আমাদের বর্তমান জীবনে ফাস্টফুড এক অপরিহার্য সঙ্গী। চিকিৎসকরা যতই ফাস্ট ফুডের ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সতর্ক করুক আমাদের চটজলদি আর জিভে জল আনা স্বাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে লোভ সামলানো সত্যিই মুশকিল হয়ে যায়। ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি ডোমিনোস এর মত বহুজাতিক সংস্থাগুলির এক একটি আইটেম যেন আমাদের জিভের স্বাদটাই পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা বহুজাতিক এই সংস্থাগুলির আমাদের দেশে আগমনের অনেক আগে থেকেই ভারতবাসীকে ফাস্টফুডের স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন এক ভারতীয়। তিনি দীপক নিরুলা (Dipak Nirula)।
দিল্লিতে ১৯৭৭ সালে ভাই ললিতের সঙ্গে যৌথভাবে ভারতের প্রথম ফাস্টফুড আউটলেটটি খোলেন তিনি যার নাম দেন ‘নিরুলা’স। সেই প্রথম ভারতবাসী দেখলো খাবার অর্ডার দিলেই, চোখের পলকে তা ক্রেতাদের সামনে এসে হাজির হয়। অপেক্ষা শব্দটার কোন প্রবেশাধিকার নেই এই রেস্তোরাঁতে। দিল্লিতে সে-সময় তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল’ এই রেস্তোরাঁ।১৯৭৪ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্টে স্নাতক ডিগ্রিলাভের পর ভারতে এসে প্রথম ভারতীয় ফাস্টফুড রেস্তোরা ‘নিরুলা’স’ এর আইডিয়াটি মাথায় আসে তাঁর। অবশ্য একপ্রকার বংশগতভাবেই একেবারে অন্যধরণের রেস্তোরাঁ খোলার আইডিয়াটি পেয়েছিলেন দীপক। ১৯৩৪ সালে দীপকের কাকা লক্ষ্মী চাঁদ নিরুলা এবং বাবা মদন গোপাল নিরুলা মিলে দিল্লির কনট প্লেসে ১২ কক্ষ ও একটি রেস্তোরাঁ ও একটি বার সহ ‘হোটেল ইন্ডিয়া’ নামের একটি হোটেল খোলেন। ১৯৪০-এর দশকে নিরুলা ভাইয়েরা তাঁদের রেস্তোরাঁতে ভারতীয় কফির পাশাপাশি প্রথমবার দিল্লীতে এসপ্রেসো কফির প্রচলন শুরু করেন।
বংশের সেই ধারাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান দীপক নিরুলা তাঁর ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর মাধ্যমে। বিদেশে পড়াশোনা করার সুবাদে ফাস্টফুড সংস্কৃতির সঙ্গে ভালোমত পরিচয় ছিল তাঁর। ভারত তখনো মুক্ত অর্থনীতির সাথে পরিচিত হয়নি। বিদেশের এই চটজলদি খাবারের সংস্কৃতিটি তখনো তার নাগালের বাইরে। ফলত ভারতে সে-সময় তাঁর প্রতিযোগীও ছিল না কোন। তবে শুধু দ্রুত পরিষেবাই নয়, নিরুলা’স এর আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল তাঁর খাবারের অভিনবত্ব। ১৯৮০ এর দশকের সেই সময়ে দাঁড়িয়ে দীপক নিরুলা মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে ভারতীয়দের হাতে তুলে দিলেন পিৎজা, বার্গার, হট চকোলেট ফাজ, ফুটলং এবং একটি সম্পূর্ণ আলাদা আইসক্রিম পার্লার ২১টি স্বাদের আইসক্রিম সহ। নিরুলার রেস্তরাঁর মাটন হ্যামবার্গার সেই সময়ে দিল্লীতে আগত আমেরিকানদের ভীষণ প্রিয় ছিল। ভারতীয় হিন্দুদের কথা মাথায় রেখেই হ্যামবার্গারে গরুর মাংসের বদলে শূকরের মাংস আবার কখনওবা ভেড়ার মাংস ব্যবহার করা হত।স্কুল পড়ুয়াদের কাছে নিরুলা’স এর খ্যাতি সেই সময় আকাশছোঁয়া ছিল। অবশ্য এর কারণও ছিল। ফাইনাল পরীক্ষায় যত শতাংশ নম্বর পাবে কোন ছাত্র তার সমস্ত বিলের ওপর তত শতাংশ ছাড়। স্কুল পড়ুয়ারা তাই তাদের পরীক্ষার সাফল্য এই নিরুলা’স এ এসে উদযাপন করত। ৯০ শতাংশের ওপর নম্বর পেলে ফুল স্কুপ হট চকলেট ফাজ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাথে মার্কশিটে ‘নিরুলা’স স্কলার’ স্ট্যাম্প সেই সময় সাফল্যের মুকুটে অতিরিক্ত একটি পালক ছিল।
সেই দীপক নিরুলা ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর প্রয়াত হলেন সাথে রেখে গেলেন তাঁর কিংবদন্তি সৃষ্টি নিরুলা’স।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান