বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস রচনা করতে হলে যে সমস্ত কিংবদন্তি চিত্রপরিচালকদের কথা উল্লেখ করতেই হবে, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম একজন হলেন জাপানি পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং চিত্র-সম্পাদক আকিরা কুরোসাওয়া (Akira Kurosawa)। তিনি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মোট ৩০টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁকে নির্দ্বিধায় একজন যুগান্তকারী চলচ্চিত্র-নির্মাতা বলা যায়। তাঁর হাতে সিনেমার এক নতুন ভাষার জন্ম হয়েছিল বলা যায়। এমনকি তাঁকে সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্মাতাদের একজন বলে মনে করা হয়। তাঁর নির্মাণ করা ‘রশোমন’, ‘ইকিরু’, ‘সেভেন সামুরাই’ ইত্যাদি ছবি বিশ্বসিনেমার গতিপথকে বদলে দিয়েছিল। তাঁর গতিশীল চিত্রশৈলীর জন্য তিনি সুপরিচিত। লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের জন্য কুরোসাওয়াকে একাডেমি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯১০ সালের ২৩ মার্চ জাপানের টোকিওর ওমোরি জেলার অন্তর্গত ওমাচিতে আকিরা কুরোসাওয়ার জন্ম হয়। তাঁর পিতা ইসামু (Isamu) ছিলেন এক সামুরাই বংশের সদস্য এবং সেনাবাহিনীর ফিজিক্যাল এডুকেশন ইনস্টিটিউটের নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালক। এছাড়াও ইসামু একটি জিমনেসিয়ামও চালাতেন এবং জাপানে তিনি প্রথম ইনডোর সুইমিং পুল তৈরি করেছিলেন। জাপানে বেসবলকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও ইসামুর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কুরোসাওয়ার মা শিমা (Shima) ওসাকার এক বণিক পরিবারে কন্যা ছিলেন। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের অষ্টম এবং কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন আকিরা।
তাঁর পিতা ইসামু একজন মুক্তমনা মানুষ ছিলেন এবং পশ্চিমা ঐতিহ্যের পাশাপাশি থিয়েটার এবং মোশন পিকচারকে বেশ উঁচু নজরে দেখতেন। ফলত, তিনি তাঁর সন্তানদের চলচ্চিত্র দেখতে উৎসাহ দিতেন। আকিরা মাত্র ছয় বছর বয়সে প্রথম সিনেমা দেখেছিলেন।
ছয় বছর বয়সেই আকিরা কুরোসাওয়া প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার জন্য টোকিওর শিনাগাওয়াতে কিন্ডারগার্ডেনে প্রবেশ করেন। এরপর যখন তাঁর সাত বছর বয়স তখন সেখানকারই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আকিরা কুরোসাওয়ার ওপর তাঁর এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাচিকাওয়ারও যথেষ্ট প্রভাব ছিল। এই তাচিকাওয়া আকিরাকে ছবি আঁকার প্রতি অনুরাগ তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর ছবি আঁকাতে ছিল চমৎকার প্রতিভা। তবে ছবি আঁকার পাশাপাশি তিনি ক্যালিগ্রাফি এবং কেন্দো শোর্ডম্যানশিপও শিখেছিলেন।
সাত ভাইবোনের মধ্যে আকিরার চেয়ে চার বছরের বড় হেইগো তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল। তরুণ আকিরাকে সমস্ত ভয়ের মুখোমুখি হতে এবং অপ্রিয় সত্যের সম্মুখীন হতে শিখিয়েছিলেন এই হেইগো। গ্রেট কান্টো ভূমিকম্প এবং কান্টো গণহত্যার পর এই হেইগো তেরো বছর বয়সী আকিরাকে সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা মৃত মানুষের স্তুপ থেকে যখন ভয়ে চোখ সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন আকিরা তখন হেইগো তাঁকে তা করতে নিষেধ করে এবং ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে বলে।
হেইগোর থেকে প্রাপ্ত সেই সাহসিকতার মন্ত্র পরবর্তীকালে আকিরার চলচ্চিত্রেরও ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। ১৯২০-এর দশকে হেইগো নীরব চলচ্চিত্রের কথকের কাজ করেছিলেন। হেইগোর প্রভাবই কুরোসাওয়াকে থিয়েটার, সিনেমার পারফরম্যান্সের প্রতি আকৃষ্ট করে, ফলে চিত্রশিল্পের প্রতি আগ্রহ তাঁর চলে যেতে থাকে এবং একসময় চিত্রের জগত ত্যাগ করেন তিনি। ১৯৩০-এর দশকে সবাক সিনেমার আবির্ভাব ঘটলে হেইগোর মতো কথকেরা কাজ হারাতে থাকে। ১৯৩৩ সালে আকিরার যখন ২৩ বছর বয়স তখন হেইগো আত্মহত্যা করেছিল৷ এই ঘটনার রেশ দীর্ঘদিন রয়ে গিয়েছিল কুরোসাওয়ার মনে। হেইগোর মৃত্যুর চারমাস পরে কুরোসাওয়ার বড় ভাইয়েরও মৃত্যু হয়। মাত্র তিনবোনের সঙ্গে জীবিত ছিলেন তিনি।
১৯৩৫ সালে ফটো কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিজ যা পি.সি.এল নামে পরিচিত এবং যেটি পরবর্তীকালে স্টুডিও তোহোতে রূপান্তরিত হয়, সেখান থেকে সহকারী পরিচালকের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। যদিও চলচ্চিত্রের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেননি তবুও আবেদনকারীদের জাপানি চলচ্চিত্রের মৌলিক ঘাটতিগুলি নিয়ে এবং সেগুলি কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়ে আলোচনা করে যে-প্রবন্ধ রচনা করতে দেওয়া হয়েছিল তা কিঞ্চিৎ বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই লিখেছিলেন কুরোসাওয়া। তাঁর বক্তব্য ছিল, যদি ঘাটতিগুলি মৌলিক হয় তবে তা সংশোধনের কোন উপায় নেই। এই উত্তর কর্তৃপক্ষের পছন্দ হয় এবং তাঁকে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য আহ্বান জানানো হয়। আকিরাকে পরিচালক কাজিরো ইয়ামামোতোর পছন্দ হয়েছিল এবং অবশেষে ১৯৩৬ সালে পি.সি.এল-এ যোগ দিয়ে আকিরা তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন।
সহকারী পরিচালক হিসেবে অনেক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করলেও তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন কাজিরো ইয়ামামোতো। ইয়ামামোতোর সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে ১৭টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন আকিরা কুরোসাওয়া। ইয়ামামোতো কুরোসাওয়ার অন্তর্নিহিত প্রতিভাকে চিনতে পেরেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই তৃতীয় সহকারী পরিচালক থেকে প্রধান সহকারী পরিচালকে উন্নীত হয়েছিলেন আকিরা। ফলে তাঁর দায়িত্ব বেড়ে যায়। তিনি মঞ্চ নির্মাণ, স্ক্রিপ্ট পলিশিং থেকে শুরু করে লোকেশন স্কাউটিং, রিহার্সাল, আলোকসজ্জা, ডাবিং, সম্পাদনা ইত্যাদি কাজ করতে থাকেন।
এই ইয়ামামোতো কুরোসাওয়াকে ভাল চিত্রনাট্যকারের গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন৷ আকিরা কুরোসাওয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করলে যা বেতন তিনি পান, একজন চিত্রনাট্যকারের উপার্জন তার তুলনায় অনেক বেশি। তিনি পরবর্তীতে বহু অন্য পরিচালকের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। যেমন সাতসুও ইয়ামামোতোর ছবি ‘আ ট্রায়াম্ফ অব উইংস’-এর চিত্রনাট্যকার ছিলেন কুরোসাওয়া।
১৯৪১ সালে কাজিরো ইয়ামামোতোর সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা শেষ ছবি ‘হর্স’-এর মুক্তির পর থেকে আকিরা কুরোসাওয়া একটি ভাল গল্পের সন্ধানে ঘুরছিলেন যেটি অবলম্বন করে তিনি পরিচালনার কাজ শুরু করতে পারেন। ১৯৪২ সালে পার্ল হারবারে জাপানি আক্রমনের পর সুনিও তোমিতার রচিত একটি জুডো উপন্যাস ‘সানশিরো সুগাতা’ প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের বিজ্ঞাপনটি কুরোসাওয়াকে আকৃষ্ট করে এবং উপন্যাস প্রকাশের পর গোগ্রাসে তা পড়ে ফেলেন তিনি। পড়বার পরেই এর মধ্যে চলচ্চিত্রের বীজ তিনি খুঁজে পান এবং তোহো স্টুডিওকে এই উপন্যাসটির ফিল্ম রাইট কিনে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আরও তিনটি জাপানি স্টুডিও সেই প্রস্তাব নিয়ে এলেও অবশেষে তোহো স্টুডিওই তা ক্রয় করতে সক্ষম হয়।
অবশেষে ১৯৪৩ সালে যখন আকিরা কুরোসাওয়ার ৩৩ বছর বয়স, তখন তিনি এই ‘সানশিরো সুগাতা’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
এরপর ১৯৪৪ সালে ‘দ্য মোস্ট বিউটিফুল’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সময়ে এই ছবিরই অভিনেত্রী ইয়োকো ইয়াগুচির (Yoko Yaguchi) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে কুরোসাওয়ার এবং তাঁরা ১৯৪৫ সালের ২১ মে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদের পুত্রের নাম হিসাও এবং কন্যার নাম কাজুকো।
কুরোসাওয়ার প্রথম ছবি সানশিরো সুগাতার একটি সিক্যুয়াল তৈরির জন্য স্টুডিও থেকে তাঁকে চাপ দেওয়া হয়। ফলে কুরোসাওয়া নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই ‘সানশিরো সুগাতা ২’ তৈরি করেছিলেন, যা তাঁর কেরিয়ারের দুর্বলতম চলচ্চিত্রের মধ্যে একটি।
আকিরা কুরোসাওয়া এমন একটি চিত্রনাট্য রচনার সিদ্ধান্ত নেন যা সেন্সরে সহজেই পাশ হয়ে যাবে এবং নির্মাণ তুলনামূলকভাবে কম খরচে সম্ভব হবে। কাবুকি নাটক ‘কাঞ্জিনচো’ অবলম্বনে তিনি তৈরি করলেন ‘দ্য মেন হু ট্রেড অন দ্য টাইগারস টেইল’ নামক এক চলচ্চিত্র। এই ছবিতে কৌতুক অভিনেতা এনোকেনকে নিয়ে কাজ করলেন, যাঁর সঙ্গে কুরোসাওয়া সহকারী পরিচালক হিসেবে বহুবার কাজ করেছিলেন। সেই সময় জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং নতুন আমেরিকান সেন্সর বোর্ড এই ছবিটিতে প্রদর্শিত মূল্যবোধকে ‘ফিউডাল’ ঘোষণা করে ছবিটি মুক্তি পেতে দেয়নি। অবশেষে ১৯৫২ সালে এই সিনেমাটি মুক্তি পায়। সেই বছর আকিরা কুরোসাওয়ার ‘ইকিরু’ সিনেমাটিও মুক্তি পায়।
তার মধ্যে একে একে ‘নো রিগ্রেটস ফর আওয়ার ইয়ুথ’ (১৯৪৩), ‘ওয়ান ওয়ান্ডারফুল সানডে’ (১৯৪৭) ইত্যাদি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ‘ড্রাঙ্কেন অ্যাঞ্জেল’ (১৯৪৮) ছবিটিতেই প্রথম কুরোসাওয়ার নিজের মনে হয়েছিল যে, এটাতে তিনি স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
তোহো স্টুডিওতে ধর্মঘট, কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন, সহিংসতা ইত্যাদি নানা অশান্তির কারণে তোহো ছেড়ে চলে যান কুরোসাওয়া। এরপর প্রযোজক সোজিরো মোটোকি এবং পরিচালক কাজিরো ইয়ামামোতো, মিকিও নারুসে, সেনকিচি তানিগুচি প্রমুখের সঙ্গে ফিল্ম আর্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইগা গেইজুতসু কিয়োকাই) নামে একটি স্বাধীন প্রযোজনা ইউনিট গঠন করেছিলেন। এই প্রযোজনা সংস্থা থেকে আকিরা ‘দ্য কোয়েট ডুয়েল’ (১৯৪৯) নামের একটি ছবি তৈরি করেন। বক্স অফিসে এই সিনেমা সফলতা পেয়েছিল। এই প্রযোজনা সংস্থার হয়ে আকিরা কুরোসাওয়ার দ্বিতীয় ছবি ‘স্ট্রে ডগ’ (১৯৪৯)। এই ছবিতে রিউজো কিকুশিমার সঙ্গে প্রথম চিত্রনাট্য তৈরির কাজ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে আরও আটটি ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন কুরোসাওয়া। ১৯৫০ সালে আকিরার যে ছবিটি সারা বিশ্বের কাছে তাঁর নামটি পৌঁছে দিয়েছিল এবং সিনেমার এক নতুনতর ভাষার জন্ম দিয়েছিল সেই সিনেমাটির নাম ‘রশোমন’। ১৯৫১ সালে এই চলচ্চিত্রটি ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কার লাভ করেছিল। ১৯৫২ সালের শেষদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ ইউরোপের বেশিরভাগ জায়গাতেই রশোমন মুক্তি পেয়েছিল। সেবছরই আবার তোহো স্টুডিওতে ফিরে যান কুরোসাওয়া।
নিজের প্রিয় ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি’র ‘দ্য ইডিয়ট’ থেকে আকিরা ‘শোচিকু’ নামের একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলেন।
আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর ‘সেভেন সামুরাই’ চলচ্চিত্রের জন্য সহকারী চিত্রনাট্যকারদের একটি নির্জন বাসভবনে পঁয়তাল্লিশ দিনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। এই সামুরাই ধারার চলচ্চিত্রের জন্য সর্বাধিক বিখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। এটি সেই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল জাপানি সিনেমা ছিল। পরবর্তীকালে জাপানি সমালোচকরা এই সিনেমাকে সর্বকালের সেরা জাপানি চলচ্চিত্র বলেছিলেন।
দস্তয়েভস্কি ছাড়াও শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি তৈরি করেন ‘থ্রোন অব ব্লাড’। এমনকি পরে ম্যাক্সিক গোর্কির একটি রচনা অবলম্বনে তৈরি করেছিলেন ‘লোয়ার ডেপথস’ নামক চলচ্চিত্রটি।
১৯৫৯ সালে কুরোসাওয়া প্রোডাকশন কোম্পানি গড়ে ওঠে, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার ছিল তোহো। নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত কুরোসাওয়ার প্রথম ছবি ছিল ‘দ্য ব্যাড স্লিপ ওয়েল’। এরপর একে একে সেই প্রোডাকশন হাউস থেকে তিনি ‘ইয়োজিম্বো’, ‘হাই অ্যান্ড লো’, ‘রেড বিয়ার্ড’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মার্কিন পরিচালকদের সঙ্গে সমবেতভাবে ‘তোরা! তোরা! তোরা’ নামের একটি চলচ্চিত্র তৈরির সময় কুরোসাওয়ার কাজের পদ্ধতি মার্কিনীদের বিভ্রান্ত করে দিয়েছিল বলে তাঁরা কুরোসাওয়াকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলেছিলেন। ফলে একজন নিউরোলজিস্টের কাছে তাঁকে পরীক্ষার জন্যও পাঠানো হয়েছিল। ডাক্তার তাঁর ঘুমের অভাবের কারণে উদ্বেগের কথা বলেছিলেন। এই মানসিক অস্থিরতার কারণ দেখিয়েই সেই প্রোজেক্ট থেকে কুরোসাওয়াকে বাতিল করা হয়।
১৯৬৯ সালে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আকিরা কুরোসাওয়া ‘ক্লাব অব দ্য ফোর নাইটস’ নামক প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থা থেকে কুরোসাওয়া ‘দোদেসুকাডেন’ নামক তাঁর প্রথম রঙিন চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন৷ টেলিভিশনের জন্য তিনি ‘সং অব দ্য হর্স’ নামের একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেছিলেন। ‘ডারসু উজালা’ চলচ্চিত্রটি কুরোসাওয়ার প্রথম এমন ছবি যেটি জাপানি ভাষায় নির্মিত নয়৷ এটি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। মহাকাব্যের মতো বিস্তার লক্ষ করা যায় তাঁর ‘কাগেমুশা’ এবং ‘র্যান’-এর মতো ছবিদুটিতে। র্যান ছবিটি শেক্সপিয়ারের ‘কিং লিয়র’ থেকে কিছুটা অনুপ্রাণিত। এই ছবিটিকে কুরোসাওয়া নিজেই তাঁর সেরা চলচ্চিত্র বলে মনে করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাদাদায়ো’ ছবিটি কুরোসাওয়ার ত্রিশতম এবং শেষ ছবি।
কুরোসাওয়া তাঁর কাজের জন্য একাডেমি পুরস্কার, গোল্ডেন লায়ন, পামে ডি’অর, জাপান থেকে অর্ডার অব কালচার, ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের অর্ডার অব মেরিট ইত্যাদি খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালে পড়ে গিয়ে আকিরা কুরোসাওয়া মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান। এরপর বাকি জীবন হুইলচেয়ারে কাটাতে হয় তাঁকে। ক্রমে স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ৮৮ বছর বয়সে টোকিওর সেতাগায়াতে স্ট্রোকের কারণে কিংবদন্তি চিত্রপরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান