পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম প্রধান তথা বৃহত্তম জেলা বর্ধমান। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবেও পরিচিত বর্ধমান। শুধু মিহিদানা আর সীতাভোগের জন্যেই নয়, বর্ধমানের খ্যাতির পিছনে রয়েছে এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ও ইতিহাস। বলা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে নাকি এই বর্ধমান জনপদের উৎপত্তি হয়েছিল। সেকালের রাঢ় বাংলার প্রধান অঞ্চল ছিল এটি। ব্রিটিশ আমলে এই জনপদ জেলা সদর দপ্তর হিসেবেও পরিচিত ছিল। আজ কৃষি-উৎপাদনে বর্ধমানের এমন উন্নতি হয়েছে যে তাকে পশ্চিমবঙ্গের ধানের গোলা বলা হয়। সবদিক থেকে উৎকর্ষময় বর্ধমান জেলার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে আজও কিন্তু বিতর্কের সমাধান হয়নি। নানা মুনির নানা মত চলছে আজও।
মগধের রাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজসভার বিখ্যাত গ্রিক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিস গঙ্গারিডি নামে এক জনপদের উল্লেখ করেছেন তাঁর বইতে যা আজকে বাংলার রাঢ় দেশ নামে পরিচিত। ‘গঙ্গারিডি’ কথার অর্থ হল- গঙ্গা রাঢ় অর্থাৎ গঙ্গা তীরবর্তী রাঢ় দেশ। এই রাঢ় একসময় প্রবল পরাক্রান্ত ও সমৃদ্ধি সম্পন্ন ছিল। বর্তমানে উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ় একে অপরকে যেখানে ছেদ করেছে সেখান দিয়ে অজয় নদী প্রবাহিত। অনেকে মনে করেন আগে এই জায়গায় দামােদর প্রবাহিত হত। বিষ্ণুপুরাণের একটি শ্লোকে বলা হচ্ছে –
‘উত্তরম যৎ শিলাবত্যাঃ
অজয়াস্যচৈব দক্ষিণম্
ভাগীরথ্যাঃ পশ্চিমায়াং তু
দ্বারকেশ্বরম্ চ্ পূর্বস্যাম্
জনপদং তদ্ বর্দ্ধমান নাম।
রাঢ়ী যত্র সন্ততিঃ ।।’
অর্থাৎ উত্তরে যার শিলাবতী, দক্ষিণে যার অজয় নদ, পশ্চিমে রয়েছে ভাগীরথী এবং পূর্বে রয়েছে দ্বারকেশ্বর, রাঢ় দেশের সেই জনপদের নামই হল বর্ধমান। শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করলে দেখা যাবে ‘বৃধ্’ ধাতুর সঙ্গে ‘শানচ্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে এই ‘বর্ধমান’ শব্দটি তৈরি হয়েছে। এর অর্থ হল যার বৃদ্ধি আছে।
বর্ধমানের ইতিহাস শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দ তথা মেসোলিথিক বা প্রস্তর যুগের একেবারে শেষ সময়ে। গলসি থানার কাছে অবস্থিত মল্লসরুল গ্রামে খননকার্যের ফলে ষষ্ঠ শতকের যে তাম্রলিপি পাওয়া গেছে তাতেই ‘বর্ধমান’ নামটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘বর্ধমান‘ নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। একটি মত অনুসারে জৈন আচরঙ্গ সূত্রে উল্লিখিত সুহ্মভূমিই হল আজকের বর্ধমান। আবার অনেকে বলেন বর্ধমানের নামের সঙ্গে জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমানের একটি সম্পর্ক আছে। ড. পঞ্চানন মণ্ডলের মতে উজুবালিয়া নদীর তীরে মহাবীর অর্হৎ (নির্বাণের অধিকারী যে জৈন সন্ন্যাসী) বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন। এখানকার একটি গ্রাম ‘বডােয়া-আস্থা’ই ‘অস্থিক গ্রাম’ নামে তৎকালীন সময়ে প্রচলিত ছিল। ড. গােপীকান্ত কোঙার তাঁর ‘বর্ধমান জেলার মেলা’ গ্রন্থে ড. পঞ্চানন মণ্ডলের মত উদ্ধৃত করে বলেছেন যে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে অস্ট্রিক বীর যাযাবর ডোম, বােডাে ইত্যাদি জাতির লোকেরা বর্ধমানে বাস করতে। বর্ধমান আসলে নাকি ‘বােডােডােমন’ বা ‘ব্রডমন’ কথার সংস্কৃতরূপ। আবার পরাণচাঁদ কাপুর নামে একজন কবি মহারাজ তেজচন্দ্রের স্তুতি করতে গিয়ে তার ‘হরিহরমঙ্গল কাব্য’-এ বলেছেন যে মহারাজের রাজত্বকালে এই জনপদেই গুণী-মানীদের সম্মান বৃদ্ধি পায় আর সেই বর্ধিত মান থেকেই সম্ভবত বর্ধমান নামের উৎপত্তি। মহাবীর যে বর্ধমানে এসেছিলেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া সীমান্তে জৈন ধর্মাবলম্বী শরাক জাতি বসবাস করে যা অ্আসলে মহাবীর জৈনের আগমনের তথ্যকেই সমর্থন করে। বর্ধমানের সাত দেউলিয়া গ্রামে মহাবীর তীর্থঙ্করের অনেক মূর্তি পাওয়া গেছে। এখানে প্রাপ্ত একটি প্রস্তর খণ্ডে মহাবীরের ১৫০টি মূর্তি খোদিত অবস্থায় দেখা যায়। কল্পসূত্রানুসারে মহাবীর তেরো বছর বয়সে ঋজু পালিকা বা উজুবালিয়া নদীর তীরে কৈবল্য লাভ করেন। কল্পসূত্র মতে উজুবালিয়া হল বাস্তবে দামোদরের উপনদী বরাকর। বাবলা-ডিহি শঙ্করপুরের নেংটাশ্বর মূর্তি যে আসলে জৈনদের তীর্থঙ্কর মূর্তি একথা অনেকেই মনে করেন। তবে অন্য একটি মত অনুসারে মহাবীরকে এদেশের লােক মোটেও ভাল চোখে নেয়নি। তাই তার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়। জৈনদের আচারঙ্গসূত্র গ্রন্থ অনুযায়ী মহাবীর যখন পথহীন লাঢ়, বজ্জভূমি ও সুহ্মভূমিতে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন এই সব দেশের অধিবাসীরা তাকে আক্রমণ করেছিল। মহাবীরের আবির্ভাবকাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক। পণ্ডিতদের মতে আচারঙ্গসূত্রের লাঢ়, বজ্জভূমি ও সুহ্মভূমি আসলে প্রাচীন বাংলার রাঢ়, বরেন্দ্রভূমি ও সুবর্ণভূমি অঞ্চল।
অন্য একটি মত অনুযায়ী বর্ধমান গাঙ্গেয় উপত্যকায় আর্য সভ্যতার বিকাশের সময়ে, উন্নতি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। সম্রাট আকবর বাংলা সুবাকে উনিশটি সরকারে ভাগ করেন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য। ‘আইন-ই-আকবরী’ বইতে বর্ধমান জেলার সঙ্গে সম্পর্কিত পৃথক পৃথক তিনটি সরকারের নাম পাওয়া যায় যার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল শরিফাবাদ। ‘শরিফ’ শব্দের অর্থ হল সম্ভ্রান্ত। তাই এ থেকে স্পষ্টই বোঝা গেল যে এই এলাকাটি ছিল অপেক্ষাকৃত সম্ভ্রান্ত অঞ্চল। পরে আবার বর্ধমানেরই নাম হয় শরিফাবাদ। বর্ধমানের প্রথম মহারাজাধিরাজ ছিলেন রাজা তিলকচাঁদ। তাঁদের বংশের অন্যতম রাজারা হলেন প্রতাপচাঁদ ও মহতাবচাঁদ।
এভাবেই জনশ্রুতি আর সম্ভাব্য ইতিহাসের মিশেলে গড়ে উঠেছে রাঢ়ের মধ্যমণি বর্ধমানের নামকরণের ইতিহাস। বিতর্ক থাকলেও আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে বর্ধমান নাম ঠিক কীভাবে হল সে সম্পর্কে আরও বিশদে জানার অবকাশ পাওয়া যাবে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- এককড়ি চট্টোপাধ্যায়, ‘বর্ধমান জেলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি’, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮
- https://www.getbengal.com/
- https://archive.org/
- https://www.bardhamanonline.in/


আপনার মতামত জানান