সাম্প্রতিক কালে নারী প্রগতির আলো থেকে প্রায় কোনও দেশই আর বঞ্চিত নেই। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যোগ দিচ্ছেন সমান মর্যাদায়। কিন্তু এর পাশাপাশি বহু স্থানে কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে নারীদের। নারীর সুরক্ষা আদায়ের লড়াইতে এই যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ এক অন্যতম লক্ষ্য। ১৯৯৭ সালে রাজস্থানে এমনই একটি যৌন হেনস্থার মামলাকে ঘিরে সমগ্র ভারত আলোড়িত হয়েছিল যার নাম বিশাখা বনাম রাজস্থান মামলা (Vishakha and others vs. State of Rajasthan Case)। শুধু ভারত নয়, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বা হেনস্থা সমগ্র বিশ্বেই একটি জ্বলন্ত সমস্যা। তবে এখনও পর্যন্ত পুরুষের তুলনায় নারীদের উপর যৌন হেনস্থার হার বেশি সমগ্র বিশ্বে। বিশাখা বনাম রাজস্থান মামলার পরেই ভারত সরকার আইন প্রণয়ন করে কর্মস্থলে নারীর যৌন হেনস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
১৯৯৭ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হয় বিশাখা বনাম রাজস্থান মামলা। নয়না কাপুর নামের এক মহিলা সমাজকর্মী এবং তাঁর অন্যান্য সহকর্মীদের একত্রে গঠিত ‘বিশাখা’ নামের সংগঠনটি রাজস্থান সরকারের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছিল যা আদপে একটি জনস্বার্থ মামলা ছিল। রাজস্থানের এক সমাজকর্মী ভানওয়ারি দেবীর হয়ে দায়ের করা এই মামলায় বাদীপক্ষ হিসেবে বিশাখা গোষ্ঠীর মূল বক্তব্য ছিল ভারতে মহিলা কর্মীদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করা।
১৯৮৫ সালে রাজস্থানের ভাটেরি গ্রামের ভানওয়ারি দেবী নামে এক মহিলা রাজস্থান সরকারের অধীনে নারী উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করতে শুরু করেছিলেন। সেখানে একজন ‘সাথিন’ অর্থাৎ বন্ধু হিসেবে তিনি কাজ করতেন। তাঁর চাকরির কর্তব্য অনুসারে ১৯৮৭ সালে পার্শ্ববর্তী গ্রামে এক মহিলার উপর ধর্ষণের চেষ্টার একটি ঘটনাকে নিয়ে কাজ করছিলেন ভানওয়ারি দেবী। ঐ গ্রামের সকল সদস্য ভানওয়ারি দেবীর কাজে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৯২ সালে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সরকারি প্রচারমূলক প্রকল্পের অধীনেও কাজ করতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু এই প্রচারমূলক কাজটি গ্রামবাসীরা কেউই সমর্থন করেননি , এমনকি মান্যতাও দেননি। গ্রামবাসীরা সকলেই জানতেন যে বাল্যবিবাহ আদপে একটি আইন-বিরুদ্ধ কাজ। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারের প্রচারমূলক কাজকে অস্বীকার করেন তারা। গ্রামের একটি পরিবারে বাল্য বিবাহের আয়োজনও করা হয়েছিল। সেই পরিবারের কর্তা রাম চরণ গুর্জর তাঁর নাবালিকা কন্যার বিবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। ভানওয়ারি দেবী সেই পরিবারকে নানাভাবে এই কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেন কারণ সেটাই তাঁর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু কোনওভাবেই তাঁর এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। সেই পরিবার মেয়েটির বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ১৯৯২ সালের ৫ মে সেই এলাকার পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট এবং সাব-ডিভিশনাল অফিসার গ্রামে আসেন এবং সেই নাবালিকার বিয়ে বন্ধ করে দেন। পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পরের দিন সেই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় আবার, পুলিশ তা জেনেও আর কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। গ্রামবাসীরা ক্রমে বুঝতে পারে যে ভানওয়ারি দেবীর কারণেই সেদিন বিবাহ আসরে পুলিশ এসেছিল। এই কারণে গ্রামে ভানওয়ারি দেবী ও তার পরিবারকে বয়কট করা হয় এবং ভানওয়ারি দেবীর চাকরিটিও চলে যায়। ২২ সেপ্টেম্বর রাতে গুর্জর পরিবারের চারজন সহ মোট পাঁচ জনের একটি দল একত্রে ভানওয়ারি দেবীর স্বামীকে আক্রমণ করে এবং ভানওয়ারি দেবীকে গণধর্ষণ করে। সেই চারজনের নাম ছিল যথাক্রমে রামসুখ গুর্জর, গ্যার্সা গুর্জর, রামকরণ গুর্জর এবং বদ্রি গুর্জর। এছাড়া অন্য আরেকজন যিনি ছিলেন তার নাম ছিল শ্রবণ শর্মা। এই ঘটনার তৎক্ষণাৎ তদন্ত করতে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করে, সম্ভাব্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সমস্ত প্রকারে অভিযোগ দায়ের করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকে পুলিশ। বহু চেষ্টা ও নিন্দা-মন্তব্য সহ্য করার পরে ভানওয়ারি দেবী একটি অভিযোগ দায়ের করতে সফল হন। ডাক্তারি পরীক্ষাতেও দেরি করা হয়, অদ্ভুতভাবে পরীক্ষক তার প্রতিবেদনের কোথাও ধর্ষণের চিহ্নের কথা উল্লেখই করেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রমাণের অভাবে এবং স্থানীয় এমএলএ-র মদতে আদালতে বেকসুর খালাস পেয়ে যায় সকল অভিযুক্তরা। এই খালাস পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নারী-সংগঠনের কর্মীরা মিলে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। এভাবে তারা সকলে মিলে একটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের করে। ‘বিশাখা’ নামের একটি গোষ্ঠী থেকেই এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৫, ১৯ এবং ২১ নং ধারার অধীনে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের জন্য এই মামলাটি দায়ের করা হয়। কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতেও এই গোষ্ঠী মামলাটি দায়ের করেছিল।
১৯৯৭ সালের ১৩ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট বিশাখা বনাম রাজস্থান মামলা সংক্রান্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে যেখানে প্রথম ‘বিশাখা নির্দেশিকা’ শিরোনামে কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়টি অপসারিত করতে কিছু কড়া পদক্ষেপ ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যৌন হয়রানির সমস্যাটিকে প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট আইনবিধি পাস না হওয়া পর্যন্ত আদালতের আদেশক্রমে এই বিশাখা নির্দেশিকাই কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়। পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে এই নির্দেশিকার উপর ভিত্তি করেই ‘কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা নিবারণ, নিষিদ্ধকরণ এবং প্রতিবিধানমূলক আইন, ২০১৩’ পাস হয়। নিয়োগকারী সংস্থার উপর এই আইনবলে মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ভার দেওয়া হয়। এই আইনের ভিত্তিতে সংগঠিত ও সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী, গবেষক, গার্হস্থ্য শ্রমিক সকলেই অভিযোগ জানাতে পারেন। আইনের ধারায় কর্মক্ষেত্রের নির্দিষ্ট পরিবহনকেও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়েছে। বিচারপতিরা বিশদে এই নির্দেশিকায় যৌন হেনস্থার সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। দৈহিক স্পর্শ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণকেই এখানে মূলত যৌন হেনস্থা বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। যৌন মিলনের অনুরোধ, যৌন উস্কানিমূলক মন্তব্য, অশ্লীল বই, ছবি বা ভিডিও দেখানো কিংবা অবাঞ্ছিত দৈহিক, মানসিক ও মৌখিক যৌন ইঙ্গিতের ব্যবহার সবক্ষেত্রেই তা যৌন হেনস্থা বলেই ধার্য হবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে কর্মস্থলে পদোন্নতি আটকে দেওয়া, চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে কোনও সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি মহিলা কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাছাড়া কর্মস্থলে মহিলা কর্মীর জন্য আতঙ্ক বা অসম্মানজনক পরিস্থিতি তৈরি করা, অপমানজনক ব্যবহার করা ইত্যাদির বিরোধিতাও করতে পারেন মহিলা কর্মীরা এই বিশেষ আইনের বলে। ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ভারতে চালু হয় যৌন হেনস্থা আইন (Sexual Harrasment Act)। এই আইনের ধারায় মূলত যা বলা হয়েছে তা হল-
- নিয়োগকারী সংস্থাকে মহিলা কর্মীদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি যৌন হেনস্থা অভিযোগ কমিটি গড়ে তুলতে হবে এবং নিয়োগকারী সংস্থা যদি উপযুক্ত ক্ষেত্রে মহিলা কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে সংস্থাকে জরিমানাও দিতে হতে পারে।
- যিনি হেনস্থার শিকার হয়েছেন তাঁকে সেই কমিটির কাছে ঘটনার তিন মাসের মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং অভিযোগকারিনীর অক্ষতায় কমিটির কোনও সদস্য তাঁর হয়ে তাঁর বয়ানে অভিযোগ জমা নিতে পারেন।
- যৌন হেনস্থার কারণে মহিলা কর্মীর মৃত্যু বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে আইনত তাঁর উত্তরাধিকারী এক্ষেত্রে তাঁর হয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন।
- তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুই মাসে মধ্যেই নিয়োগকারী সংস্থাকে এ ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
- তিন মাসের মধ্যেই এইসব ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ করে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আইনে।
- তবে একইসঙ্গে এও বলা হয়েছে যে তদন্ত চলাকালীন যদি অভিযোগকারিনীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রে তিনিও সার্ভিস রুল অনুযায়ী শাস্তি পাবেন।
বিশাখা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে অনেকসময় যিনি হেনস্থার শিকার হয়েছেন, নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে তিনি হয়তো মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠে লিখিত অভিযোগ জমা করতেই পারলেন না। এমনকি সেই সাহসও অনেকের থাকে না। এসব ক্ষেত্রে দেরি হলে পুলিশও এফ আই আর (FIR) দায়ের করতে অস্বীকার করেন। সেই নির্দেশিকায় অভিযোগ জমা দেওয়ার জন্য একটি সময়ের ব্যবধানের কথা উল্লেখ আছে ঠিকই, কিন্তু তার পাশাপাশি এও উল্লেখ করা আছে যে ঐ নির্দিষ্ট সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই যে মহিলা কর্মীকে অভিযোগ জমা করতে হবে তা যুক্তিসঙ্গত নয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান