সববাংলায়

বদ্রীনাথ মন্দির ।। বদ্রীনারায়ণ মন্দির

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের চামোলি জেলার অন্তর্গত পাহাড়ী শহর বদ্রীনাথে অলকানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত বদ্রীনাথ বা বদ্রীনারায়ণ মন্দির হিন্দুদের পবিত্র চারধামের মধ্যে একটি ধাম। অন্য তিনটি ধাম হল জগন্নাথধাম, রামেশ্বরম ও দ্বারকা। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী শ্রীবিষ্ণু রামেশ্বরমে স্নান করে বদ্রীনাথে ধ্যান করেন, তারপর জগন্নাথধামে খাবার খেয়ে দ্বারকায় বিশ্রাম করেন। বদ্রীনাথ তীর্থের নাম স্থানীয় গাছ বদরী (কুল গাছ) থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।

মূলত বিষ্ণু মন্দির হওয়ায় বৈষ্ণবদের কাছে এই বদ্রীনাথ মন্দির পবিত্র তীর্থভূমি। উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ে অবস্থিত সাতটি হিন্দু মন্দিরের সমন্বয় যা সপ্ত বদ্রী নামে পরিচিত, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হল বদ্রীনাথ মন্দির। উত্তর ভারতে এই মন্দির অবস্থিত হলেও এখানকার প্রধান পূজারীরা কিন্তু দক্ষিণ ভারতের। পাহাড়ে শীতল আবহাওয়ার মধ্যে থাকবার কারণে এই মন্দির বছরে ছয়মাস ভক্তদের জন্য খোলা থাকে। বাকি ছয়মাস এই অঞ্চলে তুষারপাতের জন্য মন্দির বন্ধ রাখা হয়।

বিভিন্ন হিন্দু পরাণ ও ধর্মগ্রন্থে বদ্রীনাথের উল্লেখ পাওয়া যায়। স্কন্দপুরাণ অনুসারে, স্বর্গে, পৃথিবীতে এবং নরকে বহু পবিত্র মন্দির আছে কিন্তু বদ্রীনাথের মতো কোন মন্দির নেই। বদ্রীনাথকে ঘিরে বহু চমকপ্রদ কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে। একটি কিংবদন্তী অনুসারে, ভগবান বিষ্ণু এখানে ধ্যানে বসেছিলেন। তবে ধ্যানে বসার সময় এই জায়গার শীতল আবহাওয়া সম্পর্কে তাঁর কোন ধারণা ছিল না। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মীদেবী একটি বদরী গাছের রূপ ধরে স্বামীকে সেই শীতল আবহাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। লক্ষ্মীরূপী সেই বদরী গাছ বদরী বিশাল নামে খ্যাত। সেই কারণেই বিষ্ণু সেই স্থানের নাম রাখেন বদরিকাশ্রম এবং তিনি নিজে তখন হলেন বদরীর নাথ তথা বদ্রীনাথ। আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে, শিব এবং পার্বতী এই বদ্রীনাথে তপস্যা করছিলেন। সেই সময়ে একটি ছোট ছেলের ছদ্মবেশে বিষ্ণু সেখানে এসে উচ্চস্বরে কেঁদে তাঁদের বিরক্ত করে। পার্বতী তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন যে তিনি ধ্যানের জন্য বদ্রীনাথ চান। শিব এবং পার্বতী ছদ্মবেশী ভগবান বিষ্ণুকে চিনতে পারেন এবং বদ্রীনাথ ছেড়ে কেদারনাথে চলে যান। অন্য একটি কিংবদন্তী নর-নারায়ণের কাহিনীর সাথে জড়িত। বদ্রীনাথে নর ও নারায়ণের মন্দির দেখা যায়। শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, এই বদ্রিকাশ্রমে ভগবান বিষ্ণু দুই ঋষিভাই নর ও নারায়ণ অবতাররূপে সমস্ত জীবের কল্যাণের জন্য অনাদিকাল থেকে মহাতপস্যা করছেন। কিংবদন্তী অনুসারে ধর্মের দুই পুত্র নর ও নারায়ণ আশ্রম স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থানের সন্ধান করবার সময় পঞ্চবদ্রীর চারটি স্থান ধ্যান বদ্রী, যোগ বদ্রী, বৃদ্ধা বদ্রী এবং ভবিষ্য বদ্রী আবিষ্কার করেন। অবশেষে তাঁরা অলকানন্দা নদীর পিছনে দুটি চিত্তাকর্ষক ঠান্ডা এবং উষ্ণ প্রস্রবণ দ্বারা বেষ্টিত মনোরম একটি জায়গা খুঁজে পান এবং এই জায়গার নাম রাখেন বদ্রী বিশাল। সেখানে তাঁরা আশ্রম স্থাপন করেন এবং এভাবেই বদ্রীনাথের জন্ম হয়। আরেক কিংবদন্তী অনুসারে, পান্ডবরা স্বর্গে যাওয়ার পথে বদ্রীনাথ এবং বদ্রীনাথ থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে মানা শহরের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন। মানাতে বেশ কয়েকটি গুহা রয়েছে যার মধ্যে ব্যাস গুম্ফা (গুহা) এবং গণেশ গুম্ফা (গুহা) জনপ্রিয়। কিংবদন্তী অনুসারে, এখানেই নাকি ব্যাসদেব মহাভারত বলেছিলেন আর গণেশ তা রচনা করেছিলেন। বদ্রীনাথ মন্দির যে অলকানন্দার তীরে অবস্থিত সেই অলকানন্দাকে ঘিরেও একটি কিংবদন্তী রয়েছে। ভগীরথের অনুরোধে যখন পৃথিবীতে গঙ্গার অবতরণ ঘটেছিল, তখন পৃথিবী তাকে ধারণে অক্ষম ছিল। ফলত, গঙ্গা বারোটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যার একটি ভাগ হল অলকানন্দা।

মন্দিরের কথা না থাকলেও বৈদিক শাস্ত্রে দেবতা বদ্রীনাথের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, অশোকের আমলে বৌদ্ধধর্মের প্রসারের কারণে এই মন্দির বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়েছিল। যদিও এর সপক্ষে যথেষ্ট ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ নেই। মন্দিরটি সম্ভবত অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত একটি বৌদ্ধ মন্দিরই ছিল। পরবর্তীতে আদি শঙ্করাচার্য মন্দিরটিকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করেছিলেন। কিংবদন্তী অনুসারে বদ্রীনাথ মন্দিরের স্থানে আগে ছিল একটি বৌদ্ধ মন্দির এবং দেবতারা বদ্রীনাথের ভাস্কর্যটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু বৌদ্ধরা অলকানন্দা নদীতে সেই মূর্তি নিক্ষেপ করেছিল। তারপর আদি শঙ্করাচার্য নদী থেকে বদ্রীনাথের ভাস্কর্যটি আবিষ্কার করেন এবং তাপ কুন্ড উষ্ণ প্রস্রবনের কাছে একটি গুহায় এটি স্থাপন করেন। পরে রামানুজাচার্য গুহা থেকে মূর্তিটি সরিয়ে বর্তমান মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন। মন্দিরের স্থাপত্যের মধ্যেও বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলীর ছাপ সুস্পষ্ট। মূলত নবম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য দ্বারা এটি হিন্দুদের একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বাস করা হয় যে, ৮১৪ থেকে ৮২০ সাল পর্যন্ত আদি শঙ্করাচার্য এখানেই বসবাস করেছিলেন। তিনি ছয় মাস বদ্রীনাথে এবং বাকি ছয় মাস কেদারনাথে বসবাস করতেন। একটি জনশ্রুতি অনুসারে, আদি শঙ্করাচার্য নাকি পারমার শাসক কনক পালের সহায়তায় এই অঞ্চলের সমস্ত বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেছিলেন। রাজার বংশানুক্রমিক উত্তরসূরিরা মন্দির পরিচালনা করতেন। ষোড়শ শতাব্দীতে, গাড়োয়ালের রাজা মূর্তিটিকে বর্তমান মন্দিরে স্থানান্তরিত করেন। বয়স এবং তুষারধসের জন্য ক্ষতির কারণে মন্দিরের বেশ কয়েকটি বড় সংস্কার করা হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে, গাড়োয়ালের রাজারা মন্দিরটি সম্প্রসারিত করেছিলেন। ১৮০৩ সালে গাড়োয়ালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মন্দিরের প্রভূত ক্ষতি হলে জয়পুরের রাজা মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। ১৮৭০-এর দশকের শেষের দিকেও মন্দিরের বেশ কিছু সংস্কার করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেও কিছু সংস্কার করা হয়েছিল। ইন্দোরের রাণী অহল্যাবাই এই মন্দিরে একটি সোনার ছাতা দান করেছিলেন। বিশ শতকে গাড়োয়াল রাজ্য বিভক্ত হলে, বদ্রীনাথ মন্দির ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে কিন্তু গাড়োয়ালের রাজা ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

বদ্রীনাথ মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অসাধারণ। মন্দিরটি প্রায় ৫০ ফুট লম্বা। পাথরের তৈরি সম্মুখভাগে খিলানযুক্ত জানালা রয়েছে। একটি প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে খিলানযুক্ত প্রধান প্রবেশদ্বারের দিকে যেতে হয়। মন্দিরটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত, যথা, গর্ভগৃহ, দর্শন মন্ডপ অর্থাৎ যেখানে আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং সভা মন্ডপ অর্থাৎ যেখানে তীর্থযাত্রীরা একত্রিত হন। বদ্রীনাথ মন্দিরের প্রবেশদ্বারে ভগবান বদ্রীনারায়ণের বাহন গরুড় পাখির একটি প্রার্থনারত ভঙ্গীর মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের অভ্যন্তরীন মন্ডপের দেওয়াল ও স্তম্ভগুলি জটিল ও সূক্ষ্ম কারুকার্যে ভরা। গর্ভগৃহের উপরিভাগে ছোট এক গম্বুজ এবং সোনার গিল্টি করা ছাদে আবৃত। গর্ভগৃহে বদ্রীনারায়ণ ছাড়াও গরুড়, নারদ, উদ্ধব, নর ও নারায়ণ এবং কুবেরের ছবি রয়েছে। মন্দিরের চত্বরেই আরও পনেরোটি মূর্তি রয়েছে।

মন্দিরের মূল দেবতা ভগবান বদ্রীনারায়ণের কালো পাথরে নির্মিত এক ফুট উচ্চতার যে মূর্তিটি রয়েছে, সেটি একটি বদরী গাছের নীচে সোনার ছাউনির মধ্যে অবস্থিত দেখতে পাওয়া যায়। বিগ্রহের চারটি হাত রয়েছে। উপরের দুটি হাতের একটিতে রয়েছে শঙ্খ এবং অপরটিতে রয়েছে চক্র। নীচের দুটি হাত যোগমুদ্রার (পদ্মাসন) ভঙ্গিতে কোলের ওপর রাখা। বদ্রীনাথের ডানদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন উদ্ধব, একেবারে ডানদিকে রয়েছেন নর ও নারায়ণ, সামনে ডানদিকে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন নারদ মুনি, বাঁদিকে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন গরুড় এবং বামদিকেই কুবের ও একটি রূপোর গণেশও দেখতে পাওয়া যায়। এখানে উল্লেখ করা উচিত যে, মন্দিরের সব দেবতার মূর্তি কালো পাথরে নির্মিত।

বদ্রীনাথ মন্দিরে উদযাপিত সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব হল মাতা মূর্তি কা মেলা। মূলত পৃথিবীতে গঙ্গা নদীর অবতরণকে স্মরণ করে এই উৎসব হয়। বদ্রীনাথের মা, যিনি পার্থিব প্রাণীদের কল্যাণের জন্য নদীকে বারোটি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, উৎসবের সময় তাঁর পূজা করা হয়। এছাড়াও জুন মাসে পালিত হওয়া বদ্রী কেদার উৎসব খুব বিখ্যাত। আটদিন ধরে এই উৎসব চলে। সারাদেশ থেকে শিল্পীরা এইসময় এখানে অনুষ্ঠান করতে আসেন। তাছাড়া এপ্রিল-মে মাসে অক্ষয় তৃতীয়ার সময় মন্দির খুলে দেওয়া হয়, তখন ভক্তেরা অখণ্ড জ্যোতি দেখবার জন্য ভিড় করেন।

এই বদ্রীনাথ ধামকে চারধামের মধ্যে পবিত্রতম বলে মনে করা হয়। এই পবিত্র বদ্রীনাথ দর্শন করতে ভারত এবং ভারতের বাইরে থেকেও অগুনতি দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। ২০২২ সালে মাত্র দুই মাসে আটাশ লক্ষ মানুষ এখানে এসেছিলেন যা একটি রেকর্ড হিসেবে রয়ে গেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading