প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশে কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। সমগ্র বিশ্বে পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল বিশ্ব বেতার দিবস (World Radio Day)।
প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কোর উদ্যোগে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় বিশ্ব বেতার দিবস। কালজয়ী বেতার মাধ্যমের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা প্রচার করতেই মূলত এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়। বিশ্ব জুড়ে তথ্য প্রচার, নেটওয়ার্কিং এবং যোগাযোগ বাড়াতে সাধারণ মানুষ এবং সংবাদমাধ্যম যাতে বেতারের ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয় সে ব্যাপারে উৎসাহিত করাও এই বিশেষ দিনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই মাধ্যমটি যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রভূত অবদান রেখেছে এবং সহস্রাধিক শ্রোতার চাহিদা অনুযায়ী বিবর্তিত হয়েছে সময়ান্তরে তা উদ্যাপন করা জন্য এই দিনটি পালন করা হয়।
বেতার মাধ্যম মানুষকে তথ্য জানায়, তাদের রূপান্তরিত করে এবং সকলকে একসূত্রে গ্রথিত করে। পরিবর্তনের স্বার্থে এই মাধ্যমটি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে, সকল সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে পারে। অন্য যে কোনো সম্প্রচার মাধ্যমের থেকে বেতার মাধ্যম বহুদিন ধরে মানুষ ব্যবহার করছে। অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি মানুষ এই মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। প্রতি বছরই এই বিশেষ দিনটি উপলক্ষ্যে পৃথিবীর দুর্গম অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায়গুলিতে কীভাবে এই মাধ্যমকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায় এবং ধীরে ধীরে এই মাধ্যমের প্রসার ঘটানো যায় তা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বছরের পর বছর ধরে সঠিক সময়ে তথ্য সরবরাহ, সাধারণ মানুষের নানা ঘটনা সম্প্রচার এবং দূরবর্তী শিক্ষা ও বিনোদনের সমস্ত উপকরণ সরবরাহ করে এসেছে এই বেতার মাধ্যম। ঐতিহ্যবাহী এবং উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে একটা সেতুবন্ধন করে এই বেতার মাধ্যম অন্যান্য নানা সরঞ্জামের সাহায্যে পডকাস্ট বা মাল্টিমিডিয়া ওয়েবসাইটের সাহায্যে উপভোক্তাদের চাহিদা নিবারণ করেছে। সম্প্রতি কোভিড মহামারীর বিস্তারের পটভূমিতে সামাজিক মাধ্যমে যে বিস্তর ভুয়ো খবর ছড়ায় তার বিরোধিতা করে বেতার মাধ্যমই একমাত্র সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য মানুষকে পৌঁছে দিয়েছে। আজও বহু মানুষ অন্যান্য যে কোনো মাধ্যমের তুলনায় এই বেতার মাধ্যমের সংবাদকেই বেশি প্রাধান্য দেয় এবং বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে।
ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে তোলে। সেই দিক থেকে বেতার যে কোনো স্থানে ইন্টারনেট কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলেও শোনা সম্ভব। এই মাধ্যম একইসঙ্গে বৈচিত্র্যময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। ২০১০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্পেনীয় বেতার অ্যাকাডেমি ইউনেস্কো-র কার্যনির্বাহী বোর্ডকে বিশ্ব বেতার দিবস উদ্যাপনের ব্যাপারে একটি পদক্ষেপ নিতে বলে। ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কোর কার্যনির্বাহী বোর্ড এই প্রস্তাবটি নিয়ে একটি অস্থায়ী অ্যাজেন্ডা তৈরি করে।
ঐ বছর সম্প্রচারক সংস্থা, রাষ্ট্রসংঘের নানা এজেন্সি, অর্থ জোগানকারী সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ইউনেস্কো-র স্থায়ী সদস্য এবং জাতীয় কমিশনগুলির সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে প্রায় ৯১ শতাংশের সম্মতি নথিবদ্ধ করে। এই প্রকল্পে সম্মতি জানায় আরব স্টেটস ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন, এশিয়া-প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়ন অফ ব্রডকাস্টিং, ক্যারিবিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্রডকাস্টিং, নর্থ আমেরিকান ব্রডকাস্টারস অ্যাসোসিয়েশন, বিবিসি, ইউআরটিআই (URTI), ভ্যাটিক্যান রেডিও ইত্যাদি। এভাবে ইউনেস্কোর ৩৬তম সাধারণ সম্মেলনে স্থির হয় প্রত্যেক বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে বিশ্ব বেতার দিবস পালন করা হবে।
১৯৪৬ সালে এই দিনেই ‘রাষ্ট্রসংঘ বেতার’ স্থাপিত হয়েছিল। ইউনেস্কো এই আলোচনায় রাষ্ট্রসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং এতদুপলক্ষে ইউনেস্কোর ডিরেক্টর-জেনারেল আলোচনাসভার সমস্ত সিদ্ধান্তগুলি রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেলকে জানান যাতে করে সাধারণ পরিষদে বিশ্ব বেতার দিবস সংক্রান্ত সমস্ত আলোচনা শুরু হয়, এই দিনটি পালনের ব্যাপারে যাবতীয় পরিকল্পনাও গৃহীত হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্ব বেতার দিবস পালনের ঘোষণাকে অনুমোদন দেয়। এই বিশেষ দিনটিকে ঘিরে পরামর্শদান, ঘোষণা এবং উদ্যাপনের সমস্ত বিষয়টি পরিচালনার ভার রয়েছে ইউনেস্কোর মাধ্যম উন্নয়ন মন্ত্রকের প্রধান মির্তা লরেন্সোর উপর।
২০১২ সালে প্রথম বিশ্ব বেতার দিবসের উদ্যাপনে লন্ডনে একটি সেমিনার আয়োজিত হয়। এই সেমিনারে ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের বহু ব্যবহারজীবি, সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং শিক্ষাবিদেরা যোগ দিয়েছিলেন যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুন্নত সম্প্রদায়গুলির মধ্যেও বেতার মাধ্যমকে সম্প্রসারিত করা যায়। ঐ বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব বেতার দিবস পালন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে বিজ্ঞানী মার্কনি এই পিসা শহরকেই আন্তর্মহাদেশীয় বেতার স্টেশন নির্মাণের জন্য বেছে নিয়েছিলেন প্রথম ইতালীয় শহর হিসেবে।
গুগলিয়েলমো মার্কনিই প্রথম বেতার আবিষ্কার করেছিলেন। যদিও এ নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে কারণ ভারতের বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুও পরীক্ষাগারে বেতার তরঙ্গের পরীক্ষা করেছিলেন। ১৯২৩ সালে বম্বের রেডিও ক্লাব ভারতে প্রথম বেতার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। ২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর নিয়মিত এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে সমগ্র বিশ্বে। ২০১৭ সালে এই বিশেষ দিনটি পালনের ক্ষেত্রে বেতারের সঙ্গে যাতে সাধারণ শ্রোতাও নানা অনুষ্ঠানে, সমীক্ষায় অংশ নিতে পারে সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্ব বেতার দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য
- ২০২৫ – বেতার এবং জলবায়ু পরিবর্তন(Radio and Climate Change)
- ২০২৪ – বেতার : তথ্য, বিনোদন এবং শিক্ষার এক শতাব্দী (Radio: A century informing, entertaining and educating)
- ২০২৩ – বেতার ও শান্তি (Radio and Peace)
- ২০২২ – বেতার সাংবাদিকতায় আস্থা স্থাপন, বিশ্বাস এবং ব্যবহার, বিশ্বাস এবং কার্যকারিতা (Radio and Trust)
- ২০২১ – নতুন বিশ্ব, নতুন বেতার – বিবর্তন, আবিষ্কার এবং সংযোগ (New World, New Radio – Evolution, Innovation, Connection)
- ২০২০ – মূল থিম ছিল ‘বেতার ও বৈচিত্র্য’। তবে এই বছর তিনটি উপ-প্রতিপাদ্য (Sub Theme) নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন – বহুত্ববাদের প্রচার করা, নিউজরুমে বিভিন্ন সমাজ ও গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উৎসাহিত করা এবং শ্রোতাদের বৈচিত্র্যকে মাথায় রেখে সম্পাদনা ও সম্প্রচারের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য নির্ধারণ করা।
- ২০১৯ – কথোপকথন, সহনশীলতা এবং শান্তি
- ২০১৮ – বেতার ও ক্রীড়া (Radio and Sports)
- ২০১৭ – বেতার আসলে তুমি (Radio is You)
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান