সববাংলায়

অনুকূল ঠাকুর

অনুকূল ঠাকুর (Anukul thakur ) বা শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র  একজন বিখ্যাত বাঙালি হিন্দু ধর্মগুরু যিনি সৎসঙ্গ  নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। ধর্মগুরু হিসেবে তিনি সুপরিচিত হলেও একাধারে তিনি ছিলেন একজন কবি, দার্শনিক ও চিকিৎসক। অধুনা ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে তিনি বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলার হিমায়তপুর গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে অনুকূল ঠাকুরের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী । তাঁর বাবার নাম শিবচন্দ্র চক্রবর্তী ও মায়ের নাম মনমোহিনী দেবী। তাঁর মা ছিলেন উত্তর ভারতের সাধক শ্রীশ্রী হুজুর মহারাজের শিষ্যা। বড় হওয়ার পর অনুকূল ঠাকুর মায়ের কাছেই দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। ১৯০৬ সালে আঠারো বছর বয়সে পাবনার ধোপাদহ গ্রামের রামগোপাল ভট্টাচার্যের এগারো বছর বয়সী কন্যা সরসীবালার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীকালে সর্বমঙ্গলাদেবীর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল। 

ছোট থেকেই অনুকূলচন্দ্র তাঁর বয়সী আর পাঁচজন শিশুর থেকে আলাদা ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। আবার একই সঙ্গে তিনি সেই বয়সেই আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন।  এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।  অনুকূল তখন বেশ ছোট।  তাঁর মা একবার তাঁকে  ঘরে রেখে তাঁর পড়শির বাড়ি এক সদ্যজাত শিশুকে দেখতে বেরোচ্ছেন এমন সময় অনুকূলচন্দ্র মাকে ডেকে বলেন ঐ শিশুকে দেখতে গিয়ে কোন লাভ নেই কারণ ঐ শিশু কিছুদিনের মধ্যেই মারা যাবে। শেষ পর্যন্ত জন্মের আঠারো দিনের মাথায় ঐ শিশুর মৃত্যু হয়। 

শোনা যায় একবার এক আয়ুর্বেদ চিকিৎসক বিষাক্ত গাছের শিকড়ের রস থেকে তৈরি কিছু বড়ি রোদে শুকোতে দিয়েছিলেন।  বালক অনুকূলচন্দ্র খেলতে খেলতে কিছু বড়ি মাড়িয়ে ফেলেন সেই সাথে কিছু বড়ি আবার গিলেও ফেলেন।  অনুকূলচন্দ্রের এই কান্ড দেখে চিকিৎসক অত্যন্ত ভয় পেয়ে যান কারণ ঐ বিষাক্ত বড়ির একটিই যথেষ্ট কোন ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে যান যখন তিনি দেখেন বালক অনুকূলচন্দ্র সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং তাঁর শরীরে কোথাও কোন অস্বাভাবিকতার লক্ষণ পর্যন্ত নেই।  

অনুকূলচন্দ্রের বিজ্ঞানী মানসিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি অসাধারণ ঘটনায়। অনুকূলচন্দ্রের শৈশবে লেখালিখির জন্য বাংলার গ্রামে দোয়াত কলম ব্যবহারের চল ছিল। ফাউন্টেন পেন পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে আবিষ্কার হয়ে গেলেও ভারতের সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল সেই পেন।  কিন্তু অনুকূলচন্দ্র এই দোয়াত কলম ব্যবহারের বাইরে আরও সহজ কোন উপায়ে লেখার কথা চিন্তা করছিলেন।  এই চিন্তা করতে করতেই একদিন দোয়াত কলমের মধ্যে লম্বা ফুটো করে কালি ঢেলে দিলেন। কিন্তু কলম দিয়ে কোন কালি বেরোলো না। তিনি এবার কলমের মুখের কাছে একটি ছোট ফুটো করতেই কালি বেরিয়ে এল।  এবার সেই কালির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওই ছোট ফুটোর মুখে একটি পিন বসিয়ে দেন যার ফলে কালি প্রবাহের গতি অনেকটাই কমে গেল। বাংলার এক অখ্যাত গ্রামের এক প্রান্তে বসে বালক অনুকূল তাঁর এই নিজস্ব আবিষ্কারটি করেছিলেন।   

১৮৯৩ সালে হিমায়তপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অনুকূল ঠাকুরের শিক্ষা জীবন শুরু হয়।  পরে ১৮৯৮ সালে পাবনা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।  এরপর কিছুদিন অমিতাবাদের রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। পরে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। প্রবেশিকা পরীক্ষার সময় তাঁর এক দুঃস্থ সহপাঠী পরীক্ষার ফি জমা দিতে পারছে না শুনে অনুকূলচন্দ্র নিজের পরীক্ষার জন্য জমানো টাকা সেই বন্ধুকে দিয়ে দেন পরীক্ষার ফি দেওয়ার জন্য।  ফলত তাঁর আর প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।  সেখান থেকেই হোমিওপ্যাথিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন।

তবে কলকাতার মেডিকেল কলেজের শিক্ষা জীবন ছিল ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবন সংগ্রামের সময়। বাবা অসুস্থ থাকায় সংসারে আর্থিক টানাপোড়েনে জর্জরিত হয়ে পড়েন তিনি। কিছু উপার্জনের আশায় প্রতিদিন আড়াই মাইল হেঁটে শহরে মুড়ি বিক্রি করতে যেতেন এবং সেই উপার্জিত অর্থ দিয়ে বাবার জন্য ওষুধ ও খাবার কিনতেন। 

অনুকূলচন্দ্রের  অমায়িক ব্যবহারে খুশি হয়ে স্থানীয় চিকিৎসক হেমন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় ওষুধপূর্ণ একটি ডাক্তারী বাক্স তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। অনুকূলচন্দ্র সেই ওষুধের মাধ্যমেই স্থানীয় মানুষদের চিকিৎসা শুরু করেন। হিমায়তপুরেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। 

চিকিৎসক হিসেবে অনুকূল শারীরিক রোগের থেকে বেশি মানসিক রোগকে গুরুত্ব দিতেন। মানুষের আত্মিক উন্নতির জন্য সমাজের অবহেলিত মানুষদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন কীর্তনের দল। ক্রমে ক্রমে শিক্ষিত ও সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষেরাও তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর ভক্ত হয়ে ওঠেন। এক সময় তাঁর ভক্তরা তাঁকে ‘ঠাকুর’ নামে  সম্বোধন শুরু করলে তিনি অনুকূলচন্দ্র থেকে অনুকূল ঠাকুর হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। 

যত সময় যেতে লাগল ততই বুঝতে পারছিলেন তিনি কীর্তন মনের প্রসার ঘটালেও সেই অবস্থাকে চিরস্থায়ী করতে পারে না। তিনি অনুভব করলেন মনের স্থায়ী উন্নতি ঘটাতে প্রয়োজন ঈশ্বর নাম ভজন ও সৎ সঙ্গ। তিনি দীক্ষা দেওয়া শুরু করলেন। অনন্ত মহারাজ, কিশোরী মোহন দাস এবং সতীশচন্দ্র গোস্বামী ছিলেন তাঁর প্রথম তিন শিষ্য।  অন্তরাত্মার শুদ্ধি, সৎকর্ম এবং দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের সার্বিক উন্নতির চেষ্টার  লক্ষ্যে তিনি হিমায়তপুরে প্রতিষ্ঠা করলেন সৎসঙ্গ আন্দোলন। এই আন্দোলন পরে প্রতিষ্ঠানের রূপ নেয়।  ১৮৬০ সালের ভারতীয় সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইনের অধীনে সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যালয় দেওঘরে অবস্থিত। 

ব্যক্তি জীবনে অনুকূল ঠাকুর ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার ও মিষ্টভাষী। বন্ধু মহলেও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। ‘প্রভু’, ‘অনুকূল রাজা ভাই’ ইত্যাদি নাম তাঁর বন্ধুরা তাঁকে সম্বোধন করত।  স্কুলে পড়াকালীন সময় থেকেই তিনি বেশ কিছু ছোট নাটক লিখেছিলেন। এছাড়াও বেশ কিছু গান ও কবিতাও তিনি লিখেছিলেন যেগুলি তাঁর গ্রন্থ ‘দেবযানী ও অনন্য’তে সংকলিত হয়েছে। ১৯১০ সালে অনুকূল ঠাকুর তাঁর বন্ধু অতুলচন্দ্র ভট্টাচার্যকে জীবনে চলার জন্য বেশ কিছু নীতি বাক্য সম্বলিত চিঠি লেখেন যেগুলিকে একত্র করে ১৯১৮ সালে  ‘সত্যানুসরণ’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত  হয়। 

১৯১৪ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে কীর্তন করতে করতে তিনি ভাবের ঘোরে চলে যেতেন। এই ঘোরে থাকাকালীন তিনি বেশ কিছু উপদেশবাণী দিতেন। তাঁকে ঘিরে থাকা তাঁর ভক্তবৃন্দ সেই বাণী লিখিত আকারে সংগ্রহ করতে থাকে।  এই ভাবে প্রায় একাত্তর দিন ধরে সংগ্রহ করা তাঁর বাণী পরবর্তীকালে ‘পুণ্যপুঁথি’ নামে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। 

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ছেচল্লিশটি যার বেশিরভাগই নীতিশিক্ষা সম্পর্কিত। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ হল – ‘অনুশ্রুতি’, ‘সত্যানুসরণ’, ‘চলার সাথী’, ‘বিবাহ বিধায় না’, ‘সমাজ সন্দীপন’ ইত্যাদি।

১৯৬৯ সালের ২৭ জানুয়ারি দেওঘরে তাঁর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading