প্রতিবেদনটি পরে ‘ভাডে মেকাম’ নামে একটি বইয়ের আকারে প্রকাশিত হয় যা হোয়াইট হলের বোর্ড অফ এডুকেশনে ভারতে নারীশিক্ষার বিস্তারের ভারপ্রাপ্ত সকল শিক্ষিকাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

ব্যাটল ক্রিক কলেজেই তিনি প্রথম জনসমক্ষে ভারতের তৎকালীন অবস্থার প্রসঙ্গে একটি সামগ্রিক বক্তব্য রাখেন। ভারতের ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, জাতি, ভারতীয় রাজ্যসমূহ এবং সেগুলির শাসক, ভারতের নারীসমাজ, তাদের অবহেলিত অবস্থা, অশিক্ষা ইত্যাদি সকল বিষয় সম্পর্কে একটি প্রস্তাবনা মেহেরবাঈ তাঁর আমেরিকান শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন। সেই বক্তব্যে তিনি এও বলেন যে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো নারীরা এখানে স্বাধীনতা পায় না, নারীর সার্বিক উন্নতির পথ এই দেশে সুগম নয়। নারীর শিক্ষাব্যবস্থার কথা বর্ণনা করা যায় না। ইণ্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির সদস্য ছিলেন মেহেরবাই। যুদ্ধের সময়ে তাঁর সেবাকর্মে আত্মবলিদানের স্বীকৃতি হিসেবে রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁকে ‘কমাণ্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ পদে অভিষিক্ত করেন। ১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে বম্বেতে অনুষ্ঠিত ‘অল ইণ্ডিয়া ওমেন্স কনফারেন্স’-এ তাঁকে ‘চেয়ারম্যান অফ দ্য রিসেপশন কমিটি’ পদে নিযুক্ত করা হয়। এই সভায় যে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন মেহেরবাঈ তাতে ফুটে ওঠে ভারতে নারীর বেড়ে ওঠা ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পক্ষে প্রধান প্রতিবন্ধকতার দিকগুলি।

১৯৩১ সালের ১৮ জুন নর্থ ওয়েলসে লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নার্সিংহোমে চিকিৎসা চলাকালীনই লেডি মেহেরবাঈ টাটার মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও