ভারতের প্রধান দুই মহাকাব্যের মধ্যে অন্যতম একটি হল রামায়ণ, এবং রামায়ণ বললেই সেই মহাকাব্যের সঙ্গে যে-কবির নাম রচয়িতা হিসেবে জড়িয়ে রয়েছে, তাঁর কথাও এসে পড়ে অবধারিতভাবেই। সেই মহাকাব্যকার হলেন মহর্ষি বাল্মীকি (Valmiki)। তাঁকে ‘আদিকবি’র তকমাও দেওয়া হয়। আমরা কাব্যগাথায় যে রচনাকে শ্লোক বলে চিনি, সেই শ্লোক প্রথম বাল্মীকি রচনা করেছিলেন বলে আদিকবি নামে তাঁকে আমরা চিহ্নিত করে থাকি। বিভিন্ন পুরাণে এই বাল্মীকির বিবিধ পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর জীবনকাহিনি নিয়েও নানারকম ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। কোন পুরাণে তাঁর ব্রহ্মার রূপ হিসেবে পুনর্জন্ম গ্রহণের কথাও বর্ণিত হয়েছে। বলা হয় তিনি মহাভারতের যুগেও জীবিত ছিলেন। রামায়ণের পাশাপাশি বাল্মীকিকে যোগ বশিষ্ঠেরও রচয়িতা বলে মনে করা হয়। বাল্মীকিকে কেন্দ্র করে হিন্দুধর্মে বাল্মীকবাদ নামে এক ধর্মবিশ্বাসেরও অস্তিত্ব রয়েছে।
বাল্মীকির জীবনকাহিনি সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত বাল্মীকির জীবনেতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বাল্মীকির জন্ম, প্রথম নাম ইত্যাদি বিষয়ে একইরকমের তথ্য পাওয়া যায় না। একটির সঙ্গে আরেকটি তথ্যের কিছু না কিছু অমিল রয়েছে। সেই ভিন্ন ভিন্ন তথ্যগুলির দিকে তাকানো ছাড়া আর আপাতত গত্যন্তর নেই। উল্লেখ্য যে এই আদিকবির জন্ম ও জীবনকাল সম্পর্কেও নানারকম ধোঁয়াশা রয়েছ, কোন নির্দিষ্ট সময়কাল নিশ্চিতভাবে বলা দুরূহ কাজ।
রামায়ণ রচনার সময়কাল নির্ধারণের মাধ্যমে বাল্মীকির অস্তিত্বকালকে অনুমান করার পন্থা যদি অবলম্বন করতে হয়, সেক্ষেত্রেও নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না কিছুই। আসলে রামায়ণ বা মহাভারতের মতো এইসব প্রাচীন মহাকাব্যগুলিকে তাদের যে-রূপে আমরা বর্তমানে দেখি, তা কয়েকটি নির্দিষ্ট বছরের মধ্যে তৈরি হয়নি। বহুদিন ধরে তার মধ্যে নানারকম সংযোজন হতে থেকেছে। বাল্মীকির রচনার পরেও হয়তো প্রক্ষিপ্ত অনেক অংশও রয়ে গেছে। কিন্তু বাল্মীকির রচনাটির সময়কালও সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না, তবে গবেষকদের মতে, রামায়ণের প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে রচিত এবং পরবর্তী পর্যায়ের নির্মাণ খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেকেই বাল্মীকিকে রামের সমসাময়িক বলেও মনে করেছেন। দেবদত্ত পট্টনায়েকের মতো গবেষকের মতে রামের অস্তিত্ব ছিল ১২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি আবার এইচ.এস সাঙ্কালিয়ার মতে, রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল। রামায়ণ রচনার সময়কালে বাল্মীকির অস্তিত্ব ধরলে তবে বলতে হয় রামায়ণের প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠনির্মাণের যে সময় অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী—সেই সময়কালের মধ্যের কোন এক সময়ে বাল্মীকি ছিলেন। আবার তাঁকে রামের সমসাময়িক বললে সময়কাল পিছিয়ে নিয়ে যেতে হবে অনেকটাই। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিকে বাল্মীকির জন্মতিথি হিসেবে পালন করা হয়। দিনটি বাল্মীকি জয়ন্তী নামে পরিচিত।
এবারে বাল্মীকির জীবন সম্পর্কে যত ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায় সেদিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।
প্রথমত, স্কন্দপুরাণের নাগরা খন্ডের একটি ব্যাখা অনুসারে, এক ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয় এবং নাম রাখা হয় লৌহজংঘ। আবার আরেকটি মতে বাল্মীকি ভৃগু গোত্রের প্রচেতা (সুমালি নামেও পরিচিত) নামের এক ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর নাম ছিল অগ্নিশর্মা। প্রচেতার দশম সন্তান ছিলেন তিনি। কৃত্তিবাস ওঝা অনুদিত রামায়ণ অনুসারে তাঁর পিতার নাম চ্যবণ। মহর্ষি বাল্মীকিকে নিয়ে যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি প্রচলিত রয়েছে, সেটি অনুসারে প্রথমে বাল্মীকির নাম ছিল রত্নাকর এবং তিনি দস্যু ছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন নাম পাওয়া গেলেও বাল্মীকির এই দস্যুবৃত্তির ব্যাপারটি কিন্তু সমস্ত জায়গাতেই পাওয়া যায়। কোনও কোনও মতে, অগ্নিশর্মা যখন দস্যুবৃত্তি শুরু করেন তখন তাঁর নাম হয়েছিল রত্নাকর।
এই দস্যুবৃত্তির নেপথ্যেও রয়েছে কিছু গল্প। সেইসব গল্পেরও আবার একাধিক রূপ পাওয়া যায়৷
স্কন্দপুরাণের নাগরা খন্ড অনুসারে লৌহজংঘ পিতামাতার একনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন এবং তাঁর এক সুন্দরী স্ত্রী ছিল। তাঁরা যেখানে বসবাস করতেন সেখানে বারো বছর বৃষ্টি না হওয়ায় নিদারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লৌহজংঘ সেই অবস্থায় পরিবারের অন্ন জোগানোর জন্য বাধ্য হয়ে দস্যুবৃত্তি শুরু করেছিলেন। একবার পথে সপ্তর্ষি অর্থাৎ সাত ঋষিকে আটক করে তিনি তাঁদেরকে লুঠতে চেয়েছিলেন। ঋষিরা তাঁর প্রতি করুণা প্রদর্শন করেন এবং তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন সে যে পথ বেছে নিয়েছে তা ভুল পথ। সেই ঋষিদের মধ্যে একজন, পুলহ ঋষি লৌহজংঘকে জপ করার জন্য মন্ত্র দেন। সেই মন্ত্র যখন একাগ্রচিত্তে জপ করছেন তখন তাঁর সারা শরীর বল্মীক বা উইপোকায় ঢেকে যায়। ঋষিরা ফিরে এসে সেই গায়ে জমা বল্মীকের পাহাড় দেখে তাঁর নামকরণ করেন বাল্মীকি।
আরও যেসব গল্প পাওয়া যায়, সেগুলির সঙ্গে এই কাহিনির মিল অনেকটাই। মূলত তপস্যারত অবস্থায় শরীর বল্মীকে ঢেকে যাওয়ার জন্যই যে তাঁর নাম বাল্মীকি হয়েছিল এই ব্যাখা সর্বত্রই রয়েছে।
তবে গল্পের অমিলের জায়গাগুলি দেখা যাক। যেমন একটি গল্প অনুসারে, রত্নাকর শৈশবে জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল। এক শিকারি তাঁকে খু্জে পেয়ে নিয়ে যায় এবং লালনপালন করে বড় করে তোলে। রত্নাকর নিজের আসল বাবা-মাকেই ভুলে যান। বড় হয়ে দারুণ শিকারিও হন রত্নাকর। বিবাহ করেন। তবে পরিবার বড় হতে থাকলে তাদের জন্য অন্ন জোগাড় করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সেই জন্যই তখন দস্যুবৃত্তির পথ বেছে নেন তিনি। একদিন পথে মহর্ষি নারদকে আটক করেন। নারদ তাঁকে বলেন এই পাপের ভাগী তাঁর পরিবারের কেউ হবে না। রত্নাকর যখন নিজের পরিবারের কাছে গিয়ে সকলকে জিজ্ঞাসা করে বুঝতে পারেন যে সত্যিই তাঁর দস্যুবৃত্তির পাপের ভাগ কেউ নেবে না তখন অনুতাপ করেন। নারদ তাঁকে রামনাম জপ করতে বলেন। কিন্তু রামের বদলে বাল্মীকির মুখ দিয়ে শুধু ‘মরা’ শব্দটিই বেরিয়েছিল। সেই মরা মরা বলতে বলতেই তা ‘রাম’-এ পরিণত হয়। সেই ধ্যানে থাকাকালীনই বল্মীক ছেয়ে ফেলে তাঁকে।
কিছু কাহিনি অনুসারে, রত্নাকরের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ নেই, বদলে দুর্ভিক্ষের জন্য প্রচেতার পরিবার নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার কথা আছে এবং রত্নাকরের সঙ্গে পড়াশোনার যোগাযোগ না থাকায় সংসার চালানোর জন্য দস্যুবৃত্তি বেছে নিয়েছিল।
আরেকটি অমিল হল, কোন গল্পে আছে পথে দস্যু রত্নাকর নারদকে আটক করেন কোথাও আবার সপ্ত ঋষির কথা বিশেষত পুলহের কথা রয়েছে। কোথাও আবার পথে দুজন ঋষিকে আটক করার প্রসঙ্গ আছে, তাঁদের মধ্যে একজন, ঋষি অত্রি রত্নাকরকে বলেছিলেন তাঁর পাপের ভাগী কে হতে রাজি আছে জিজ্ঞেস করে আসতে। সেই অত্রিই তাঁকে রামনাম জপ করতে বলেছিলেন। তারপর বল্মীকের ঘটনাটি আগের মতই।
এখানে উল্লেখ্য যে, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজীব ভল্লা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে জানিয়েছেন যে, রামায়ণ রচনার পূর্বে বাল্মীকি আদতেই ডাকাত ছিলেন না। প্রাচীনতার কুয়াশায় প্রকৃত ঘটনাগুলি হারিয়ে গেছে বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
রামায়ণ রচনার সূচনা কীভাবে হল তার জন্যেও রয়েছে একটু নেপথ্য কাহিনী। ঋষিদের কাছ থেকে মন্ত্র পেয়ে তা জপ করতে করতে বাল্মীকির সমস্ত অসততা, অন্ধকার ঘুচে গিয়েছিল। রত্নাকর, লৌহজংঘ বা অগ্নিশর্মা, যাই হোক না কেন, সেখান থেকে তিনি হয়ে উঠলেন মহর্ষি বাল্মীকি। তমসা নদীর তীরে আশ্রম তৈরি করেছিলেন বাল্মীকি। একদিন তমসা নদীতে স্নান করতে যাচ্ছিলেন। এক অরণ্যের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তমসা নদী। সেই জঙ্গল দিয়ে নদীর দিকে যাওয়ার সময় গাছের শাখায় বাল্মীকি একজোড়া ক্রৌঞ্চ বা বক দেখতে পান। তারা মনের আনন্দে মিথুনক্রিয়ায় ছিল ব্যস্ত। তখনই অলক্ষ্য থেকে শিকারির এক ধারালো তীর এসে পুরুষ বক অর্থাৎ ক্রৌঞ্চটিকে বিদ্ধ করে। এই দৃশ্যে ক্রৌঞ্চী বিরহাতুর হয়ে কাতর চিৎকার করে। এই ঘটনার অভিঘাতে বাল্মীকির মুখ থেকে তখন ছন্দোবদ্ধ এক কবিতা উৎসারিত হয়, ‘মা নিষাদ! প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ’ ইত্যাদি। এই উৎসারণে নিজেই বাল্মীকি বিস্মিত হয়ে পড়েন এবং শোক থেকে এই কবিতার জন্ম বলে এর নাম দেন শ্লোক। ভরদ্বাজের সঙ্গে এ-নিয়ে আলোচনার সময়তেই ব্রহ্মার আবির্ভাব হয় এবং তিনি জানান এই শ্লোক তাঁর ইচ্ছেতেই বাল্মীকির মুখ দিয়ে বেরিয়েছে এবং তিনিই বাল্মীকিকে শ্লোকের দ্বারা রামের কথা লেখবার কথা বলেন। নারদ যখন বাল্মীকির কাছে তাঁর আশ্রমে এসেছিলেন তখন নারদের কাছেই রামের কথা সবই শুনেছিলেন তিনি। সেই রামকথা অবলম্বন করে তিনি রচনা করেন ‘রামায়ণ’। অনুষ্টুপ ছন্দে সাতটি কান্ডে ২৪০০০ শ্লোকের সমন্বয়ে এই বিরাট মহাকাব্যটি রচনা করেছিলেন বাল্মীকি। তাঁকে ‘যোগ বশিষ্ঠ’-এর রচয়িতা হিসেবেও মনে করা হয়।
বাল্মীকিকে অনেকেই রামচন্দ্রের সমসাময়িক বলেছেন। হয়তো তার একটা কারণ এই যে, রামায়ণে বাল্মীকির নিজেরও কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। রামায়ণের শেষ অধ্যায় উত্তরকান্ডে বাল্মীকির কথা রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই উত্তরকান্ড বাল্মীকির রচনা নয়। রাম সীতাকে যখন বনবাসে পাঠিয়েছিলেন তখন সীতা নাকি বাল্মীকির আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই সীতার গর্ভে রামের দুই পুত্র লব ও কুশের জন্ম হয়েছিল। বাল্মীকিই নাকি লব ও কুশকে রামায়ণ শিখিয়েছিলেন। এমনকি কিংবদন্তি অনুসারে, ভগবান রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ এবং সীতা তিনজনেই নাকি বাল্মীকির আশ্রমে এসেছিলেন। বাল্মীকির পরামর্শেই নাকি রাম আশ্রমের কাছে চিত্রকূট পাহাড়ে তাঁর পর্ণকুটির তৈরি করেছিলেন।
বল হয় বাল্মীকি মহাভারতের সময়তেও জীবিত ছিলেন। যুদ্ধের পরে যুধিষ্ঠিরকে দেখতে আসা ঋষিদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে শিবের উপাসনার উপকারিতা সম্পর্কে বলেছিলেন।
বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ অনুসারে, বাল্মীকি ত্রেতা যুগে ব্রহ্মার রূপ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আবার ‘রামচরিতমানস’-এর রচয়িতা তুলসীদাসকেও রামেরই পুনর্জন্মের রূপ বলে মনে করা হয়।
বাল্মীকির শিক্ষা এবং দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বাল্মীকিবাদ নামক এক ধর্ম-আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে।
আদিকবি বাল্মীকির সময়কাল নির্ধারণ করা সত্যিই দুরূহ কাজ। তবে রামায়ণের প্রাথমিক পর্যায়ের সম্ভাব্য রচনাকালকে অনেকেই বাল্মীকির অস্তিত্বকাল বলে মনে করেছেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান