ইতিহাস

বর্ধমান নাম হল কিভাবে

পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলার মধ্যে  বর্ধমান একটি অন্যতম জেলা।বর্ধমান  পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার জেলাসদর পশ্চিমবঙ্গের মহানগর ও একটি প্রাচীন শহর।পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর৷

এই জেলার নাম 'বর্ধমান' কিভাবে হল  সেই প্রসঙ্গে  বেশ কিছু মত প্রচলিত আছে।

উত্তরম যৎ শিলাবত্যাঃ
অজয়াস্যচৈব দক্ষিণম্
ভাগীরথ্যাঃ পশ্চিমায়াং তু
দ্বারকেশ্বরম্ চ্ পূর্বস্যাম্
জনপদং তদ্ বর্দ্ধমান  নাম।
রাঢ়ী যত্র সন্ততিঃ ॥

মগধ রাজ চন্দ্রগুপ্তের রাজসভার বিখ্যাত গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিস গঙ্গারিডি নামে এক জনপদের উল্লেখ করেছেন যা আজকে বাংলার রাঢ় দেশ নামে পরিচিত। গঙ্গারিডি কথার অর্থ হল-  গঙ্গা রাঢ় অর্থাৎ গঙ্গা তীরবর্তী রাঢ় দেশ। এই রাঢ় একসময় প্রবল পরাক্রান্ত ও সমৃদ্ধি সম্পন্ন ছিল। বর্তমানে উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ় একে অপরকে যেখানে ছেদ করেছে সেখান দিয়ে অজয় নদী প্রবাহিত। অনেকে মনে করেন আগে এই জায়গায় দামােদর প্রবাহিত হত।

বর্ধমানের ইতিহাস শুরু খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সন তথা মেসোলিথিক বা প্রস্তর যুগের শেষ সময়ে। Burdwan নামটি ইংরেজদের দেওয়া যা মূল সংস্কৃত শব্দ 'বর্ধমান' থেকে নেওয়া।গলসি থানার কাছে অবস্থিত "মল্লসরুল" গ্রামে পাওয়া ষষ্ঠ শতকের একটি তাম্রলিপিতে 'বর্ধমান' নামটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।

বর্ধমান নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে।একটি মত অনুসারে জৈন আচরঙ্গ সূত্রে উল্লিখিত সুহ্মভূমিই হল আজকের বর্ধমান। আবার অনেকে বলেন বর্ধমানের নামের সঙ্গে জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমানের একটি সম্পর্ক আছে।ডঃ  পঞ্চানন মণ্ডল মহাশয়ের মতে উজুবালিয়া নদীর তীরে মহাবীর অর্হৎ (নির্বাণের অধিকারী যে  জৈন সন্ন্যাসী) বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন। এখানকার একটি গ্রাম 'বডােয়া-আস্থা'-ই  “অস্থিক গ্রাম” নামে তৎকালীন সময়ে প্রচলিত ছিল।ডঃ গােপীকান্ত কোঙার তাঁর “বর্ধমান জেলার মেলা” গ্রন্থে ডঃ পঞ্চানন মণ্ডলের মত উদ্ধৃত করে বলেছেন “খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে অস্ট্রিকবীর যাযাবর ডোম, বােডাে ইত্যাদি জাতির লোকেরা বর্ধমানে বাস করতো। বর্ধমান হল ‘বােডােডােমন’ বা ‘ব্রডমন' কথার সংস্কৃতরূপ।"  আবার মহারাজ তেজচন্দ্রের স্তাবকতা করে পরাণচাঁদ কাপুর তার “হরিহর মঙ্গল কাব্য"-তে  বলেছেন মহারাজের রাজত্বকালে গুণীমানীদের সম্মান বৃদ্ধি পায় আর সেই বর্ধিত মান থেকেই  বর্ধমান নামের উৎপত্তি। মহাবীর যে বর্ধমানে এসেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।  বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া সীমান্তে জৈন ধর্মাবলম্বী শরাক জাতির বাস এই তথ্যকে সমর্থন করে।বর্ধমানের সাত দেউলিয়া গ্রামের মহাবীর তীর্থঙ্করের অনেক মূর্তি পাওয়া গেছে।এখানে প্রাপ্ত একটি প্রস্তর খন্ডে মহাবীরের ১৫০টি মূর্তি খোদিত অবস্থায় দেখা যায়।কল্প সূত্রানুসারে মহাবীর তের বছর বয়সে  ঋজু পালিকা বা উজুবালিয়া নদীর তীরে কৈবল্য লাভ করেন। কল্পসূত্র মতে উজুবালিয়া হল দামোদরের উপনদী বরাকর।বাবলা-ডিহি শঙ্করপুরের নেংটাশ্বর মূর্তি যে আসলে জৈনদের তীর্থঙ্কর মূর্তি একথা অনেকেই মনে করেন।তবে অন্য একটি মত অনুসারে  মহাবীরকে এদেশের লােক মোটেও ভাল চোখে নেয় নি।তাই তার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয় । জৈনদের আচারঙ্গসূত্র গ্রন্থ অনুযায়ী মহাবীর যখন পথহীন লাঢ়, বজ্জভূমি ও সুহ্মভূমিতে প্রচার উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন এই সব দেশের অধিবাসীরা তাকে আক্রমণ করেছিল। মহাবীরের আবির্ভাব কাল খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক।পণ্ডিতদের মতে আচারঙ্গসুত্রের লাঢ়, বনভূমি ও শুভ ভূমি যথাক্রমে রাঢ়, বজ্রভূমি ও সুহ্মভূমি নিয়েই  দক্ষিণ রাঢ় গঠিত । তাই যদি হয় তাহলে বলতে হয় মহাবীর এ অঞ্চলে সম্প্রদায় বা কৌম বিশেষের কাছে ভাল ব্যবহার পাননি।

অন্য একটি মত অনুযায়ী বর্ধমান গাঙ্গেয় উপত্যকায় আর্য সভ্যতার বিকাশের সময়ে, উন্নতি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। সম্রাট আকবর বাংলা সুবাকে উনিশটি সরকারে ভাগ করেন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য। আইন-ই-আকবরী অনুযায়ী বর্ধমান জেলার সঙ্গে সম্পর্কিত যে তিনটি সরকারের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে একটি হল শরিফাবাদ। শরিফ শব্দের অর্থ সম্ভ্রান্ত। সেই অর্থে এই এলাকাটি ছিল অপেক্ষাকৃত সম্ভ্রান্ত অঞ্চল। পরে বর্ধমানের নাম হয় শরিফাবাদ।বীরভূমের দক্ষিণাংশ, মুর্শিবাদ জেলার কান্দি আর বর্ধমান জেলার মধ্য অংশ জুড়ে বিস্তৃত  ছিল এই শরিফাবাদ। রাজা তিলকচাঁদ ছিলেন বর্ধমানের প্রথম মহারাজধিরাজ। তাদের বংশের অন্যতম রাজারা হলেন প্রতাপচাঁদ ও মহতাবচাঁদ। ব্রিটিশ আমলে রানী বেনদেয়ী তাঁর দেওয়ান বনবিহারীর পুত্র বিজনবিহারীকে দত্তক নিয়ে বিজয়চাঁদ নাম দিয়ে বর্ধমানের সিংহাসনে বসান।

বর্ধমান তার নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সেই ‘ক্যালকোলিথিক’ সভ্যতার যুগ থেকে এগিয়ে চলেছে কালের ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে।এ ধারা চলমান ও বর্ধমান, “সর্বেষাং বর্ধনানিত্যং বর্ধমান মতাে বিদুঃ।”

তথ্যসূত্র


  1.  https://bn.wikipedia.org/
  2. https://www.sangbadpratidin.in/bengal/jain-community-opposes-name-change-of-burdwan-station/
  3. বর্ধমান জেলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি ঃ এককড়ি চট্টোপাধ্যায়ঃ প্রথম খণ্ডঃ পৃষ্ঠা ৮

২ Comments

২ Comments

  1. অরবিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়​

    আগস্ট ২, ২০১৯ at ১:২৭ অপরাহ্ণ

    আমার যতদূর মনে পড়ে, বহুকাল আগে বলাই দেবশর্মা-প্রতিষ্ঠিত বর্ধমানের বহুল প্রচারিত (অধুনালুপ্ত) সাপ্তাহিক "আর্য" পত্রিকার কোন এক শারদীয়া সংখ্যায় ডক্টর জীবেন্দ্রকুমার সিংহরায়ের একটি লেখায় দেখেছিলাম--গ্ৰীকদের ভারত অভিযানের সঙ্গে এবং তাদের দেওয়া "ব্রোডোমন" নামের সঙ্গে আমাদের বর্ধমান জেলার নামকরণের গভীর সম্বন্ধ আছে। জীবেন্দ্রবাবুর লেখায় একথারও উল্লেখ দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে যে, এই অঞ্চলে গ্ৰীকদের বসতি/রাজ্য ছিল, তাদেরই দেওয়া "ব্রোডোমন"নাম থেকে আজকের এই নাম। গবেষক এবং পন্ডিত মানুষেরা এব্যাপারে আলোকসম্পাত করলে ভালো হয়।
    প্রসঙ্গত জানাই, বলাই দেবশর্মার লেখা "বর্ধমানের ইতিহাস", শারদীয়া আর্য পত্রিকার প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের সমস্ত সংখ্যা, আরও বহু দুষ্প্রাপ্য গ্ৰন্থরাজির সঙ্গে আমি ২০১৩ সালে চেন্নাই ত্যাগ করার আগে পন্ডিচেরীর (এখন পুদুচেরী) শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমের গ্ৰন্থাগারের হাতে তুলে দিই। ফলে, এখন আমি সেসব বহুমূল্য এবং দুষ্প্রাপ্য বই-এর সাহায্য থেকে বঞ্চিত।

  2. সববাংলায়

    আগস্ট ২, ২০১৯ at ৪:০৪ অপরাহ্ণ

    আপনার মত পাঠক পাওয়া সত্যিই গর্বের বিষয়। আপনাকে অনুরোধ করব, আম্রা যে ধরনের তথ্য ভিত্তিক লেখা প্রকাশ করি সেই ধরনের লেখা পাঠিয়ে আমাদের এই প্রচেষ্টাকে সফল করে তুলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!