সববাংলায়

প্রথম বাঙালি পেশাদার মহিলা ফোটোগ্রাফার

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই পর্দানসীন হিন্দু মহিলাদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। স্ত্রীশিক্ষার প্রসারের ফলে শিক্ষিত মহিলারা নিজের নিজের পথ অনেকেই বেছে নিয়েছিলেন উপার্জনের জন্য। পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেসময় বঙ্গনারীরাও এগিয়ে আসছিলেন স্ব-প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে। ফলে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় কখনো শিক্ষাবিভাগে, কখনো পটচিত্র অঙ্কনে, কখনো মেডিকেল কলেজে ধাত্রীবিদ্যার বিভাগে বাঙালি নারীদের যোগদান বাড়ছিল। এই সময়েই অভাবিতভাবে ফোটোগ্রাফির চর্চাতেও বাঙালি নারীর অবদান লক্ষ করা যায়। আর সেই প্রসঙ্গেই প্রথম বাঙালি মহিলা ফোটোগ্রাফার হিসেবে জানা যায় ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের তৃতীয় স্ত্রী মনোমোহিনীর কথা। তিনিই প্রথম ফোটোগ্রাফি চর্চায় হাত মক্‌শো করেন। কিন্তু পেশাদারিভাবে ফোটোগ্রাফিকে বেছে নেওয়ার দুঃসাহস প্রথম দেখিয়েছিলেন সরোজিনী ঘোষ। তাই সরোজিনী ঘোষকেই প্রথম বাঙালি পেশাদার মহিলা ফোটোগ্রাফার বলা হয়ে থাকে। আর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে এই একইভাবে ফোটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আরেক বাঙালি মহিলা – অন্নপূর্ণা দত্ত। চলুন জেনে নিই এই দুই বাঙালি পেশাদারি মহিলা ফোটোগ্রাফারের সম্পর্কে।

ইতিহাসে সময়কালের বিচারে সরোজিনী ঘোষকেই প্রথম বাঙালি পেশাদার মহিলা ফোটোগ্রাফার (first professional bengali female photographers) বলা হয়। তাঁর জন্মবৃত্তান্ত বা বড়ো হয়ে ওঠার কোনো তথ্যই সেভাবে বাঙালি মননে সঞ্চিত নেই। ফোটোগ্রাফির স্টুডিও খুলে ছবি তোলার কাজে সরোজিনী ঘোষই ছিলেন প্রথম পথিকৃৎ। তাঁর কথা প্রথম বাঙালি জানতে পারে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি তারিখে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশিত ‘লেডি ফোটোগ্রাফার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন থেকে। সেখান থেকেই জানা যায় যে ৩২ নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটে ‘মহিলা আর্ট স্টুডিও’ নামে একটি স্টুডিও খুলেছিলেন সরোজিনী ঘোষ। সেই স্টুডিও থেকে কিছুদিনের মধ্যেই সিল্কের উপর ফোটো তৈরির ব্যবস্থা চালু করেন তিনি এবং অমৃতবাজার পত্রিকায় তাঁর ফোটো ‘ফিনিশ’ করার দক্ষতা সম্পর্কে যথেষ্ট প্রশংসা করা হয়েছিল। ফোটোগ্রাফির কাজে যে সব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয় সেগুলিও বিক্রি করতেন সরোজিনী ঘোষ।

এরপরে উল্লেখযোগ্য ভাবেই বলতে হয় অন্নপূর্ণা দত্তের কথা। ১৮৯৪ সালের জন্ম হয় অন্নপূর্ণা দত্তের। তাঁর বাবা অম্বিকাচরণ মিত্র দর্শনের অধ্যাপনা করতেন। অনেক অল্প বয়সে বিবাহ হয়ে যায় অন্নপূর্ণা দত্তের। নিতান্ত শখের বশেই ফোটোগ্রাফি শিখেছিলেন তিনি আর সেই শিক্ষাই তাঁর পেশা নির্ধারণ করে দিল। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সাংসারিক অর্থকষ্ট দূর করার জন্য অন্নপূর্ণা দত্ত নিজেই পেশাদারিভাবে ফোটোগ্রাফি করা শুরু করেন। তবে সরোজিনী ঘোষের মতো তাঁর নিজের কোনো স্টুডিও ছিল না, নিজের বাড়িতে থেকেই তিনি সব কাজ করতেন। বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে ছবি তোলার জন্য তাঁর ডাক আসতো। একাধারে ছবি তোলা, ছবি ডেভেলপ করা, ছবি প্রিন্ট করিয়ে তা ফিনিশ করা সর্বত্র অন্নপূর্ণা দত্তের দক্ষতা এবং সুনাম ছিল বিদ্যমান। সেসময় ভারতের নাইটিঙ্গেল বলা হতো যাঁকে সেই সরোজিনী নাইডুর একটি ছবি তুলেছিলেন তিনি। তাছাড়া কবি জসীমউদ্দিন, রাজনীতিবিদ হাসান সুহ্‌রাবর্দী, গায়ক আব্বাসউদ্দিন প্রত্যেকেই অন্নপূর্ণা দেবীর প্রশংসা করেছেন।

সরোজিনী ঘোষ এবং অন্নপূর্ণা দত্তের পরে সেভাবে কোনো বাঙালি মহিলাই আর পেশাদারিভাবে ফোটোগ্রাফি চর্চা করেননি। চঞ্চলাবালা দাসী, মীরা চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী বা অন্নপূর্ণা গোস্বামীদের নাম জানা যায় ইতিহাসে বাঙালি মহিলা ফোটোগ্রাফার হিসেবে। এদের প্রত্যেকের স্বীয় অবদান থাকলেও পেশাদারি জগতের বাইরেই এরা ফোটোগ্রাফির চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু সরোজিনী দেবী এবং অন্নপূর্ণা দেবী পেশাদারি ফোটোগ্রাফির সূচনা করলেও ইতিহাসবিস্মৃত বাঙালির মননে তাঁদের স্থান খুবই নগণ্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading