সববাংলায়

কার্তিককে কেন চিরকুমার বলা হয়

দুর্গার পুত্র হিসেবে আমরা ময়ূরবাহন কার্তিককে চিনি। শিব ও পার্বতীর পুত্র কার্তিক বা কুমার কার্তিকেয় হলেন যুদ্ধের দেবতা, তাঁর ছয়টি মাথা। তিনি আবার স্বর্গের দেবতাদের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দেবসেনাপতি উপাধিতে ভূষিত হন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি কার্তিক হলেন চিরকুমার, অবিবাহিত। আজও পাড়াঘরের বহু মানুষ অবিবাহিত যুবককে ঠাট্টার সুরে ‘আইবুড়ো কার্তিক’ বলে থাকেন। কিন্তু কার্তিক কী সত্যিই বিয়ে করেননি? দেবতাদের মধ্যে একমাত্র তাঁকে নিয়েই কেন এমন কিংবদন্তী প্রচারিত হল? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে বলা আছে, তারকাসুরকে বধ করার উদ্দেশ্যে কার্তিকের জন্ম হয়। দৈবী বরে তারকাসুর কেবল শিব এবং দুর্গার পুত্রের দ্বারাই বধ্য হতে পারেন বলে প্রচারিত হয়। ফলে নিজেকে অজেয় মনে করে দেবলোকে প্রবল সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে শুরু করেন সেই তারকাসুর। এই দুর্দিনে দেবতারা মিলিত হয়ে মহামায়াকে নির্দেশ দেন হিমালয়ের কন্যা পার্বতী রূপে জন্মগ্রহণ করতে। পার্বতী আবার শিবের মতো পুত্রলাভের আশায় শিবের তপস্যায় রত হলেন। এই সময় পার্বতী নির্জলা উপবাস পালন করেন, একটি পাতাও তিনি মুখে দেননি। তাই পার্বতীর অপর নাম হয় অপর্ণা। শিব পার্বতীর তপস্যায় সন্তুষ্ট হন। ইতিমধ্যে দেবতাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী শিবের ধ্যানভঙ্গ হওয়া মাত্র মদনদেবের ছোঁড়া পঞ্চবাণে শিবের মধ্যে কাম জাগ্রত হয় এবং পার্বতীর সঙ্গে তিনি মিলিত হন। শিব ও শক্তিরূপিনী পার্বতীর মিলনের ফলে এক ভীষণ তেজোদীপ্ত অগ্নিপিণ্ডের উৎপত্তি ঘটে যার তেজ অগ্নিদেব, গঙ্গা কেউই সহ্য করে না পেরে তাকে এক বনের মধ্যে ছয়জন কৃত্তিকার গর্ভে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর ফলেই ছয়টি মাথাবিশিষ্ট কার্তিকের জন্ম হয়। দেবসেনাপতি নিযুক্ত হয়ে ছয়দিন ধরে যুদ্ধ করে তিনি তারকাসুরকে বধ করেন। যদিও এই কাহিনীরও বিশেষ বিশেষ রূপভেদ রয়েছে। কৃত্তিকার গর্ভে জন্ম হয় বলে তাঁর নাম হয় কার্তিক। স্কন্দ পুরাণে কার্তিকের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাভারতের কাহিনীতেও কার্তিককে ‘স্কন্দ’ নামেই অভিহিত করা হয়েছে। যে ছয়জন কৃত্তিকার কাছে তিনি লালিত-পালিত হয়েছিলেন তারা ছিলেন ঋষিপত্নী এবং কৃত্তিকাদের সঙ্গে পরপুরুষের সম্পর্ক আছে সন্দেহ করে ঋষিরা তাঁদের তাড়িয়ে দেন। মায়ের সম্মান অর্জনের জন্য কার্তিক অনুর্ধ্ব ষোল বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের নানাবিধ অনিষ্ট করতে বলেন এবং অপদেবতাদের গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করার আদেশ দেন। এমতাবস্থায় সন্তানাদি না হওয়ায় শোকে জর্জরিত হয়ে পড়েন মর্ত্যবাসী। এই সময়েই কার্তিকের পুজো করে পুত্রসন্তান প্রাপ্তির কথা প্রচারিত হয়ে যায়। সন্তান কামনায় এবং সন্তানের মঙ্গল প্রার্থনায় কার্তিক সেই থেকেই ঘরে ঘরে পূজ্য হয়ে ওঠেন। তাই হিন্দুদের কাছে কার্তিক হল উর্বরতার প্রতীক।

যুদ্ধের দেবতা কার্তিক চিরকুমার অর্থাৎ তিনি অবিবাহিত, একথা আমরা অনেকেই শুনেছি। অনেকেই মনে করেন এই কারণেই তাঁকে কুমার কার্তিক বলেও ডাকা হয়। কিন্তু বিভিন্ন পুরাণের ব্যাখ্যায় বলা আছে ‘কুমার’ শব্দটির মধ্যে ‘কু’ কথার অর্থ হল খারাপ আর ‘মার’ কথার অর্থ হল সৌন্দর্য। অর্থাৎ এই কুমারের অর্থ হল কন্দর্পকান্তি, অবিবাহিত নয়। তবে কার্তিকের চিরকুমার স্বভাব কেন হল তাই নিয়ে লোকশ্রুতিতে একটি সুন্দর কাহিনী আছে। দানবদের পরাজিত করে বাড়ি ফেরার সময় এক অনিন্দ্যসুন্দর নারী উষার সঙ্গে কার্তিকের দেখা হয় এবং সেই দেবকন্যাকে কার্তিক বিবাহ করতে চান। ইতিমধ্যে এই বিবাহের ব্যাপারে তাঁর মায়ের মত আছে কিনা তা জানা দরকার মনে করে উষাকে একটি বীজক্ষেত্রে দাঁড় করিয়ে রেখে কার্তিক তাঁর মা দুর্গার কাছে অনুমতি চাইতে যান। দুর্গা এই কথা শুনে মুখে সম্মতি জানালেন। আর সম্মতি পেয়ে কার্তিক মহানন্দে বরের সাজে উষাকে বিবাহ করার জন্য ছুটে গেলেন সেই বীজক্ষেত্রে। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে হল বিবাহের আগে মাকে প্রণাম করতেই তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। ফলে আবার ফিরে এলেন তিনি দুর্গার কাছে। আর তখনই তিনি দেখেন একটা আস্ত মহিষ কাঁচা কাঁচাই খেয়ে নিচ্ছেন তাঁর মা। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে কার্তিক বিস্মিত হলেন এবং দুর্গাকে এহেন আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে দুর্গা বলেন, কার্তিকের বিয়ের পর বউ ঘরে এলে তাঁকে যদি আর ভালোমতো খেতে না দেন, তাই আগে ভাগে খেয়ে রাখছেন তিনি। এই কথা শুনে কার্তিক প্রতিজ্ঞা করেন তিনি আর কখনোই বিয়ে করবেন না। এদিকে কার্তিকের অপেক্ষায় উষা সেই বীজক্ষেতেই দাঁড়িয়ে থাকেন। কার্তিক আর বিয়ে করতে যাননি সেখানে। পরে যখন উষা সমস্ত ঘটনা জানতে পারেন, তখন তিনিও প্রতিজ্ঞা করেন সেই বীজক্ষেতেই তিনি আজীবন অপেক্ষা করে থাকবেন। কার্তিকের প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পেরে এই মুখ কারো কাছে দেখাতে চান না তিনি। তাই তিনি ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকতে চান। এই জন্য আজও কার্তিক মাসে আমন ধান ওঠে আর মানুষের বিশ্বাসে এই আমন ধানের শীষই হল উষা। এরপর থেকেই কার্তিক এবং উষা উভয়েই অবিবাহিত থাকেন।

আবার কোথাও কোথাও বলা হয়েছে যে কার্তিকের পত্নী হলেন ষষ্ঠী দেবী। স্কন্দপুরাণে বলা আছে, কার্তিকের দুই স্ত্রী রয়েছে – প্রথমজন ইন্দ্রের বোন দেবসেনা এবং দ্বিতীয়জন ভল্লি। দক্ষিণ ভারতে যাকে দেবসেনা রূপে কল্পনা করা হয়, তাঁকেই পূর্ব ভারতে এবং বঙ্গদেশে দেবী ষষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। কার্তিকের স্ত্রী ষষ্ঠীদেবী জন্ম ও জন্মসূত্রের দেবী এবং অন্যদিকে কার্তিকের যোদ্ধা মনোভাবের কারণে বলিষ্ঠ ও সুন্দর সন্তান পাবার আশায় কার্তিক পূজিত হন। সন্তানহীন দম্পতিরা তাই কার্তিক মাসে এই পুজো করে থাকেন। ফলে কার্তিককে চিরকুমার বলার পিছনে যেমন জনশ্রুতি রয়েছে, তেমনই বহু পুরাণে তাঁর বিয়ের প্রসঙ্গও রয়েছে। তাই কার্তিকের কৌমার্য নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দ্বিমত থাকবেই।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading